Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ১৯:৫৫

কুবিতে রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাসের অঙ্গীকার শুধু কাগজেই!

কুমিল্লা প্রতিনিধি

কুবিতে রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাসের অঙ্গীকার শুধু কাগজেই!

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ভর্তির সময় ধূমপান ও রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার অঙ্গীকার করলেও তা মানছে না কেউই। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ভর্তির সময় পূরণকৃত ভর্তি ফরম ও রেজিস্ট্রেশন ফরমেই রয়েছে এ অঙ্গীকারনামা। অঙ্গীকারনামায় রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার প্রতিশ্রুতি নিলেও ক্যাম্পাসটিতে রাজনীতি ও ধূমপান চলছে লাগামহীনভাবে। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি যেমন সরব তেমন শিক্ষক রাজনীতিও। যে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি সরব এবং প্রকাশ্যেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা করে ধূমপান সেখানে ভর্তির সময় এমন অঙ্গীকার করা নিতান্তই হাস্যকর বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা।

জানা যায়, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার এক বছর পরে ২০০৭ সালের ২৮ মে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১৩টি ব্যাচ এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রথম ব্যাচ থেকেই ভর্তি ফরম ও রেজিস্ট্রেশন ফরমে অঙ্গীকারনামায় রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার অঙ্গীকার নেওয়া হয়। যে অঙ্গীকার বর্তমান ফরমগুলেতেও বলবৎ আছে। অঙ্গীকারনামার প্রথমেই উল্লেখ রয়েছে, “আমি এই মর্মে অঙ্গীকার করছি যে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মেনে চলতে সচেষ্ট থাকবো।” কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এর চিত্র সম্পূর্ণই আলাদা। শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীসহ শিক্ষার্থীরা জড়িত রাজনীতিতে। দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যতীত হয় না নিয়োগ, মেলে না পোস্ট পদবীও। এ ক্যাম্পাসটিতে ছাত্র রাজনীতির প্রভাব বিস্তার করছে সর্বত্র। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দই নিয়ন্ত্রণ করে আবাসিক হলগুলো। এমনকি ছাত্র রাজনীতির নিয়মিত কর্মকাণ্ডে যোগদান না করলে মিলে না হলগুলোতে সিট। বাধ্যও করা হয় হল ছাড়তে। ২০১১ সালে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২৪ জুলাই ১০ সদস্য বিশিষ্ট প্রথম কমিটি ঘোষণা করা হয়। যার সভাপতি ছিল নাজমুল হাসান আলিফ ও সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহী। বর্তমানে ছাত্রলীগের দ্বিতীয় কমিটি চলছে। পূর্ণাঙ্গ এ কমিটির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মাজেদ। এ কমিটি দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ২৬ মে। এ কমিটির মেয়াদও দেড় বছর আগে শেষ হয়েছে। ছাত্রলীগের সহিংস রাজনীতি ও দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে ২০১৬ সালের পহেলা আগস্ট দু’গ্রুপের সংঘর্ষে দলীয় কর্মীদের দ্বারাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তদন্ত কমিটি হলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি। শুধু সাইফুল্লাহ হত্যাই নয় ছাত্রলীগের নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারির ও সংঘর্ষের ঘটনা রয়েছে অসংখ্য। ২০১৫ সাল থেকে শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নিজ দলীয় নেতাকর্মীদেরসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা মারধরের শিকার হয়েছে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। মারধরের ঘটনা ঘটেছে শতাধিক। এসব মারধরের বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ জানানোর পরেও একটি ঘটনারও বিচার করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অপরদিকে শাখা ছাত্রদলের কমিটি থাকলেও তাদের নেই কোন কার্যক্রম। মাঝে মধ্যে ক্যাম্পাসের দিকে তারা অবস্থান করার চেষ্টা করলেও ছাত্রলীগের কারণে তা ব্যর্থ হয়। এমনকি বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা মারধরের শিকার হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছে তাদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসে ভর্তি হই একটি রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে। কিন্তু ভর্তির পরেই তা ভঙ্গ করতে হয় আমাদের। আবাসিক হলগুলোতে যেখানে থাকবে পড়াশুনা করার একটি সুষ্ঠু পরিবেশ, সেখানে হল ছাড়তে বাধ্য হয় পড়াশুনা করার জন্য। হলে সিনিয়র হয়েও যেখানে সিট পাওয়া যায় না সেখানে রাজনীতির আধিপত্যে প্রথম দিন উঠেই পেয়ে যায় সিট।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক বলেন, ‘বাংলাদেশের কোথাও রাজনীতির প্রভাবমুক্ত নয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় তো আর তার বাইরে নয়। তারপরেও এখানে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি যে প্রকট আকার ধারণ করেছে সেটা ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরুপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, প্রভোস্টবৃন্দও যেখানে ছাত্রলীগে নেতাদের কথার বাইরে যেতে পারে না সেখানে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী তো কিছুই না।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় জিম্মি হয়ে আছে বলেও হতাশা প্রকাশ করেন বিভিন্ন বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বের অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেই একবারে সম্ভব না। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা শিক্ষক, ছাত্রনেতা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে বসে একটা সমাধানে আসবো। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের আধিপত্যই ক্যাম্পাসে দেখা যায়। এটা একটা রীতি হয়ে গেছে ক্যাম্পাসগুলোতে। যদি ছাত্রনেতারা একসাথে ২০-২৫ জন এসে কোন বিষয়ে চাপ দেয় সেখানে আমারও তো তেমন কিছু করার থাকে না।’ 

বিডি-প্রতিদিন/মাহবুব


আপনার মন্তব্য