শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:৪২

মুসলিম সমাজ সংস্কারক ইমাম গাজ্জালি

একাদশ শতকে মুসলিম সমাজে এক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। অনুসন্ধিৎসু এবং জ্ঞানপিপাসু মুসলিমদের দুয়ারে গ্রিক দর্শন ও মুতাজিলা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ঘাঁটি গেড়ে বসে। এই দুই দর্শনের প্রভাবে মুসলিম চিন্তাশীল সমাজ বিভক্ত বিক্ষিপ্ত হয়ে ধর্মের কোমল বিশ্বাস থেকে সরে যেতে শুরু করে। এমন এক সময়ে হুজ্জাতুল ইসলাম উপাধি নিয়ে মুসলিম দর্শন তথা বিশ্ব দর্শনের প্রবাদপুরুষ হিসেবে আগমন ঘটে আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল গাজ্জালি (রহ.) এর। তিনি মুসলিম সমাজ পুনরুদ্ধারের হাল ধরেন। বিস্তারিত থাকছে আজকের রকমারি আয়োজনে।

তানিয়া তুষ্টি

মুসলিম সমাজ সংস্কারক ইমাম গাজ্জালি

আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী একজন

ইসলামের নামে প্রচলিত থাকা ভয়ঙ্কর মতবাদ ও ভ্রান্ত দর্শন মুসলমানদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। গাজ্জালি মূলত সেসবের বিরুদ্ধে কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করেছিলেন।

ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক ছিলেন একাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম আবু হামিদ আল গাজ্জালি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই তিনি ইমাম গাজ্জালি (রহ.) নামে বেশি পরিচিত। সে সময় ইসলামের নামে প্রচলিত থাকা ভয়ঙ্কর মতবাদ ও ভ্রান্ত দর্শন মুসলমানদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। গাজ্জালি মূলত সেসবের বিরুদ্ধে কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করেছিলেন। এ কারণে তাঁকে হুজ্জাতুল ইসলাম বা ইসলামের সাক্ষ্য উপাধি দেওয়া হয়। গ্রিক দর্শন থেকে শুরু করে শিয়া মতবাদের উত্থান ও জোয়ার-  সবকিছুর বিরুদ্ধেই তিনি ছিলেন সোচ্চার। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম এই শিক্ষাবিদ জন্মগ্রহণ করেন ১০৫৮ সালে ইরানের খোরাসানের তুশ নগরীতে। ইমাম গাজ্জালির বাবা মুহাম্মদ আল গাজ্জালি তখনকার সময়ে একজন স্বনামধন্য সুতা ব্যবসায়ী ছিলেন। গাজল অর্থ সুতা, নামকরণের এই সামঞ্জস্যতা তাই তাঁর বংশকে নির্দেশ করে। আবার কারও মতে তিনি হরিণের চক্ষুবিশিষ্ট অপরূপ সুদর্শন ছিলেন। আর গাজাল অর্থ হরিণ। তাই বাবা-মা তাঁকে শৈশবে আদর করে গাজ্জালি বলে ডাকতেন। ১০৯১ সালে ইমাম গাজ্জালি বাগদাদের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র নিজামিয়া মাদ্রাসায় যোগদান করেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেন। তাঁর নিয়মিত লেকচারগুলোতে জনসমাগম ঘটত উল্লেখ করার মতো। অথচ ১০৯৫ সালে নিজের আধ্যাত্মিকতার সংকট অনুভব করে নিজামিয়া থেকে পদত্যাগ করেন। তারপর দামেস্ক, জেরুজালেম এবং হেজাজ সফরে বেরিয়ে পড়েন। এই দীর্ঘ ভ্রমণকালে তিনি আত্মশুদ্ধির প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন এবং প্রচলিত ইসলামী ধ্যান-ধারণার নানান দিকগুলো বিশ্লেষণ করতে থাকেন। অবশেষে ১১০৬ সালে তিনি বাগদাদে ফিরে পুনরায় শিক্ষকতা শুরু করেন। আত্মশুদ্ধি ও নিয়তের পরিশুদ্ধির উপায় অনুসন্ধানে তাঁর কর্মকান্ড ও চিন্তাধারা জনগণের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। বাগদাদে অবস্থানকালে তৎকালীন শাসকদের সঙ্গে তাঁর কিছু বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজ শহর তুশে ফিরে যান। এই মহামনীষী ১১১১ সাল মোতাবেক ৫০৫ হিজরি সনে নিজ জন্মভূমি তুশ নগরীতে সুস্থ অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মৃত্যুর দিন ভোর বেলায় তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন। পরে তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে নিজ হাতে কাফনের কাপড় পরিধান করেন। তারপর কেবলার দিকে মুখ করে শুয়ে পড়েন। ইমাম গাজ্জালির মরদেহ ইরানের অমর কবি ফেরদৌসীর সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।

 

ইসলামকে মুক্ত করেন কুপ্রভাব থেকে

নিজের আত্মজীবনী ‘আল মুনকিজ মিন আল-দালাল’ গ্রন্থে গাজ্জালি মানুষের সত্যের পথ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছেন। সে সময় প্রচলিত নানা আদর্শের মধ্যে অন্যতম ছিল গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের ভাবাদর্শভিত্তিক ন্যায়শাস্ত্র। এমনকি বিখ্যাত মুসলিম মনীষী ইবনে সিনা ও আল ফারাবিও এমন দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন। ইমাম গাজ্জালির মতে, এরিস্টটলের দর্শন ও যুক্তির ফলে মানুষ যেসব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, সেগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ। অনেক দার্শনিকই সৃষ্টির অবিনশ্বরতা, খোদার অস্তিত্বহীনতা কিংবা তাঁর সর্বজ্ঞানী হওয়া অসম্ভব বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এমতাবস্থায় ইমাম গাজ্জালি ও প্রকৃত ইসলামে বিশ্বাসী মুসলমানদের কাছে এসব ধ্যানধারণা ছিল স্পষ্টতই কুফরি। ইমাম গাজ্জালি দেখলেন যে, কোনো আলেমই কার্যকরভাবে দার্শনিকদের যুক্তি খন্ডন করতে পারছিলেন না। কেননা এসব দার্শনিকরা ছিলেন যুক্তি ও বিতর্কে বিশেষজ্ঞ। তারা তাদের অবস্থানকে স্পষ্টভাবে ও বোধগম্য যুক্তির সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বিতর্কিত কিছু উপায় অবলম্বন করছিলেন। ইমাম গাজ্জালি দার্শনিকদের যুক্তি ও পরিভাষা দিয়েই তাদের অবস্থানের অসারতা তুলে ধরেন। দার্শনিকদের যুক্তিকে সেসব আলেমদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তিনি সেসব দর্শনের ফাঁকফোকরগুলো দেখিয়ে দেন। এই কাজ করতে গিয়ে তাঁকে দর্শনশাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হয়েছিল। বিভ্রান্তিতে পড়ার আশঙ্কা থাকায় সর্বসাধারণের জন্য দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়নকে তিনি অনাবশ্যক মনে করতেন। তিনি সব সময় তাঁর লেখাগুলোতে প্রচলিত ভ্রান্ত মতবাদের গবেষণার আগে ইসলামের সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জনে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। আরেকটি বিরাট সমস্যা যা ইমাম গাজ্জালিকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল, সেটি হলো ইসমাঈলি শিয়া মতবাদের উপদ্রব। এরিস্টটলের দর্শন, শিয়া মতবাদ ও অন্যান্য মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের নানা দিক বিশ্লেষণ করার পর ইমাম গাজ্জালি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বিশ্বপ্রকৃতিকে বুঝার একমাত্র কার্যকর পন্থা হলো ইসলামের অনুশীলন যা মহানবী (স.) ও তাঁর অনুসারীরা শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

 

গাজ্জালি ও বিজ্ঞান

ইমাম গাজ্জালি (রহ.) চারশর বেশি বই লিখেছেন। তাঁর বইয়ে বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও সুফিবাদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। প্রাচ্যবিদরা ঢালাওভাবে অভিযোগ করেন ইমাম গাজ্জালির দর্শন ও যুক্তি ইসলামের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। মূলত বিশদ গবেষণার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন বিশ্বে বিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত ইবনে সিনা ও আল ফারাবির মতো বিজ্ঞানীদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করেছিলেন। তাদের যুক্তি খন্ডন করতে গিয়ে গাজ্জালি বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেন। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, ‘গণিত এবং অন্যান্য বিজ্ঞানশাস্ত্র ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কিংবা ক্ষতিকর ও পরিত্যাজ্য নয়। তবে শিক্ষার্থীদের উচিত সতর্কতার সঙ্গে জ্ঞান অর্জন করা এবং দর্শন ও অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা যেসব বৈজ্ঞানিক ধারণা দিয়েছেন সেসব অন্ধভাবে বিশ্বাস না করা।’ অনেকে ভাবতে পারেন, বিজ্ঞানীদের সমস্ত আবিষ্কার ও উদ্ভাবন প্রচলিত ধ্যান-ধারণা বিরোধী। তাঁর ভাষ্য হলো, ‘কেউ যদি ধারণা করে বসে যে, গণিত ও বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করেই ইসলামের পক্ষে থাকা যায় তবে তা হবে মস্ত বড় অপরাধ। কেননা ইসলামী আইন এসব বিষয়কে প্রত্যাখ্যান কিংবা সত্যায়ন করেনি এবং ধর্মীয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্তও করেনি। শিক্ষার্থীদের তিনি বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানে অবদানের কারণেই বিজ্ঞানীদের দার্শনিক ধ্যান-ধারণাগুলোকেও পুরোপুরি গ্রহণ না করতে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাত্ত্বিক দর্শন থেকে পৃথক করে বৈজ্ঞানিক কর্মকা-কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষা করে যাওয়া। এটি না হলে বিজ্ঞান নিজেই দর্শনের মতো অনুমান ও যুক্তিনির্ভর কিন্তু কোথাও প্রয়োগ হয়নি এমন একটি ক্ষেত্রের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে যেত।

 

ছিলেন বুজুর্গ ব্যক্তি

ফার্সিভাষী পরিবারের উত্তরসূরি হয়েও আরবি ভাষাতেও তিনি ছিলেন সাবলীল এবং অন্যান্য মুসলিম মনীষীদের মতো আরবি ভাষাতেই লেখালেখি করেছেন। ইসলামের মৌলিক জ্ঞান ও ইসলামী আইনে তিনি অল্প বয়সেই ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। শাফেয়ি মাজহাবের প্রখ্যাত আলেম আল জুয়াইনি ছিলেন তাঁর অন্যতম শিক্ষক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি সেলজুক সাম্রাজ্যের অধীনে মুসলিম বিশ্বে আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত কর্মকান্ডের জন্য সুপরিচিত নিজামুল মুলক শাসিত ইস্পাহান প্রদেশের আদালতে যোগদান করেন। জ্ঞানচর্চায় ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তীক্ষ মেধা ও অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়ে শিক্ষকদের কাছে বিশেষ সম্মান পেতেন। সে সময় ছাত্রদের পাঠ্য বিষয়ে শিক্ষকদের দেওয়া ব্যাখ্যা ও বক্তব্য হুবহু লিপিবদ্ধ করতে বাধ্য করা হতো। লিখিত এই নোটগুলাকে ‘তালিকাত’ বলা হতো। এভাবে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এর কাছে তালিকাতের এক বিরাট ভান্ডার তৈরি হয়েছিল। প্রাথমিক লেখাপড়া করেন তুশ শহরে। শিক্ষক ছিলেন ইমাম রাদাখানি এবং পরে চলে যান জুরান শহরে। সেখানে শিক্ষক ছিলেন হজরত ইমাম আবু নসর ইসমাঈল (রহ.)। তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠতম ধর্মতত্ত্ববিদ আলেম ইমামুল হারামাইন আল জুয়াইনি, আল্লামা আবু হামিদ আসকারায়েনি, আল্লামা আবু মুহাম্মদ যোবায়নি প্রমুখ মহাজ্ঞানী ছিলেন তাঁর শিক্ষক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব দার্শনিকদের মতবাদও তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করে নিজেকে সেসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।

 

তাঁর কাছে ঋণী থাকবে মুসলিম সমাজ

মুসলিম বিশ্ব আজীবন ইমাম গাজ্জালি (রহ) এর কাছে ঋণী  থাকবে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য। ইতিহাস প্রমাণ দেয়,  সেলজুক বংশীয় তুর্কীরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করেন তখন থেকে ইসলামী স্বভাব-চরিত্র ও মূল্যবোধে বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়। সেলজুক সুলতানদের যুগে মুসলমানদের বিদ্যার্জন স্পৃহা বেড়ে যায়। মুসলিমরা তখনকার ইহুদি, খ্রিস্টান ও পারসিকদের প্রচলিত জ্ঞানার্জন করার পর প্রাচীন গ্রিক দর্শন, মিসরীয় ও ভারতীয় জ্ঞান সংগ্রহ করেন। এসবের মধ্যে ছিল জ্যোতিষশাস্ত্র, জড়বাদ,  নাস্তিকতা ইত্যাদি। তবে এসব মতবাদের প্রসার মুসলমান সমাজে বহু মতানৈক্য সৃষ্টি করে। অত্যধিক পরিমাণে পার্থিব জড়বাদের প্রভাবে ধর্ম জ্ঞানের ওপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকে। অপরদিকে প্রাচীন গ্রিক দর্শনের প্রভাবেও ইসলামে নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এই সমস্যা থেকে সমাজকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেন। অতুলনীয় প্রতিভা ও নিপুণতার সঙ্গে তিনি এই বিভ্রান্তিকর পরিবেশ থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। তথাকথিত জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপসহ যাবতীয় ইসলামবিরোধী মতাদর্শ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বুুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান এবং দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার প্রয়োগ ঘটান।


আপনার মন্তব্য