শিরোনাম
মঙ্গলবার, ৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

ধারাবাহিক নাটকে জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীদের অনীহা

আলী আফতাব

ধারাবাহিক নাটকে জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীদের অনীহা

ধারাবাহিক নাটকের কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত জনপ্রিয় কিছু ধারাবাহিক নাটকের নাম। তার মধ্যে রয়েছে- ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এই সব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘সংশপ্তক’, ‘কোন কাননের ফুল’, ‘কোথাও কেউ নেই’ প্রভৃতি। এসব ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেছিলেন আসাদুজ্জামান নূর, ফেরদৌসী মজুমদার, মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, লাকী ইনাম, সারা যাকের, বিপাশা হায়াত, আফসানা মিমি, শমী কায়সার, মাহফুজ আহমেদের মতো তুখোড় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। বিটিভি আমলের পর স্যাটেলাইট যুগে এসেও জনপ্রিয় হয়েছিল বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক- ‘বন্ধন’, ‘৫১বর্তী’, ‘রঙের মানুষ’, ‘রমিজের আয়না’। অথচ সর্বশেষ ৫ বছরে কোনো ধারাবাহিক নাটক জনপ্রিয় হয়নি। এর প্রধান কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করছেন ধারাবাহিক নাটকে জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অনীহা। কিন্তু ধারাবাহিকের মাধ্যমে একসময় চরিত্র সৃষ্টি হতো। ছোট চরিত্রগুলোতেও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকত। এভাবে অনেক শিল্পীও তৈরি হতো। ‘আজ রবিবার’ নাটকে ফারুক আহমেদ, বহুব্রীহি নাটকে আফজাল শরীফরা ছোট্ট চরিত্রে কাজ শুরু করেছিলেন। আজ তাঁরা প্রতিষ্ঠিত অভিনয়শিল্পী।

ধারাবাহিক নাটক থেকে রীতিমতো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দেশের জনপ্রিয় তারকা অভিনয়শিল্পীরা। এসব কারণে ধারাবাহিক নাটকে অভিনয়শিল্পীর সংকট তৈরি হচ্ছে, ধারাবাহিক হারাচ্ছে গৌরব। অন্যদিকে টেলিভিশন হারাচ্ছে দর্শক। অভিনয়শিল্পীদেরও রয়েছে ধারাবাহিকে কাজ না করার পেছনে নানা যুক্তি। টিভি ধারাবাহিকে কাজ করে অর্থনৈতিক বা মানসিকভাবে সন্তুষ্ট নন তাঁরা। ধারাবাহিকে কাজ কমিয়ে দিয়েছেন, এরকম তারকার তালিকায় আছেন মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, আফরান নিশো, মম, তানজিন তিশা, জোভান, তৌসিফ মাহবুবসহ আরও বেশ কজন অভিনয়শিল্পী।

গত বছর নয়টি ধারাবাহিকে দেখা গেছে মোশাররফ করিমকে। এখন তিনি কাজ করছেন দুটিতে। আফরান নিশোকে সর্বশেষ দেখা গেছে গোল্ডেন ভাই ধারাবাহিকে। অপূর্বকে গত দুই বছরে পাঁচটি ধারাবাহিকে দেখা গেছে। ধারাবাহিক থেকে ক্রমশ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কেন? জানতে চাইলে মোশাররফ করিম বলেন, ‘অনলাইনের কাজে নির্মাতারা যতটা যত্ন নিচ্ছেন, টিভি নাটকে তার অভাব রয়েছে। ধারাবাহিকে এক দিনে ১৫ থেকে ২০টি দৃশ্যের শুটিং করতে হয়। অনেক সময় চিত্রনাট্য গোছানো থাকে না, অবহেলার ছাপ থাকে। তবে ভালো গল্প ও চরিত্র পেলে অবশ্যই কাজ করব।’

কদিন আগেও সারা বছর পর্দায় থাকার তাগিদে ধারাবাহিকের জন্য সময় রাখতেন অভিনয়শিল্পীরা। সম্প্রতি অনলাইন প্ল্যাটফরমে একক ও সিরিজের চাহিদা তৈরি হওয়ায় তাঁরা আগ্রহী হয়ে উঠেছেন সে সবে। সপ্তাহে ১০টির বেশি নাটক প্রচারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, যেগুলোর শেষ ঠিকানা হচ্ছে ইউটিউব। জানা গেছে, একটি ধারাবাহিক নাটক করে প্রতিদিন তারকাদের যে আয় হয়, তার তিন গুণ আয় হয় অনলাইনভিত্তিক কাজে। অন্যদিকে প্রযোজকদের অভিযোগ, অনেক অভিনয়শিল্পীকে চাহিদামতো পারিশ্রমিক দিয়েও ধারাবাহিকের শিডিউল পাওয়া যায় না।

ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে আলোচনায় এসেছিলেন বহু তারকা। তাঁদের অনেকে নিয়মিত অভিনয় না করলেও কেউ কেউ নাটক নির্মাণ করছেন। তাঁদের অন্যতম জাহিদ হাসান বলেন, ‘আমাদের সময় ধারাবাহিক নাটকে সুযোগ পাওয়া অনেক বড় ব্যাপার ছিল। তখন থেকেই নিয়মিত ধারাবাহিকে কাজ করতাম। এখন দেখি অনেকেই ধারাবাহিক নাটক করতে চান না, কমিটমেন্টের অভাব। একজন শিল্পীর দায়বদ্ধতা থাকা জরুরি। এখনকার ছেলেমেয়েদের অনেকেই অস্থির। অনেকেরই নাটকের প্রতি ভালোবাসা নেই, বরং টাকাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে অভিনেতা ও নির্মাতা আবুল হায়াত বলেন, ‘ধারাবাহিক নাটক ঐতিহ্য ও পারিবারিক গল্পে সমৃদ্ধ ছিল। এখন মানুষ নাটকই দেখছে না। শিল্পীরা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সরে যাচ্ছেন। আমরা অভিনয় করে আনন্দ পেতাম। এখন সবাই অভিনয়কে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন। আগে চিন্তা করছেন কোন কাজ করে কত টাকা পাওয়া যাবে।’

ধারাবাহিক নাটক থেকে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আরও একটি প্রধান কারণ হচ্ছে বিজ্ঞাপনের আধিক্যতা। অতি মুনাফার লোভে দর্শককে বিরক্ত করেছে চ্যানেল। বিরক্ত করে একপর্যায়ে দর্শকদের তাড়িয়েছি আমরাই। একটা সময় ধারাবাহিকের প্রচুর দর্শক ছিল। আমার ‘রমিজের আয়না’তেই দেখেছি একেকটা পর্বে ৪৮টা টিভিসি প্রচারিত হয়েছে। প্রতিটি বিজ্ঞাপন যদি ৩০ সেকেন্ড করেও ধরি, তাহলে কী অবস্থা হয়! এখনো ধারাবাহিক নাটক জনপ্রিয় করা সম্ভব। তার জন্য বড় প্রজেক্ট করতে হবে। এক ধারাবাহিকেই যদি চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, অপূর্ব, নিশো, তাহসান বা তিশা, মেহজাবীন, মমদের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে পরিবারের গল্প বলতে পারা যায়, তাহলেই আমার বিশ্বাস, দর্শক তা দেখবে। কিন্তু সেই হাঁটু, কোমর বা পকেটের জোর কি চ্যানেলের আছে?

সর্বশেষ খবর