১৯ জানুয়ারি, ২০২৩ ১৪:২৯

তিন যুগেও ভাগ্য বদলায়নি বুড়িগঙ্গার মাঝিদের

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:

তিন যুগেও ভাগ্য বদলায়নি বুড়িগঙ্গার মাঝিদের

বুড়িগঙ্গার দুই পারের মাঝিদের ভাগ্যের বদল হয়নি গত তিন দশক ধরে। খেয়ে না খেয়ে চলছে তাদের মানবতার জীবন যাপন। সামান্য আয় দিয়ে কোনোভাবে চলছে জীবন সংসার।  

রাজধানীর সদরঘাটে বুড়িগঙ্গায় নৌকা চলাচল করে এমন তিনটি ঘাট রয়েছে। ঘাটগুলো হল ওয়াইজঘাট, তেলঘাট, লালকুঠিঘাট। এ তিনটি ঘাটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং যাতায়াতে বেশি লোক জনবল হয় ওয়াইজঘাট এলাকায় বলে জানিয়েছেন ঘাট সংশ্লিষ্টরা।

বুড়িগঙ্গার দুই পারের মাঝিরাদের নৌকা চালানোর কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই বলে জানান তারা। কেউ কেউ সকালবেলা শুরু করে রাত অব্দি নৌকা চালান। আবার কোনো কোনো মাঝি দুপুর থেকে শেষ রাত পর্যন্ত যাত্রী পারাপার করে। তবে কিছু সংখ্যক মাঝি রয়েছে যারা বিকেল থেকে শুরু করে সারারাত নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বাড়তি পয়সা উপার্জনের আশায়। 

সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, ওয়াইজঘাট থেকে প্রতিদিন বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে নাগর মহল, খাজা মার্কেট, আলম মার্কেট, ব্রিজ মার্কেটসহ আশেপাশের ছোট-বড় বিভিন্ন অংশে চলাচল করে ১৫০ টির বেশি নৌকা। এক-একটি নৌকায় মাঝিরা ৬-৮ জন যাত্রী নিয়ে নদী পারাপার করে। একজন যাত্রীর নদী পারাপারে ভাড়া গুনতে হয় পাঁচ টাকা। অর্থাৎ একবার নদী পারাপারে মাঝিরা নৌকা প্রতি ৪০ টাকা ভাড়া পায় বলে জানান। তবে মাঝেমধ্যে কমবেশিও হয়ে থাকে মোট ভাড়ার পরিমাণ। 

বুড়িগঙ্গার মাঝিরা জানান, আমাদের মধ্যে কিছু নৌকা আছে যারা শুধুমাত্র ৩০ টাকার বিনিময়ে রিজার্ভে নিয়ে যাত্রী পারাপার করে, আবার কিছু নৌকার মাঝিরা রয়েছে যারা শুধুমাত্র মালামাল আনা-নেওয়া করে বাড়তি টাকার আশায়। তবে আমরা বেশিরভাগ মাঝিরা যাত্রী প্রতি ভাড়া পাঁচ টাকা করে ছয় থেকে আটজন যাত্রী নিয়ে নদী পারাপার হয়। 

মাঝিরা আরো জানান, বর্তমানে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রায় সাড়ে তিনশ' ছোট-বড় নৌকা চলাচল করে প্রতিদিন। লোক আনা-নেওয়ার পরিধি ভেদে এক-একজন মাঝির দৈনিক ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন হয়। তবে বিশেষ বিশেষ দিনে নিয়মিত যাত্রীদের সঙ্গে অতিরিক্ত মানুষের ঢল নামলে এ আয়ের পরিধি আরও বেড়ে যায় কয়েকগুণ হারে।  

এদিকে নদী পারাপারে বুড়িগঙ্গার দুই পারে ঘাটের ইজারাদারের একবার আসা-যাওয়ার পথে দুই, চার, পাঁচ টাকা থেকে শুরু করে মালামাল পরিবহনে ৫০ বা ১০০ টাকা পর্যন্ত ঘাটের ইজারা দিতে হয়। তবে এক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গার মাঝিদের দিতে হয় না কোনো ধরনের ইজারা কিংবা খাজনা বলে জনান। 

নিয়মিত নৌকায় যাতায়াতকারী কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন বলেন, আসলে এখনকার দিনে পাঁচ টাকায় নদী পারাপার হওয়াটা হয়তো কল্পনার বিষয়। অনেক মানুষ তো বিশ্বাসই করতে চায় না। সত্যি বুড়িগঙ্গা পারাপারের এ চিত্রটি অন্য রকমের অনুভূতি কাজ করে মনের মধ্যে। 

বরিশালের আব্দুল কাদের মাঝি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, 'দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নৌকা বেয়ে বুড়িগঙ্গায় কাটায় দিলাম। জীবনের বাকি সময়টাও এখানে কাটাতে চায়। টাকা-পয়সা বড় ব্যাপার না। বাপ-দাদার কাজটা করে কোনোমতে জীবন পার করে দিচ্ছি। কষ্ট হয় মাঝে মধ্যে পরিবার নিয়ে চলতে। তারপরেও পেশাটা বেছে নিয়েছি। দেশে কত কিছু হচ্ছে তবে আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি এমনকি আমাদের জন্য কোন কিছু করে না কেউ।' 

ঘাট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইজারাদাররা বলেন, 'এখানকার বেশিরভাগ মাঝির বাড়ি ঢাকার বাহিরে। নৌকার মাঝিরা এখানে নিজেদের মতো করে নৌকা চালায়। তারা নিজেদের মতো করে চলতে পারে। তাদের দেখবাল করার দায়িত্ব আমাদের না।'

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক জয়নাল আবেদীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, 'মাঝিদের দেখাশোনার জন্য নৌ-পুলিশকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়াও তাদের সার্বিক বিষয় দেখার জন্য ঘাটের ইজারাদার রয়েছে। মাঝিরা যেন কোনো প্রকার হয়রানির শিকার না হয়, এ জন্য আমরা কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকি। তবে এছাড়া আমাদের বেশি কিছু করার সামর্থ্য নেই।'

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন

সর্বশেষ খবর