শিরোনাম
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল, ২০২১ ১৬:১৬
প্রিন্ট করুন printer

বগুড়ায় অর্ধশত গ্রামে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া

বগুড়ায় অর্ধশত গ্রামে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার

সবকিছু সচল থাকার পরও যেন অচল ! কারণ হাতল চাপতে চাপতে অবশ হয়ে আসে হাত। বসে আসে কোমড়। শরীর চুয়ে পানি পড়ে। কিন্তু নলকূপের মুখ দিয়ে একফোটা পানিও বের হয় না। তাই আর কি করার, প্রতিদিন পানির খোঁজে ছুটতে হয় বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে ইউসুফের মেশিনের। নারী পুরুষ সবাই মিলে দাঁড়িয়ে যান লাইনে। পর্যায়ক্রমে কলসি, পাতিল, বাতলিসহ বিভিন্ন বাসনে পানি ভরান তারা।

পরে হাতে, কাঁধে বা ভাড়ে সেই পানির পাত্র নিয়ে ছোটেন বাড়ির পানে। আর এই পানিতে চলে গোসল, রান্নাবান্না, থালাবাসন  ধোঁয়ার কাজ। তবে বিদ্যুৎ না থাকলে সেখানেও জ্বালা। কেননা সব কাজ ফেলে তখন সামান্য পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার প্রহর গুণতে হয়। এভাবে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে ছুটতে হচ্ছে এক মেশিন থেকে আরেক মেশিনে। মহামারী করোনাকালে এই রমজান মাসে পানির সংকটে ‘এ যে কী কষ্ট তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন’।

শুক্রবার বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের রামেশ্বরপুরসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামে গেলে পানি সংগ্রহের এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রামে ভুগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে গেছে। জানুয়ারি মাস থেকে একটু একটু করে পানি নিচে নামতে শুরু করলেও চলতি এপ্রিল মাসে এসে তা চরম আকার ধারণ করেছে।

ফলে উপজেলার গাড়ীদহ, খামারকান্দি, খানপুর, সীমাবাড়ী ও সুঘাট ইউনিয়নে পানির স্তর হস্তচালিত নলকূপগুলোর আওতার বাইরে চলে গেছে। তাই এসব এলাকায় বাসা-বাড়ির হাজার হাজার নলকূপে পানি ওঠা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে। পানি সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করায় গ্রামের মানুষদের পাড়ি দিতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ।  

উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের রামেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হামিদ, বাংড়া গ্রামের গোলাম মোস্তফাসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, এসব এলাকার সিংহভাগ হস্তচালিত নলকুপে পানি উঠা বন্ধ হয়ে গেছে। অধিকাংশ এলাকার পানির স্তর ৩৫-৪০ ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে। সেচ সংকটের পাশাপাশি পানীয় জলের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে বাধ্য হয়ে এসব গ্রামের লোকজন বোরো প্রকল্পের নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন।

ওমর আলী ও আব্দুল মোন্নাফ জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে আনা পানি ২-৩দিন ধরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এই পানি লোকজন খাবার হিসাবে ব্যবহার করেন। এছাড়া পানি সংকটে গরু, মহিষ, মানুষ একই ডোবা বা পুকুরে গোসল করছে। এতে করে নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষ। তাঁরা আরও বলেন, বাড়ির নলকূপে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের দূর-দূরান্তের শ্যালোমেশিন থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। সেই পানিতে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়া সাড়তে হচ্ছে।

এছাড়া পানি সংকটের কারণে বছরের এই সময়টিতে এলাকার লোকজন স্বজনদের বাড়িতে আসতে বলেন না। জামাই-মেয়েকে দাওয়াত করতে পারেন না। পানীয় জলের সংকটে তাদের আপ্যায়নে ভীষণ সমস্যায় পড়তে হয়। সবমিলে পানি সংকটে ভাল নেই এসব গ্রামাঞ্চলের মানুষজন। 

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এই উপজেলায় সর্বমোট সরকারি-বেসরকারি মিলে অন্তত পনের হাজার হস্তচালিত নলকূপ রয়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় যার সংহভাগ নলকূপই অচল হয়ে পড়েছে। সেগুলোতে  পানি ওঠা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইরে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী সাহাবুল ইসলাম জানান, পানির স্তর ১৬-১৮ ফুট নিচে থাকলে সেটাকে আমরা স্বাভাবিক বলে থাকি। কিন্তু ওইসব ইউনিয়নের পানির স্তর ইতোমধ্যে ৩০-৩৫ ফুট নিচে নেমে গেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ও নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় দিনদিন এসব সমস্যা প্রকট হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে নদী খনন করে এবং বিশেষ ব্যবস্থায় পানির রিজার্ভ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বিডি প্রতিদিন/আল আমীন

এই বিভাগের আরও খবর