Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বুধবার, ৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০২
হানাহানি নয় শান্তি
শফিকুল ইসলাম শফিক
হানাহানি নয় শান্তি

পৃথিবীর সব ধর্মই শান্তি ও মানবতার কথা বলে। স্বভাবতই ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও হানাহানির কোনো সুযোগই নেই।

সন্ত্রাস ও হানাহানি অধর্মেরই নামান্তর।   যারা ধর্মের নামে অশান্তি ও সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়, তারা কোনো ধর্মের দৃষ্টিতেই ধার্মিক বলে বিবেচিত নয়।

বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই ধর্মভীরু। তা সে মুসলমান হোক, হিন্দু হোক, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান হোক। এ দেশের মানুষ ধর্মভীরু বলেই ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ করে শান্তি ও সহনশীলতার আদর্শকে যুগ যুগ ধরে ধারণ করছে। মসজিদ মন্দির প্যাগোডা গির্জার পাশাপাশি অবস্থান বিভেদের বদলে এ দেশের মানুষের সহনশীলতার বন্ধনকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষ অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

ইসলাম শব্দের অর্থ হলো শান্তি। অশান্তির সঙ্গে এ পবিত্র ধর্মের দূরতম সম্পর্ক নেই। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্যই এ পবিত্র ধর্মের আবির্ভাব হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের মহান প্রবর্তক রসুলে করিম মুহাম্মদ (সা.) পরধর্মের প্রতি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই সহিষ্ণু। মানবতার মূর্ত প্রতীক বলেও বিবেচিত হয়েছেন তিনি। অশান্তির পথ কোনোভাবেই ইসলামের পথ নয়। সন্ত্রাস ও হানাহানির মাধ্যমে আল্লাহর দীন দূরের কথা ভালো কিছু প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব নয়। শান্তির ধর্ম ইসলামের সঙ্গে যারা সন্ত্রাস হানাহানি ও জঙ্গিবাদের সম্মিলন ঘটাতে চায় তারা চূড়ান্তভাবে ভুল পথের পথিক। তারা নিশ্চিতভাবে মুনাফিক। আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, একজন লোক রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলল, খারাপ পন্থায় কী ভালো আসতে পারে? রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শুধু ভালো পন্থায়ই ভালো আসতে পারে অর্থাৎ ভালো কিছু প্রতিষ্ঠার জন্য এর পন্থাও ভালো হতে হবে। (সহীহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪২৭)।

ইসলাম যুদ্ধের সময়ও অপর ধর্মের নিরীহ মানুষ, শিশু নারী বৃদ্ধদের ওপর হামলা অনুমোদন করে না। তাদের পুরোহিত, সন্ন্যাসী বা ধর্মীয় উপাসনাগারে হামলাকে সমর্থন করে না। গাছপালা কাটা বা জনবসতিকে বিরান করা থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেয়।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধদল পাঠাতেন, বলতেন, ‘আল্লাহর নামে চলো, বৃদ্ধকে হত্যা কর না, ছোট বাচ্চাদের হত্যা কর না, মহিলাদের হত্যা কর না, গনিমতের সম্পদ আত্মসাৎ কর না, গনিমতের সম্পদ একত্রে জমা কর। মীমাংসা কর, ইহসান কর, আল্লাহতায়ালা ইহসানকারীদের ভালোবাসেন। ’ (আবু দাউদ, ২৬১৪)। বায়হাকীর বর্ণনায় আরও আছে, অসুস্থকে হত্যা কর না, সন্ন্যাসীদের হত্যা কর না, ফলদ গাছ কর্তন কর না, জনবসতিকে বিরান কর না। খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া উট ও গরু জবাই কর না। (আবু দাউদ, ২৬১৪)।

ইসলাম যেখানে যুদ্ধের সময়ও প্রতিপক্ষের উপসনালয় এবং নারী-শিশুদের ওপর হামলা অনুমোদন করে না, সেখানে স্বাভাবিক সময়ে যারা অপর ধর্মের অনুসারীদের ওপর হামলা চালায় তারা চূড়ান্তভাবে মুনাফিক। তারা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ লঙ্ঘনকারী। ইসলাম অপর ধর্মের নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি কতটা অঙ্গীকারাবদ্ধ তা একটি হাদিসে প্রমাণ পাওয়া যায়। এতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করল সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না, অথচ জান্নাতের সুগন্ধি ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়। (বুখারি)।

হজরত আবু বাকারা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন। ’ (মুসনাদে আহমদ)।

ইসলামের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ রাহমাতাল্লিল আলামিন হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ১৩৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে, কেবলই রহমতস্বরূপ আপনাকে আমি প্রেরণ করেছি। যিনি ছিলেন রহমতের নবী, তার অনুসারীরা কোনোভাবেই সমাজে কিংবা দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে না। যারা এ ধরনের ভ্রান্তির জালে আটকা পড়েছেন তারা রাহমাতাল্লিল আলামিন নবীর অনুসারী হিসেবে নিজেদের দাবি করতে পারেন না। শান্তির ধর্ম ইসলামের মর্যাদা এবং দেশের সুনাম রক্ষায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করা হয়েছে— তোমরা সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চেওনা, আল্লাহ বিশৃঙ্খলাকারীদের পছন্দ করেন না। (সূরা কাসাস, আয়াত ৭৭)।

আগেই বলেছি, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। সব ধর্মের মানুষ দেশ মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমরা একে অপরের ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব। কেউ অন্য ধর্ম নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করব না। অন্য ধর্মের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন কোনো আচরণে জড়িত হব না। হাজার বছর ধরে এ দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির যে পরিবেশ বিরাজ করছে তা নষ্ট হতে দেব না।   দেশের মধ্যে যাতে কোনো ধরনের অরাজকতা মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক থাকব।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার তৌফিক দান করুন।

লেখক : ইসলামী গবেষক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow