Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:০৮
বখাটেরা বেপরোয়া
৮ মাসে ধর্ষণের শিকার ৩০৮ ও মৃত্যু ২৯ জনের ১৩-১৮ বছর বয়সীরা বেশি উত্ত্যক্তের শিকার
জিন্নাতুন নূর

বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে আবার বখাটেরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বখাটেদের ইভ টিজিং ও যৌন হয়রানির কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে এরই মধ্যে ২৯ জন কিশোরী-তরুণীর প্রাণ ঝরে পড়েছে। আর ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে মোট ৩০৮ জন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে এমনটি জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার সবচেয়ে  বেশি হচ্ছে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী স্কুল-কলেজের মেয়ে শিক্ষার্থী। বিভিন্ন যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, মূলত স্কুল ও প্রাইভেটে পড়তে আসা-যাওয়ার সময় মেয়েরা বেশি উত্ত্যক্তের শিকার হচ্ছে। আর বখাটেদের কুপ্রস্তাবে সাড়া না দিলেই হামলার শিকার হতে হচ্ছে। এমনকি দিতে হচ্ছে প্রাণও।  আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই আট মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে মোট ৪৪২ জন নারী ও শিশু। যার মধ্যে ধর্ষণ করার চেষ্টা করা হয় ৪৩ জনকে। ধর্ষণ করা হয় ২৬৫ জনকে। আর গণধর্ষণ  করা হয় ১২২ জনকে। ভিকটিমদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরী যারা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, তারা সবচেয়ে বেশি (১৫৩ জন) ধর্ষণের শিকার হয়। এরপর সাত থেকে ১২ বছর বয়সী কন্যাশিশু ও কিশোরীরা (১০৭ জন) ধর্ষণের শিকার হয়। এরপর ৬ বছর বয়সী মোট ৩৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয় ২৩ জনের আর আত্মহত্যা করে ৬ জন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু আলোচিত ঘটনা বখাটেদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার বিষয়টি স্পষ্ট করে। এর মধ্যে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় নিতু মণ্ডল নামে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে একই গ্রামের মিলন মণ্ডল নামে বখাটে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে নিতুকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছিল মিলন। অন্যদিকে বখাটেদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর মাগুরা সদর উপজেলার সাংদা লক্ষ্মীপুর গ্রামের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী হ্যাপী (১২) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এর আগে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে ছুরিকাঘাতে মারাত্মক জখম করে ওবায়দুল খান নামে আরেক বখাটে। রিশাকে দীর্ঘদিন ধরে মোবাইলে ও স্কুলে যাওয়া-আসার পথে উত্ত্যক্ত করে আসছিল এই বখাটে। তার প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় অবশেষে গত ২৪ আগস্ট  রিশার পরীক্ষা শেষে বাড়ি যাওয়ার পথে স্কুলের সামনেই  ওবায়দুল রিশাকে হত্যা করে। আর রংপুর মহানগীর দক্ষিণ খলিফাপাড়ার শান্তিধরা এলাকায় মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় গত ১৮ আগস্ট শেখ কামাল নামের এক অভিভাবককে কুপিয়ে আহত করে আরেক বখাটে। এর আগে গত ২৭ মে কনিকা ঘোষ (১৫) নামের ১০ম শ্রেণির আরেক ছাত্রী আবদুল মালেক নামে এক বখাটের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। কনিকা শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়িতে ফেরার পথে এই নির্মম ঘটনা ঘটে। তবে এই ঘটনায় কনিকার সঙ্গে তার আরও তিন সহপাঠী গুরুতর আহত হয়। এ ছাড়া সর্বশেষ গত বুধবার পুরান ঢাকায় আজিমপুর সাফির আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী এক বখাটের হামলায় আহত হয়। কলেজে আসা-যাওয়ার পথে ইমন আলী নামে বখাটে সেই কলেজছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। কিন্তু রাজি না হওয়ায় মেয়েটিকে মারধর করে ইমন তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। বখাটেদের হামলার ধরনগুলো লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, তারা মোবাইলে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে, অশ্লীল ছবি পাঠিয়ে কিংবা সরাসরি মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে। আর তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে সেই নারী শিক্ষার্থীর ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায় এবং কিছু ক্ষেত্রে বখাটেরা মেয়েদের গায়ে আগুন দেয় এবং এসিড দিয়েও শরীর ঝলসে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদের কন্যাসন্তানের নিরাপত্তার বিষয়ে এখন আরও সচেতন হতে হবে। তাদের কন্যাসন্তানকে কেউ উত্ত্যক্ত করছে কিনা এ বিষয়ে মেয়ের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। এ বিষয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়কেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আর এই মামলাগুলোতে যত দ্রুত তদন্ত করে বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে, সমাজ থেকে তত দ্রুত এই ঘটনাগুলো হ্রাস পাবে। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, বর্তমানে ঢাকা ও তার বাইরে দেশের নারী ও কিশোরীরা কোথাও নিরাপদে নেই। অথচ নারীদের কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্ত্যক্ত করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের প্রদত্ত দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে অভিযোগ কমিটি গঠন করার বিষয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি এখনো আমলে নিচ্ছে না। উল্লেখ্য, বেশ কয়েক বছর আগে শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যৌন নির্যাতনবিরোধী কমিটি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। এর বাইরে উচ্চ আদালত যৌন হয়রানি ইস্যুতে দেশের সব জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করা এবং দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ডিসিদের নির্দেশ দেওয়াসহ মোট ৫ দফা নির্দেশনা জারি করেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও বখাটেদের উত্ত্যক্ত বন্ধ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এখন অপরাধী তথা বখাটেরা তাদের অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন নয়। তাই তারা কিছু বিবেচনা না করেই হামলা চালাচ্ছে। আর আমরা যদি অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে না পারি তবে এভাবেই ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে একের পর এক প্রাণ ঝরে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রিশা হত্যাকাণ্ডের আগেও আমরা দেখেছি সেনানিবাসের মতো নিরাপদ স্থানে তনু নামে আরেক শিক্ষার্থীকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। আমি মনে করি, এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিশ্চিত করা না গেলে তনু, মিতু, ইয়াসমিন ও রিশাদের একের পর এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে। তার মতে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে অপরাধীদের বিচার হচ্ছে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow