Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:৪৫

বিশ্বসেরা আরব দার্শনিক

তানিয়া তুষ্টি

বিশ্বসেরা আরব দার্শনিক

আরব দার্শনিকরা একসময় বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রসরতা ধর্ম সম্পর্কে দিয়েছে স্বচ্ছ ধারণা। তাদের চিন্তাধারাকে ইসলাম ধর্মতত্ত্বের বিবর্তন হিসেবেও ধরা হয়। ইসলামের স্বর্ণযুগে এসব দার্শনিকের হাত ধরে সক্রেটিস, প্লেটো আর অ্যারিস্টটলদের দর্শন পরিচিতি পেয়েছে মুসলিমদের কাছে। নামকরা এসব আরব দার্শনিক একাধারে ইতিহাসবেত্তা, সমাজবিজ্ঞানী,

অর্থনীতিবিদ, জ্যোতিষী এমনকি সংগীত বিষয়েও বিজ্ঞ ছিলেন। বর্তমান বিশ্ব মানচিত্র অনুযায়ী তাদের অনেকের জন্মস্থান আবরবিশ্বের বাইরে চলে গেলেও তারা একসময় আরব দার্শনিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আজকের রকমারি আয়োজনে থাকছে বিশ্বসেরা তেমন কিছু আরব দার্শনিকদের কথা।

 

 

আল কিন্দি

(৮০১-৮৭৩) কুফা নগরী

মুসলিম বিশ্বের সোনালি দিনের প্রখ্যাত আরব পন্ডিত আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি। তাকে মুসলিম পেরিপ্যাটেটিক দর্শনের জনক বলা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সৃষ্টিকর্তাই সব পার্থিব অস্তিত্বের কারণ। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিশ্বতত্ত্ববিদ। এ ছাড়াও কোরআন, হাদিস, ইতিহাস, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, রাজনীতি, গণিত, মিউজিক, মনোবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যায় তার দক্ষতা ছিল। আল কিন্দি তৎকালীন আরবের প্রভাবশালী কিন্দা গোত্রের সদস্য। যাদের ইসলামের স্বর্ণযুগের প্রাথমিক পথপ্রদর্শক মনে করা হয়। তিনি জন্ম নেন আরবের কুফা নগরীতে। বাবা ইসহাক ছিলেন কুফা নগরীর গভর্নর। এখানেই তিনি বিদ্যাশিক্ষা চর্চা করেন। আল কিন্দির সঠিক জন্মতারিখ জানা না গেলেও ধারণা করা হয় আয়ুষ্কাল ছিল ৮০১ থেকে ৮৭৩ সাল।

 

 

আল ফারাবি

(৮৭২-৯৫৬) তুর্কিস্তান

আল ফারাবি ছিলেন ইসলামী দর্শনের ইতিহাসে একজন মহান জ্ঞানসাধক। একাধারে ধর্মতত্ত্ব, অধিবিদ্যা, বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্র, সংগীতে ছিল আল ফারাবির অসামান্য জ্ঞান। তিনিই প্রথম ইসলামী বিশ্বকোষ ও মুসলিম তর্কশাস্ত্র রচনা করেন। ৮৭২ সালে তুর্কিস্তানের ফারাব নামক শহরের আল ওয়াসিজ নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত তুর্কি পরিবারে আল ফারাবির জন্ম। পুরো নাম আবু নসর মুহাম্মদ ইবনে তুরান ইবনে উসলুগ। শিক্ষা লাভের উদ্দেশে তিনি বাগদাদে অবস্থান করেন দীর্ঘ ৪০ বছর। ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলিমদের কাছে সক্রেটিস, প্লেটো আর অ্যারিস্টটলের দর্শন অনুবাদের মাধ্যমে যারা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে আল ফারাবি ছিলেন অন্যতম। তিনি প্রথম ধর্ম ও দর্শনের মাঝে তফাৎ করেন। দৈনন্দিন জীবনে দর্শনকে কাজে লাগানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ৯৫৬ সালে তিনি দামেস্কে মারা যান।

 

 

 

আল গাজ্জালি

(১০৫৮-১১১১) ইরান

পুরো নাম ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি। তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, প-িত এবং ধর্মতত্ত্ববিদ। ১০৫৮ সালে ইরানের খোরাসানের তুশ নগরীতে ইমাম আল গাজ্জালি জন্মগ্রহণ করেন। মারা যান ১১১১ সালে খোরাসানের তুশ নগরীতেই। তার চিন্তাধারাকে মুসলিম ধর্মতত্ত্বের বিবর্তন বলে ধরা হয়। কারণ সেই সময়ে মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন গ্রিক দর্শন দিয়ে প্রভাবিত। কিন্তু তিনি প্রচলিত দার্শনিক চিন্তাধারার বাইরে এমন কিছু দার্শনিক মতবাদ প্রদান করেন যা সমকালীন আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি সর্বপ্রথম ইসলামের দার্শনিক চিন্তাধারাকে স্বতন্ত্র রূপ দিতে সক্ষম হন। সর্বোপরি গ্রিক দর্শনের প্রভাব থেকে তিনি ইসলামকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন বলে তাকে ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ বলে অভিহিত করা হয়।

 

 

ইবনে রুশদ

(১১২৬-১১৯৮) স্পেন

অষ্টম থেকে ১২শ শতাব্দী হলো প্রাথমিক ইসলামী দর্শনের ব্যাপ্তিকাল। দার্শনিক আল কিন্দি এর সূচনা করেন এবং ইবনে রুশদের হাতে এই প্রাথমিক সময়কালটির সমাপ্তি ঘটে। রেনেসাঁর যুগে ইউরোপে তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। তবে এই দর্শনের জন্যই তার জীবনে একসময় নেমে আসে অভিশাপ। ইবনে রুশদের পুরো নাম আবু আল ওয়ালিদ মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ ইবনে রুশদ। পশ্চিমা বিশ্বে তিনি পরিচিত ‘অ্যাভেরোস’ নামে। স্পেনের কর্ডোভায় ১১২৬ সালে এক সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইবনে রুশদ। তার দাদা আলমোরাভিদ রাজবংশের শাসনামলে কর্ডোভার প্রধান বিচারপতি ছিলেন। দর্শন ছাড়াও তিনি ইসলামী শরিয়াহ, গণিত, আইন, ওষুুধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। দর্শনশাস্ত্রে তিনি জনপ্রিয়তা পান অ্যারিস্টটলের লেখাগুলো অনুবাদ করে। ১১৯৮ সালে মারাকেশে মারা যান ইবনে রুশদ।

 

ইবনে খালদুন

(১৩৩২-১৪০৬) তিউনিসিয়া

চৌদ্দ শতকের একজন মুসলিম দার্শনিক, ইতিহাসবেত্তা, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ইবনে খালদুন। আত্মজীবনী অনুযায়ী তার কাজ দুই ভাগে বিভক্ত-  ঐতিহাসিক দর্শন এবং ইসলামিক দর্শন। তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হচ্ছে ‘আল-মুকাদ্দিমা’। ইবনে খালদুনকে আধুনিক ইতিহাস রচনা, সমাজবিজ্ঞান এবং অর্থনীতির অন্যতম একজন জনক বলা হয়। তার পুরো নাম আবু জায়েদ আবদুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন খালদুন আল হাদরামি। তিউনিসিয়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৩৩২ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন ইসলাম ধর্মবিষয়ক পন্ডিত। বাবার কাছেই তিনি শৈশবে শিক্ষালাভ করেছেন। খুব অল্প বয়সে তিনি কুরআন, হাদিস, আইন, বক্তৃতা, ব্যাকরণ, দর্শন, সাহিত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ১৪০৬ সালে কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন এই মহান দার্শনিক।

 

ইবনে আল হাইসাম

(৯৬৫-১০৪০) ইরাক

পুরো নাম আলী আল-হাসান ইবনে আলী-হাসান ইবন আল হাইসাম। পশ্চিমা বিশ্বে তিনি আল-হাইজেন নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন একাধারে আরব দার্শনিক, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ইবনে আল হাইসাম ৯৬৫ সালে ইরানে জন্ম নেন এবং ১০৪০ সালে মিসরের কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন। ইবন আল হাইসামের উল্লেখযোগ্য অবদান অপটিক্স বা আলোকবিদ্যার মূলনীতি। তিনি সর্বপ্রথম ক্যামেরার মূলনীতি আবিষ্কার করেন। এর ওপর ভর করে আজকের আধুনিক ক্যামেরা, স্যাটেলাইট ইত্যাদি। ইবনে আল হাইসাম অ্যারিস্টটল, গ্যালেন, বুন মুসার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তিনি কায়রোয় ফাতেমীয় খলিফার দরবারে গ্রন্থ রচনা, চুক্তি সম্পাদনা এবং অভিজাত সদস্যদের গৃহশিক্ষক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

 

 

ওয়ায়েস করনি

(৫৯৪-৬৫৭) ইয়েমেন

ওয়ায়েস করনি ছিলেন ইয়েমেনের একজন দার্শনিক ও সুফি ব্যক্তিত্ব। আরব জাতিসত্তার ওয়ায়েস করনি ৫৯৪ সালে ইয়েমেনে জন্ম নেন এবং ৬৫৭ সালে মারা যান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় তিনি জীবিত ছিলেন। তবে তাঁদের কখনো দেখা হয়নি। নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো আধ্যাত্মিক পন্থায়। ইবনে বতুতার বর্ণনা অনুযায়ী, ওয়ায়েস করনি সিফফিনের যুদ্ধে আলী ইবনে আবি তালিবের পক্ষে লড়াই করে মারা যান। ওয়ায়েস করনির অল্প বয়সে বাবা আবদুল্লাহ মারা গেলে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার ওপর। তাই অর্থ উপার্জন করতেন উট পালন করে। এ ছাড়া তিনি সব সময় ধর্ম সাধনা আর অন্ধ মায়ের দেখাশোনায় ব্যস্ত থাকতেন।

 

 

ইবনুল আরাবি

(১১৬৫-১২৪০) স্পেন

ইবনুল আরাবি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে প্রথম পোস্টমডার্ন এবং নারীবাদী চিন্তার সমর্থক। তার ‘ফুসুসুল হিকাম’ ও ‘ফুতুহাতুল মাক্কাহ’ বই দুটিকে এখনো ইসলামের আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক চিন্তার সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়। ইবনুল আরাবির দর্শন না জানলে ইসলামী দর্শন সম্পর্কে অবগতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ইবনুল আরাবিই সম্ভবত সবচেয়ে অনুপম, সবচেয়ে জটিল এবং একই সঙ্গে অসামান্য ইসলামী চিন্তাবিদ। তিনি আল-ফারাবি বা ইবনে রুশদের মতো আধুনিকতাবাদী ছিলেন না। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক, দূরকল্পী এবং জ্ঞানের অস্পষ্ট বিষয়গুলোতে ওস্তাদ। শায়খুল আকবর বলেন, ‘আপনি যদি মুসলিম হন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রেষণা থাকে তাহলে ইবনুল আরাবির দর্শন পড়া কর্তব্য। না পড়াটা হবে দুঃখজনক।’ অসামান্য জ্ঞানসম্পন্ন এই দার্শনিক ১১৬৫ সালে স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন, মারা যান ১২৪০ সালে সিরিয়ার দামেস্কে।

 

হামিদ আল কিরমানি

কিরামান প্রদেশ

হামিদ আল-দীন আবু হাসান আহমাদ আবদুল্লাহ আল কিরমানি ছিলেন একজন ইসলামী পন্ডিত। তিনি ফাতিমি খলিফা ইমাম আল হাকিমের রাজত্বকালে (৯৯৬-১০২১ সাল) ইসমাইলি ধর্মপ্রচারক ছিলেন। বাগদাদ-বসরা এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমাংশে জীবনের একটি বড় সময় ব্যয় করেন। সেই যুগে তিনি বিখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। তিনি ফার্সি বংশোদ্ভূত এবং সম্ভবত কিরামান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করে। একজন প্রফুল্ল লেখক, আল-কিরমানি ফাতিমিদের সময়ের সবচেয়ে শিক্ষিত ইসমাইলি ধর্মতত্ত্ববিদদের একজন। ওল্ড টেস্টামেন্টের হিব্রু পাঠ্য, নিউ টেস্টামেন্টের সিরিয়াক সংস্করণ এবং বাইবেলের ইহুদি লেখার পরে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। তিনি অসংখ্য লেখায় ইমামতি শাইয়ের মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি ইরানি ভূখন্ডের ইসমাইলি গোষ্ঠীর অন্তর্গত একজন নিখুঁত দার্শনিক ছিলেন, যার বিভিন্ন দার্শনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের ইসমাইলি ধর্মতত্ত্বের মিল ছিল।


আপনার মন্তব্য