Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৪ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৪৮
অমৃতের পুত্ররা মরে না
মোহাম্মদ সাদিক
অমৃতের পুত্ররা মরে না
টোমাস ট্রান্সট্রোমার [জন্ম : ১৫ এপ্রিল ১৯৩১—মৃত্যু : ২৬ মার্চ ২০১৫] ছবি : মোহাম্মদ সাদিক

পাশ্চাত্যের পারিবারিক জীবন সম্পর্কে আমাদের মিশ্র ধারণা আছে। তারপরও দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি আছে অনেকেরই। অসাধারণ দম্পতিরা আছেন সেখানে। টোমাস ট্রান্সট্রোমার ও মনিকা ট্রান্সট্রোমার এই অসাধারণ দুজন মানুষকে দেখে মনে হয়েছে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের একটি বাস্তব কবিতা তারা রচনা করেছেন।

এই কবির সঙ্গে আমার পরিচয়ের সৌভাগ্য যখন হয়েছে, তখনই তিনি শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। সুইডেনে যাওয়ার পর আমি এই কবির সাক্ষাৎ পেতে চাই। কিন্তু সবাই বলেন, কবি অসুস্থ। দেখা হবে মনে হয় না। তখন তিনি কথা কম বলেন, তার হয়ে কথা বলেন মনিকা। কখনো নিজেদের মধ্যে তারা সুইডিশে কথা বলেন। আর সেটি অনুবাদ করে ইংরেজিতে। এই কমনওয়েলথবাসী বাঙালিকে বলেন মনিকা। সামার সুইডেনের অসাধারণ সময়। এ সময়ে টোমাসকে নিয়ে মনিকা স্টকহোম থেকে আরও উত্তরের দিকে চলে যান। থাকেন দীর্ঘ সময়। এ রকম এক সময়ে আমি প্রথম ফোন করি মনিকাকে। আমার অনুরোধ ছিল যদি একবার টোমাসের সঙ্গে দেখা করা যায়।

ইতিমধ্যে টোমাস পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলা ভাষাভাষীদের কাছেও পরিচিত। তার কবিতা শুধু ইংরেজি অনুবাদ পড়েছে বাঙালিরা, তা নয়। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে একাধিক হাতে। সুইডেনে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় এ কাজটি করেছেন কবি আজিজ রহমান। আজিজ রহমান বা কুমার চক্রবর্ত্তী শুধু নন, সম্প্রতি টোমাসের কবিতা অনুবাদ করেছেন আন্দালিব রাশদী। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে টোমাসের অনুবাদ বেরিয়েছে। সুইডিশ প্রবাসী বাংলাদেশিরাও কেউ কেউ টোমাসের কবিতা অনুবাদ করার প্রয়াস নিয়েছেন।

নিজে আমি মনিকা ট্রান্সট্রোমারের সহযোগিতায় তার কিছু হাইকু অনুবাদ করেছিলাম। মনিকা এগুলো সুইডিশ থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করে দেন। সামার আসছে সুইডেনে। এই সামারে টোমাস নেই। দীর্ঘকাল পর টোমাসবিহীন একটি গ্রীষ্মকাল কাটাবে সুইডেন। দেশ বড় হলেও জনসংখ্যা কম। এক কোটিরও কম লোক বাস করে সুইডেনে। এর মধ্যে ১০ লাখের মতো লোক ইমিগ্র্যান্ট। তাতেই সুইডিশরা বলে স্টকহোমে লোকের ভিড় বেড়ে যাচ্ছে। সেই দেশে টোমাসের মতো একজন কবি পরলোকগমন করেছেন। কবিতার সৌভাগ্য, পরলোকগমনের আগে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। প্রচলিত একটি ধারণা আছে সুইডেনে, টোমাস যদি সুইডিশ কবি না হতেন, তাহলে আরও অনেক আগেই তিনি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হতেন। কবিতা ও সংগীতে তার সমান বিচরণ। বিশেষ করে পিয়ানোবাদক টোমাস অনেক বড়মাপের ব্যক্তিত্ব। কিন্তু সুইডিশ নোবেল কমিটি অতিরিক্ত সতর্ক ছিল এ জন্য যে, লোকে যেন মনে না করে, টোমাস সুইডিশ হওয়ার কারণে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর আগে এ রকম কথার মুখোমুখি হতে হয়েছে অন্য এক সময়ে অন্য কমিটি ও কবিকে।

টোমাস ও মনিকার আন্তরিকতা আমাকে প্রথম দিনই মুগ্ধ করেছে। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার একপর্যায়ে টোমাস আমার কবিতা শুনতে চাইলেন। আমি টোমাসকে কবিতা শোনানোর জন্য প্রস্তুতই ছিলাম না, তদুপরি আমার কোনো ইংরেজি কবিতা সঙ্গে নেই জানালে তিনি মনিকাকে কী যেন বললেন। মনিকা ভাষান্তর করে আমাকে জানালেন, টোমাস বাংলা কবিতা শুনতে চান, বাংলা কবিতার ধ্বনি শুনবেন তিনি। আমি টোমাসের জন্য একটি কবিতা পাঠ করি। কবিতার নাম— ‘অমৃতের পুত্ররা মরে না’। গভীর মনোযোগ দিয়ে টোমাস ও মনিকা কবিতা শোনেন। টোমাসের মুখে আনন্দের এক চিলতে আলো দেখতে পেয়ে বিস্মিত হই আমি। বাংলা ভাষা শুনে, তার ধ্বনি শুনে টোমাসের মুখে এক চিলতে আলোর রেখা। সব মিলিয়ে আমার এবং আমার স্ত্রীর খুব ভালো লাগে। কোনো অনুমতি ব্যতিরেকেই আমরা ঘরে তৈরি করা মিষ্টি, পিঁয়াজো ও পাটিসাপটা নিয়ে গিয়েছিলাম। এর মধ্যে পিঁয়াজো ও পাটিসাপটা টোমাসের খুব ভালো লাগে, সেদিন তারা আমাদের অনেক সময় দেন, অনেক রকম আপ্যায়ন করেন। কুমার চক্রবর্ত্তীর বইটি মনিকা নিজে তার সেলফ থেকে এনে আমাকে দেখিয়েছেন। আমি বিস্মিত হয়েছি এই ভেবে যে, বাংলাদেশের একটি বই তিনি কী অসাধারণ যত্ন করে তার হাতের কাছে রেখেছেন। টোমাসকে খুব কাছ থেকে দেখে, তাকে তার কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে অবয়বে কিছুটা কবি শামসুর রাহমান আর কবিতায় কিছুটা জীবনানন্দ দাশ এই দুই রূপকে একসঙ্গে আনা হলে টোমাসের কাছাকাছি একজন কবিকে পাওয়া যেতে পারে।

দূতাবাসে কর্মসূত্রে সুইডেনে বাস করার সুযোগে টোমাসের সঙ্গে পারিবারিক একটি যোগাযোগের কারণে আমার ছেলেমেয়েরাও তাকে খুব আপন ভাবত। আমরা সবাই স্বপ্ন দেখতাম, তিনি হয় তো যে কোনো সময় নোবেল পুরস্কার পাবেন। স্বপ্ন পূরণ হলো অনেক দেরিতে। সেদিন খবরটি একজন সাহিত্য সম্পাদকই দিলেন আমাকে। তখন কালের কণ্ঠের শামীম রেজা। আর তার মৃত্যুসংবাদ দিয়েছিলেন একজন সাহিত্য সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর শেখ মেহেদী হাসান। লেখা চাইলেন আমার কাছে। স্মৃতিচারণমূলক লেখা। টোমাসের নোবেল পুরস্কারের সংবাদে একটি লেখা দেওয়া আনন্দের, কিন্তু মৃত্যুসংবাদে লেখা দেওয়া বেদনার।

তার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সংবাদ শুনে স্টকহোমের বাসার নম্বরে আমি তত্ক্ষণাৎ ফোন করেছি। মনিকাই ফোন ধরেছেন, উচ্ছ্বাস শেয়ার করেছি। তিনিও খলখল করে কথা বলেছেন, কিন্তু মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর আমি বাসায় ফোন করলেও আনসার মেশিনে বার্তা আসছে। এখন কী অবস্থায় কেমন আছেন মনিকা! টোমাসের মেয়েরাই বা কেমন আছেন? আমি এবং আমরা প্রার্থনা করি, তিনি এই স্বজন হারানোর শোক সয়ে উঠবেন। তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও একইভাবে শোক সম্বরণ করে জীবনের নিষ্ঠুর এই বাস্তবতাকে মেনে নেবেন।

সুইডেনের বাংলাদেশি সম্প্রদায় তেমন বড় নয়। যেখানে ইরানের প্রায় ৬০ হাজার প্রবাসী আছেন। সেখানে বাঙালির সংখ্যা মাত্র সাত হাজারের মতো। তারপরও বেশকিছু ব্যক্তি আছেন, যারা সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করেন। বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাদেরসহ একটি অনুষ্ঠানে টোমাস ও মনিকাকে আমাদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাই। সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় লিফলেট বিলি করতে গিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কবি আসিফ সাহাকার এবং তার এক বন্ধুসহ বাংলাদেশের প্রবাসী লেখক, কবি, সাংবাদিক ও সুধী সমাজের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিকেও আমন্ত্রণ জানাই। আসিফ সাহাকার এখন সুইডিশ। আদালতে বিচারকদের মধ্যে একজন। সম্প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু হিসেবে সম্মাননাপ্রাপ্ত। সেদিনের সেই সন্ধ্যায় টোমাসকে কেন্দ্র করেই যাবতীয় আলোচনা আবর্তিত হতে থাকে।

ফিরে গিয়ে মনিকা বাংলাদেশের কবিতাপ্রিয় মানুষের প্রশংসা করেছিলেন। ভারতের ভূপালে কবিতা উৎসবের স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন। আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় কবিতা উৎসব এবং ফেব্রুয়ারির সময় বইমেলার কথা বললে তিনি এ বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের কবিতা উৎসবে টোমাসকে নিয়ে যোগদান করা যায় কি-না এ বিষয়ে প্রস্তাব করা হলে তিনি টোমাসের স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ করে তার উৎকণ্ঠার কথা জানান।

অবশেষে কোনো এক ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে সুইডেন থেকে আমার বাংলাদেশে ফিরে আসার দিন ধার্য হলো। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে আমার সে ফিরে আসার ঝক্কি শেষ করি। যেদিন অপরাহ্নে স্টকহোম থেকে বিদায় নেব সেদিন কোনো কাজ রাখিনি। আগের দিন আমার সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়িটাও বিক্রি করে দিয়েছি। সকালবেলা মন আনচান করে। যাওয়ার আগে একবার কবি টোমাস ট্রান্সট্রোমার ও মনিকা ট্রান্সট্রোমারকে দেখে যেতে চাই। লিয়াকত হোসেনের কথা মনে পড়ে। সুইডেনের বাংলা পত্রিকা পরিক্রমার সম্পাদক। তাকে জানাই টোমাসের বাসায় যাব। আর কোনো দিন এখানে আসা হবে কি-না। তিনি তত্ক্ষণাৎ সঙ্গী হলেন। তার গাড়িতেই রওনা দিই স্টকহোমের ডাউন টাউনের দিকে। ডিসেম্বরে স্টকহোমের আকাশ সাধারণত অন্ধকার ম্লানমুখ থাকে। কিন্তু সেদিন ঝলমলে রোদের আলো এসে লাগে আমাদের মুখে। আমরা বিস্মিত হই। আসার সময় মনিকা আমার হাতে কিছু উপহার তুলে দেন। টোমাসের নিজ হাতে লেখা তার কৈশোর স্মৃতি সম্পর্কিত বইটির একটি কপি। সঙ্গে তার পিয়ানো বাদনের একটি সিডি। আজ অপরাহ্নেই ফিরতি ফ্লাইট। তারা কিছুটা বিস্মিত। অবশেষে আমরাও বিদায় নিই। পেছনে রেখে আসি একজোড়া মানুষের মমতামাখানো মুখ, শান্ত নিবিড় একটি ফ্ল্যাট, দালান, শহর— স্টকহোম।

ছোট ছোট কথা অনেক সময় মনে বড় হয়ে যায়। যখন টোমাস সুস্থ ছিলেন, তিনি নাকি অরণ্যের ভিতর দিয়ে বনভূমি দেখতে দেখতে অনেক দূর চলে যেতেন। ফিরে আসার সময় তার সঙ্গে থাকত অজস্র নোটস। টোমাস অরণ্যানির মধ্যে চোখ রেখে যে সমীকরণে কবিতা, সংগীত কিংবা তার নিজের ভুবন আবিষ্কার করতেন, তা আমাদের বিভূতিভূষণ, জীবনানন্দ দাশকে মনে করিয়ে দেয়। সুইডেন দেশটির অর্ধেকের বেশি হচ্ছে বনভূমি।

যে সময়ে তিনি এই প্রকৃতির পটভূমিকায় বিচরণ করেছেন, তা নিশ্চয়ই আরও নিবিড় ছিল। তার সেসব ছোট ছোট নোটস অনেক গভীর ও মহৎ কবিতার জন্ম দিত। এই যে এখন গ্রীষ্ম আসছে সুইডেনে। তার প্রকৃতি এ সময়ে ‘উজ্জ্বল প্রিজমের মতো’ একজোড়া চোখের অভাব অনুভব করবে অথবা এ রকম মনে হবে কি-না যে, টোমাস আরও কোনো বিশাল বনানীতে ভ্রমণের নিমিত্ত বেরিয়ে পড়েছেন। ফিরে আসবেন আরও দীর্ঘ সময় পার করে আরও বেশি নোটস নিয়ে। তার নোটস-এর জন্য অপেক্ষায় থাকবে মনিকার চোখ, পৃথিবীর কবিতাভুবন।

মনে পড়ে, টোমাসকে শুনিয়েছিলাম কবিতা, ‘অমৃতের পুত্ররা মরে না’। আসলে অমৃতের পুত্ররা মরে যায়, তারা উজ্জ্বল আলোর গ্রীষ্ম সামনে রেখে অন্য কোনো আলোর ভুবনে হারায়। নোটস নিয়ে আর ফিরে আসে না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow