শিরোনাম
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ১৩:২৭
আপডেট : ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ১৪:১৩

'দায়িত্ব পেয়ে নেতারা যেন দুষ্টামি না করে'

আজিমউদ্দিন আহমেদ

'দায়িত্ব পেয়ে নেতারা যেন দুষ্টামি না করে'
মঞ্জুরুল আলম শাহীন ও আজিমউদ্দিন আহমেদ (বামে)

৮০-৯০ দশকে চট্রগ্রামের রাজপথ কাঁপানো ছাত্রনেতা মঞ্জুর আলম শাহীন। কি মারমুখী ছাত্রনেতা- শরীরে ও মেজাজে! শুরুর দিককার কথা। আমাদের পরিচয় তখনো খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেনি। সাংগঠনিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের একটা স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ছিল আমাদের মধ্যে, কিন্তু এরইমধ্যে এরশাদ স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছে। তারও কিছু সময় পরে জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাস প্রতিরোধে ছাত্রসংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধতা – এ দুই আন্দোলনে শাহীনের সাথে আমরা মিছিলের সাথী। জীবন বাজি রেখে প্রতিনিয়ত আন্দোলনে গতি সঞ্চার করা, রাজপথ দখলে রাখা। শত মতপার্থক্য নিয়েও আমরা এগিয়েছি।

৯০ সালে চাকসু নির্বাচন। শাহীন ছাত্রলীগ থেকে ভিপি প্রার্থী, ক্যাম্পাস প্রস্তুত শিবিরকে তার সন্ত্রাসের জবাব দিতে, ফলে ঐক্যবদ্ধ প্যানেলই ছাত্রসমাজের দাবি। সেদিন ছাত্রসমাজের চাপকে শেখ হাসিনাও অস্বীকার করেননি। যার কারণে ঐক্যবদ্ধ প্যানেল হলো সবকটি আসনে। আমরা চাকসুতে ও হল সংসদে নির্বাচিত হলাম কিন্তু প্রবল সম্ভাবনা থাকার পরও ঐক্যের স্বার্থে শাহীনকে ভিপির পদ ছাড়তে হয়েছে। রাজনীতিতে একে বৃহত্তর স্বার্থের কারণে ক্ষুদ্রতর ত্যাগ বলা হয়। তারপর শুরু তীব্র আন্দোলন।

একদিকে স্বৈরাচার আরেক দিকে শিবিরের সন্ত্রাস। একদিকে পুলিশী নিপীড়ন, অন্যদিকে শিবিরের নির্যাতন। তবুও শাহীন সাহসে ভর করে রাজপথে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে। গুলি-লাঠি, টিয়ার সেল-কিরিচের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিরোধ যেন নিত্য। প্রতিদিনই মৃত্যুর মুখোমুখী কিন্তু জীবনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়েছি আমরা। জেল জুলুম, হামলা মামলা, ক্যাম্পাস থেকে শিবির দ্বারা অবাঞ্চিত হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার কোন কিছুই আমাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। আমাদের কি অদম্য সাহস ছিলো যেখানে মিছিলের সাথীকে হারিয়েছি আমরা, পঙ্গুত্ব মেনে নিয়েছে আমাদের বন্ধুরা, শিবিরের সন্ত্রাসে আমাদের অনেক বন্ধুর হাত-পায়ের রগ কাটা, শরীর থেকে হাত কেটে নেয়া, প্লাস দিয়ে টেনে টেনে হাত-পায়ের নখ তুলে নেয়া মানসিক শারীরিক নির্যাতন নিয়মিত ঘটনা। তবুও আমরা শাহীনসহ প্রতিবাদ-প্রতিরোধেই ছিলাম। জীবনের ভয়ে পালিয়ে যাইনি। তবে বড় ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিলো প্রধান। আর ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি হিসেবে শাহীন ঐতিহাসিক দায়িত্বশীল, সাহসী, সময়য়োপযোগী ভূমিকাই পালন করেছিল সেদিন। একাউন্টিং এর ছাত্র শাহীন পরীক্ষাটাও শিবিরের প্রবল আপত্তির কারণে ক্যাম্পাসের ভিতরে দিতে পারলো না। পুলিশী পাহারায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ক্লাবে দিতে হলো।
 
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ। আসল জীবন শুরু হলো। আমি আরো কয়েক বছর শিবিরের সন্ত্রাস আর সামাজিক বৈষম্যের জঞ্জাল সরানোর কাজ করলাম। তারপর শিবিরের হামলায় ২৪ শে নভেম্বর’৯৪ মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। আমার মিছিল থেকে আমি সাতটি তরুন প্রাণকে হারিয়ে ছিলাম। তারপর আস্তে আস্তে রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমার বন্ধু শাহীন আরো বড় পরিসরে আরো বড় দায়িত্ব নিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকল যুবলীগের লড়াকু সংগঠক হিসেবে। শাহীনের মামলা, হুলিয়া মাথায় নিয়ে রাজপথের লড়াই অব্যাহতই থাকল। একসময় দল ক্ষমতায় আসল কিন্তু শাহীন তখনও সমানতালে সংগঠনের দ্বায়িত্ব পালনরত। দল ক্ষমতায় আসলে কিছু সুযোগ-সুবিধা পায় এটা প্রচলিত কিন্তু শাহীন যেন আগের মতোই। এরই মধ্যে যুবলীগের কিছু ৬০/৭০ বছরের যুবক কি সব কাণ্ড ঘটিয়েছেন শাহীন সে দলভুক্তও নয়, সেও পরিষ্কার।

কয়েকদিন থেকে ফেসবুকে দেখি যুবলীগের সম্মেলন আসন্ন, অমুক ভাইকে অমুক পদে দেখতে চাই। আমি সেটা বলতে চাই না।  যুবলীগই তার নেতৃত্ব ঠিক করবে, সেটাই নিয়ম। আমি চাই সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব। দায়িত্ব পেয়ে নেতারা যেন দুষ্টামি না করে। সে জন্য পরীক্ষিত নেতা দরকার। শক্ত , সামর্থ , সাহসী, অভিজ্ঞ নেতা চাই। আমার বন্ধু স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে এখনো রাজনীতিতেই সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনরত, নিশ্চয়ই অভিজ্ঞতায়, যোগ্যতায়, দক্ষতায় পরিপুষ্ট। আমি তার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় শুভ কামনা জানাতেই চাই। যুবলীগের এ সংকটকালীন শাহীন যেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারে আপনারাও সে জন্য শুভ কামনা জানাতে পারেন।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের সাধারণ সম্পাদক

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য