শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:৫৭

সন্ত্রাসবাদের জন্য জিরো টলারেন্স

নেপালে প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা, দিনভর ব্যস্ত সময়, বিমসটেক সম্মেলনে ভাষণ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

সন্ত্রাসবাদের জন্য জিরো টলারেন্স
নেপালের কাঠমান্ডুতে গতকাল বৈঠকের আগে করমর্দন করেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি —বাসস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটিতে সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্সের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (বিমসটেক) চতুর্থ সম্মেলনে বক্তৃতা করছিলেন। সম্মেলন উপলক্ষে তিনি গতকাল সকালে দুই দিনের সফরে কাঠমান্ডু পৌঁছান। পরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিসহ একাধিক সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। কাঠমান্ডুর হোটেল সোয়ালটি ক্রাউন প্লাজায় বিকালে ৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানদের নিয়ে বিমসটেক সম্মেলন শুরু হয়। নেপালের জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির উদ্বোধনী বক্তব্যের পর বক্তৃতা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন নতুন মেরুকরণ হচ্ছে। এ পরিবর্তন আর বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে বিমসটেককেও তাল মেলাতে হবে; আর তা করতে হবে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে। বাংলাদেশ যে বিমসটেকের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় তার বহিঃপ্রকাশ ঢাকায় বিমসটেক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। বিমসটেককে বিশ্বের সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলে আন্তবাণিজ্য সম্প্রসারণের বিশাল সুযোগ রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর উচিত ‘এখনো কাজে না লাগানো’ এই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করা। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ভারতের গোয়ায় বিশেষ বিমসটেক রিট্রিটে নেওয়া ১৬টি এজেন্ডার মধ্যে কয়েকটি বাস্তবায়িত হয়েছে, কিন্তু অনেকটি এখনো বাকি। বিমসটেক ফোরামকে সুসংহত, কার্যকর ও মনোযোগের কেন্দ্রে এনে এ জোট থেকে ভালো কিছু পেতে ৩টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে ১৪টি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন’ ক্যাটাগরিতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জ্বালানি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কৃষিবিষয়ক সহযোগিতা; ‘নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’ ক্যাটাগরিতে নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ‘মানুষে মানুষে যোগাযোগ’ ক্যাটাগরিতে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনস্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও সন্ত্রাসকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সাধারণ শত্রু হিসেবে বর্ণনা করে এসব বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, কয়েকটি বিমসটেক দেশ ইতোমধ্যে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে পরস্পরের বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। অন্যরাও এগিয়ে এলে তা বিমসটেক বিদ্যুৎ গ্রিডে রূপ নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা, সন্ত্রাস দমন ও বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টায় বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ আর সাফল্যের বিস্তারিত বিবরণ শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উন্নয়ন নির্ভর করে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর। ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূর করে বৈষম্যহীন সুষম উন্নয়ননীতি নিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ-নেপাল ঐকমত্য : বাংলাদেশ ও নেপাল বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে একমত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ ঐকমত্য হয়। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কাঠমান্ডুর হোটেল সোয়ালটি ক্রাউন প্লাজায় এ বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রী নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এবং এ সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেপালের সমর্থনের কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ঢাকা নেপালের সঙ্গে সম্পর্ককে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। কারণ, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এ অঞ্চল থেকে দারিদ্র্য নির্মূূল করতে চাই। আমরা কেবল আমাদের দেশেরই উন্নয়ন চাই না, আমরা প্রতিবেশীদেরও উন্নয়ন চাই। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ও সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহারের জন্য নেপালকে প্রস্তাব দিয়ে বলেন, কাঠমান্ডুর সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞতাও বিনিময় করা যেতে পারে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, সহযোগিতা জোরদার করতে বিভিন্ন খাতে দুই দেশের সম্ভাবনা অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. নজিবুর রহমান, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় নেপালের পক্ষে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ কুমার গোয়ালী ও পররাষ্ট্র সচিব শংকর দাস বৈরাগী।

ভুটানের সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল ভুটানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দাসো সেরিং ওয়াংচুক সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হয় বলে প্রেস সচিব জানান। বৈঠকে ভুটানের সরকারপ্রধান তাঁর দেশের আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী দেশের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং ৩১ অক্টোবরের মধ্যে নতুন সরকার শপথ নেবে। দুই নেতা উভয় দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনগুলোয় এ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। ভুটানের প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বাংলাদেশের বিক্রমপুরে সফরের কথা স্মরণ করেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. নজিবুর রহমান ও পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক উপস্থিত ছিলেন।

লাল গালিচা সংবর্ধনা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকালে রাজধানী কাঠমান্ডু পৌঁছলে তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট নেপালের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১০ মিনিটে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী ঈশ্বর পোখারেল ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীকে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।

অভ্যর্থনা পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রীকে একটি সুশোভিত মোটর শোভাযাত্রাসহকারে তাহাচেল মার্গ এলাকায় হোটেল সোয়ালটি ক্রাউন প্লাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শেখ হাসিনা ও জোটের অন্য নেতৃবৃন্দ নেপালের রাষ্ট্রপতি ভবন শীতল নিবাসে দেশটির রাষ্ট্রপতি বিদ্যাদেবী ভাণ্ডারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা সেখানে নেপালের রাষ্ট্রপতির দেওয়া মধ্যাহ্ন ভোজে যোগ দেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর