সৃষ্টিগতভাবে মানুষের মাঝে আল্লাহতায়ালা কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়ে দিয়েছেন যেগুলো তাকে মানুষের মর্যাদায় টিকে থাকতে সহায়তা করে। এমনই একটি গুণ হলো ‘লজ্জাশীলতা’। লজ্জার গুণ যার হৃদয়ে যত বেশি বিবেকের দায়বোধ তার ভিতর তত বেশি। অন্যভাবে বললে, যার ভিতর যত বেশি লজ্জানুভূতি কাজ করে তার ইমান তত বেশি শক্তিশালী। এ কারণেই হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আল হায়া-উ শুবাতুমমিনাল ইমান’। অর্থাৎ, লজ্জা ইমানেরই অংশ’। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘লা হায়া-উ ওয়ালা ইমানু’। ‘যার হৃদয়ে লজ্জানুভূতি নেই, তার ইমানও নেই’।
লজ্জা মুমিনের ভূষণ। লজ্জার পোশাক যখন খসে পড়ে তখন মানুষ যা খুশি তাই করতে পারে। আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে শুরু করে আল্লাহদ্রোহী হওয়া কোনোটাই পরোয়া করে না লজ্জাহীন মানুষ। সমাজ যখন লজ্জাহীন মানুষে ভরে যায়, তখন ওই সমাজ থেকে শান্তি-সম্প্রীতি উঠে যায়। তাই সমাজ, দেশ ও ব্যক্তিজীবনকে শান্তিময় করে তুলতে ইসলাম লজ্জাশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সাহাবিরা একে অন্যকে লজ্জাশীলতার উপদেশ দিতেন। একবার হজরত ওমর (রা.) এক ব্যক্তিকে খুব করে লজ্জাশীল হওয়ার গুরুত্ব বোঝাচ্ছিলেন। সম্ভবত লোকটি এদিক থেকে ভালো রকম পিছিয়ে ছিল। রসুল (সা.) বললেন, ‘ওমর! তাকে ছেড়ে দাও। লজ্জা এমন একটি গুণ, যার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য লম্বা-চওড়া বক্তৃতার প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকু জানাই যথেষ্ট যে, লজ্জা ইমানেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। লজ্জায় যার কমতি আছে, মনে করবে ইমানেও সে পূর্ণ নয়।’
ওমর (রা.)-এর ছেলে হজরত আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল হায়া-উ ওয়াল ইমানু কারনা-আ জামিয়ান’। ‘ইমান ও লজ্জা এ দুটি ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে’। ‘ফা ইজা রুফিয়া আহদুহুমা রুফিয়াল আখর’। ‘যখন এর একটি ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন অন্যটি এমনিতেই চলে যায়।’ অর্থাৎ ইমান ও লজ্জার সম্পর্ক এতই গভীর, যখন মানুষ তার জীবন থেকে কোনো একটি ছেড়ে দেয় তখন অন্যটিও আপসেই চলে যায়। যেন তারা একে অন্যকে ছাড়া চলতেই পারে না।
লজ্জা শুধু ইমানের অংশই নয় বরং ইসলামের বিশেষ বৈশিষ্ট্যও। হজরত জায়েদ ইবনে তালহা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইন্না লিকুল্লি দিনিন খুলুকন, ওয়া খুলুকুল ইসলামি হায়া-উ’। ‘প্রত্যেক ধর্মের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো লজ্জাশীলতা।’ অন্য হাদিসে লজ্জাকে নিফাক তথা মুনাফিকি আচরণের বিপরীত বলা হয়েছে। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘লাজুকতা ও কম কথা বলা ইমানের দুটি বৈশিষ্ট্য। আর অশ্লীলতা ও বাচালতা মুনাফিকির দুটি বৈশিষ্ট্য।’
লাজুকতার মর্যাদা বলতে গিয়ে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল হায়া-উ লা ইয়াতি বিখায়রিন’। ‘লাজুকতা কল্যাণ ছাড়া ভিন্ন কিছু আনে না’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘লজ্জার সবটাই ভালো— মঙ্গলজনক’। রসুল (সা.)-এর একান্ত খাদেম হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেছেন, ‘যে কাজে লজ্জা নেই তা কোনো না কোনোভাবে ত্রুটিপূর্ণ হয়। আর লজ্জাসহ যে কাজ করা হয় তা শুধুই সুন্দর ও চমৎকার হয়ে ওঠে।’ একদিন রসুল (সা.) আয়শা (রা.)-কে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আয়শা! লজ্জা যদি কোনো ব্যক্তির হৃদয়ে থাকে তবে সে কোনো পাপে লিপ্ত হতে পারবে না। আর কেউ যদি লজ্জাহীন হয়, তবে সে এত খারাপ হবে যে, তার মাধ্যমে যে কোনো কাজই সম্ভব।’ অন্য হাদিসে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘পূর্ববর্তী নবীদের থেকে পাওয়া যে কথাটি এখনো অবিকৃত অবস্থায় আছে তা হলো, যখন তুমি লজ্জাহীন-বেহায়া হয়ে পড়বে তখন তুমি যা খুশি তাই করতে পারবে।’
সাহাবি হজরত সালমান ফারসি (রা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা কোনো বান্দার অমঙ্গল চাইলে, কাউকে ধ্বংস করতে চাইলে সর্বপ্রথম তার থেকে লজ্জা তুলে নেন। লজ্জাহীন ব্যক্তি সহজেই বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে ওঠে। বিদ্বেষের কারণে তার থেকে আমানতও তুলে নেওয়া হয়। আমানতহীন মানুষ খেয়ানতকারী হিসেবে লোকসমাজে পরিচিত হয়ে যায়। আর এমন মানুষ থেকে আল্লাহতায়ালা দয়া-মায়া-ভালোবাসা তুলে নেন। ফলে সে হয়ে যায় নির্দয় ও কঠোর স্বভাবের। এমনিভাবে তার মনে ইমানের যে বাঁধনটি ছিল তা নির্দয়তার ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এ ধরনের মানুষই আল্লাহর জমিনে ইবলিশের প্রতিনিধিত্ব করে। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক।’
লজ্জাশীলতা বান্দাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়। আল্লাহর প্রিয় বান্দা বানিয়ে দেয়। একজন সাহাবিকে আল্লাহর রসুল (সা.) বললেন, ‘হে আমার প্রিয় সাহাবি! তোমার মাঝে এমন দুটি গুণ আছে যার কারণে আল্লাহ তোমাকে পছন্দ করেন, ভালোবাসেন। ওই দুটি গুণ হলো বুদ্ধিমত্তা ও লজ্জাশীলতা।’ আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার ঠিকানা জান্নাত ছাড়া আর কী হতে পারে। তাই তো লজ্জাশীলতার চূড়ান্ত পুরস্কার অনিন্দ্যসুন্দর জান্নাত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জা ইমানের অঙ্গ। আর ইমানের স্থান জান্নাত। অন্যদিকে বেহায়া বে-ইমানের অংশ। আর বে-ইমানের স্থান জাহান্নাম।’ মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে লজ্জাশীল মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
www.selimazadi.com