শিরোনাম
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর, ২০২০ ১০:১১
আপডেট : ৩০ অক্টোবর, ২০২০ ১০:১২

বাবাদের গোপন পুত্র ক্ষুধা!

জসিম মল্লিক

বাবাদের গোপন পুত্র ক্ষুধা!
জসিম মল্লিক

অর্ক পড়তে ভালোবাসে এটা পুরনো কথা। ছোট বয়স থেকেই অর্কর এই অভ্যাস গড়ে উঠেছে। তিন বছর বয়স থেকেই ওর জন্য কমিকসের বই কিনতে শুরু করি আমি। তিন বছর বয়সে আমি বই পড়ার কথা চিন্তাও করিনি। আমি স্কুলে যখন ভর্তি হয়েছি তখন আমার বয়স পাঁচ। স্কুলের বইয়ের বাইরেও যে বই আছে তা জানা ছিল না আমার। যখন নাইন টেনে পড়ি তখন বাইরের বইয়ের সন্ধান পাই। বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়েই আমার জগতটা পাল্টে যায়। বই আমার সঙ্গী হয়ে যায়। বই কাউকে দুঃখ দেয় না, কষ্ট দেয় না, অবহেলা করে না, নিঃসঙ্গ করে না, পাপ থেকে দূরে রাখে। বই সবসময় আনন্দের, বই সবসময় বেদনা লাঘবের, বই সবসময় জাগতিক ঘটনাবলী থেকে আড়াল করে দেয়। বইয়ের হাজারো শব্দমালার মধ্যে ডুব দিয়ে থাকার মধ্যে অনেক আনন্দ আছে। বই আছে বলেই পৃথিবীর যাবতীয় কষ্ট থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়। অঘটন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। বই না থাকলে প্রবাসের একাকীত্ব, বই না থাকলে সংসারের যাবতীয় ঘটনা জীবনকে আরো বিষময় করে তুলত, অসহ্য করে তুলতো।

এখন যদিও আগের মতো বই পড়তে পারি না। পড়তে পারি না বললে ভুল হবে, আগের মতো পড়ি না। আগে সবই পড়তাম, এমনকি বাজারের ঠোঙ্গার লেখাও পড়তাম। বই পেলেই হলো। তখন বই এতো সহজ লভ্য ছিল না। কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে বন্ধুদের সাথে বই ট্রেড করতাম, লাইব্রেরিতো ছিলই। আগে যদি সপ্তাহে তিনটা বই পড়তাম এখন একটাও পড়ি না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। দিনের বেশ অনেকখানি সময় কেড়ে নেয়। কিছুতেই এই নেশা কাটিয়ে উঠতে পারি না। এই কারণে নিজের লেখালেখির গতিটাও নষ্ট হয়। ঠিক ঠাক মতো হয়ে উঠে না। এখন অবশ্য সব বই পড়ি না। অনেক চুজি এখন আমি। বেছে বেছে পড়ি। কিন্তু অর্ক ডিভারেন্ট। অর্ক বা অরিত্রি কারোরই ফেসবুক বা টুইটার একাউন্ট নাই। ওরা এগুলোকে সময়ের অপচয় মনে করে। অর্কর পড়ার অভ্যাস একটুও বদলায়নি। আগের মতোই বই ওর সঙ্গী। রাতে ঘুমানোরে আগে বই পড়া চাই। বিছানার পাশে বই থাকতেই হবে। এটা নিয়ম।

তিন বছর আগে অর্ক যখন নিজের বাড়িতে চলে যায় তখন তার বইগুলো রেখে যায়। এখনও প্রায় শ পাঁচেক বই রয়ে গেছে আমার বাসায়। এতো বই মেইনটেইন করতে আমরা হিসসিম খাই। সব বইই ইংরেজিতে। প্রতি সপ্তাহে অর্ক যখন আসে বইয়ের সেলফের কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। বইগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখে। নাড়া চাড়া করে। তারপর একটা বা দুটো বই পড়ার জন্য নিয়ে যায়। সম্ভবতঃ আগে পড়েনি বা ভাল লাগার বই আবার পড়বে। অর্ক দ্রুত পড়তে পারে এবং ভালো লাগলে কোনো বই চারবার পাঁচবারও পড়ে। আমাকেও মাঝে মাঝে সাজেষ্ট করে ভালো বই পড়ার জন্য। প্রায়ই বলে, বাবা শুধু বাংলা বই পড়লে হবে না, অনেক ভালো ভালো বই আছে সেগুলো পড়তে হবে। তুমি যেহেতু লেখো তাই পড়ার বিকল্প নেই।

প্রতি রাতে অর্ক ফোন করে। ঠিক সাড়ে এগারোটায় বাসার ফোনটা বেজে ওঠে এবং আমরা জানি এই ফোনটা অর্কর। ফোনটা সে করে জেসমিনকে। সারাদিন কি কি করল সে সব নিয়ে মাতা পুত্রের কথা হয়। আমি পাশে বসে শুনি কখনো কখনো। 
বাবা কেমন আছে, শরীর কেমন জানতে চায়। কিন্তু আমার সাথে তেমন কথা হয় না। বাবাদের পুত্র ক্ষুধা অনেক তীব্র। এটুকুই শুধু তারা জানতে চায়। কে জানে সন্তানেরা তা বোঝে কিনা! 

-আজকে কী করলা সারাদিন, জেসমিন জানতে চায়।
-আজকে একবার থ্রিফ্ট শপে গিয়েছিলাম।
-ওমা সেখানে কেনো!
-বই কিনতে গিয়েছিলাম।
-এই কোভিডের মধ্যে!
-হ্যাঁ ওখানে হাফ দামে ভালো ভাল বই পাওয়া যায়।
-ঘুমাবা কখন!
-এই তো একটু বই পড়ে ঘুমাব।

একবার মনে আছে বাসায় ফিরে দেখি অর্ক সিদ্দীকা কবিরের রান্না, খাদ্য ও পুষ্টি বইটা পড়ছে। তখন আমরা ঢাকায় থাকি। অর্কর বয়স তখন সাত আট হবে। 
আমি বললাম, এসব কি পড়ছ!
-পড়ার কিছু পাচ্ছি না তাই রান্নার বই পড়ি।
অর্ক ভোজন রসিক। একদিন তার নানিকে বলল, হান্টার বীফ বানাও।
-নানি বলল তুই হান্টার বীফ কোথায় পেলি!
-রান্নার বই পড়ে জেনেছি…।


বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর