শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:১১

প্রার্থীরা যখন অপরাধী

মির্জা মেহেদী তমাল

প্রার্থীরা যখন অপরাধী

মমিনুল হক সাঈদ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর (বহিষ্কৃত)। হালে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন হয়ে ওঠা এই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। ক্যাসিনোকান্ডে শুদ্ধি অভিযানের আগমুহূর্তে তিনি দেশত্যাগ করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড এই সন্ত্রাসী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে ফিরেছেন। তিনি একাই নন, তার স্ত্রীও কাউন্সিলর প্রার্থী। তার এলাকায় বহু ক্যাডারের আনাগোনা এখন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম সেন্টু। এবারও তিনি জাতীয় পার্টির সমর্থিত প্রার্থী। তার বিরুদ্ধে দখলবাজি, চাঁদাবাজির অসংখ্য অভিযোগ। বাংলাদেশে ক্যাসিনোর জনকদের অন্যতম এই সেন্টু শুদ্ধি অভিযান শুরুর পরই সিঙ্গাপুর পালিয়ে যান। তিনি দেশে ফিরেছেন নির্বাচন সামনে রেখে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এ দুজনের মতো অন্তত দুই ডজন কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনোকান্ড সহ টেন্ডারবাজি, ফুটপাথ থেকে শুরু করে নানা ধরনের চাঁদাবাজি, জমি দখল, বাড়ি দখল, প্রতিপক্ষের ওপর আঘাত, সরকারি জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণ, মাদক বিক্রিতে সহায়তা, সন্ত্রাসী লালনসহ নানা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থীর মধ্যে অনেকেই রয়েছেন সন্ত্রাসে জড়িত অভিযুক্তদের এ তালিকায়। আবার আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়ে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বেশ কয়েকজনও রয়েছেন বিতর্কিতদের তালিকায়।

নির্বাচনে এসব অপরাধী প্রার্থীকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য আনাগোনা শুরু হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও গোয়েন্দাসূত্রে জানা গেছে, বিতর্কিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গে মাদক, চাঁদাবাজি, দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্ত্রাসীদের সখ্য রয়েছে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও যোগাযোগ রয়েছে। কিলার আব্বাস ভোটের মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাচ্ছে কারাগার থেকেই। আবার জিসান বিদেশে থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে এই ভোটে। আর এ অবস্থায় সন্ত্রাসে জড়িত কাউন্সিলর প্রার্থীদের ঘিরে ভোটের মাঠে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও অনুসন্ধানে এসব প্রার্থীর বিভিন্ন ধরনের বিতর্কিত কর্মকান্ডের চিত্র পাওয়া গেছে। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় বিতর্কিত এই ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ গাঢাকা দিয়েছিল। অভিযান থমকে যাওয়ার পর এরা ফের স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। পুলিশ বলছে, স্থানীয় ও পলাতক সন্ত্রাসীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি শুরু হয়েছে। নির্বাচনের আগে শুরু হতে যাচ্ছে বিশেষ তল্লাশি অভিযান।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, উত্তর ও দক্ষিণে আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া ১৮ জনসহ দুই ডজন কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। আবার আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেলেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, এমন দুজনকে ঘিরেও রয়েছে বিতর্ক। বিএনপির সমর্থন পাওয়া তিনজনের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। জাতীয় পার্টির সমর্থনে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন, এমন এক নেতা ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় পালিয়ে ছিলেন সিঙ্গাপুরে।

র‌্যাবের গণমাধ্যম ও আইন শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাসেম বলেন, ‘নির্বাচনের মাঠে অস্ত্রধারী বা সন্ত্রাসীরা যেন কোনোভাবে আইনশৃঙ্খলার বিঘœ না ঘটাতে পারে সেজন্য আমরা সজাগ আছি। নতুন করে কোনো সন্ত্রাসীকে এলাকায় ফিরে কর্মকা- চালাতে দেওয়া হবে না। কোনো অবৈধ টাকার লেনদেন করা হচ্ছে কিনা, তাও আমরা দেখব।’

পুলিশ ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, ঢাকা উত্তরে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের প্রার্থী করা হয়েছে ফোরকান হোসেনকে। আগারগাঁওয়ের ফুটপাথে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। দরিদ্রদশায় মাদারীপুর থেকে রাজধানী শহরে আসা ফোরকান এখন শত কোটি টাকার মালিক। ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন তোফাজ্জেল হোসেন টেনু। রডভর্তি ট্রাক গায়েব করে দেওয়ার মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একসময়ের বিএনপি ঘরানার টেনুর বিরুদ্ধে ওই ছিনতাই মামলাটির তদন্ত করছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিরও একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আবারও মনোনয়ন পেয়েছেন আবদুর রউফ নান্নু। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানার জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নান্নু এলাকার মাদক বিক্রেতাদের আশ্রয় দেন। ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন পেয়েছেন আরেক বিতর্কিত ব্যক্তি। ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর আবু তাহের গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন তাঁতী লীগ নেতা শাহজাহানকে। প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় দাপুটে হয়ে ওঠা আবু তাহেরের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক সাধারণ মানুষের জমি দখলের অভিযোগও। ১০ নম্বর ওয়ার্ডকে তিনি তার সন্ত্রাসের রাজত্বে পরিণত করেছেন।

সূত্রে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণের ২০ নম্বর ওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়েছেন ফরিদউদ্দিন রতন। রাজনীতি ও আর্থিক খাতে এক বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে রতনের। আদিবাড়ি নোয়াখালী হলেও বড় হয়েছেন ফরিদপুরের একটি উপজেলায়। ঢাকায় এসে গভীর সম্পর্ক হয় জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াদের সঙ্গে। বাণিজ্য-বেসাতিও ছিল তাদের সঙ্গে। খালেদরা ফেঁসে গেলেও ফাঁকতালে বেঁচে গেছেন রতন। ২ নম্বর ওয়ার্ডে ফের আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন আনিসুর রহমান আনিস। বিগত নির্বাচনে কাউন্সিলর হওয়ার পরই তিনি পূর্ব গোড়ান ঝিলের ছয় বিঘা জমি দখলে নিয়ে প্লট আকারে বিক্রি করে দেন। ওই এলাকায় কেউ নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করলে সেখানে গিয়ে হাজির হয় হয় ‘আনিস বাহিনী’। এ বাহিনী চাঁদা না দিলে বন্ধ করে দেয় নির্মাণকাজ। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে সমর্থন পেয়েছেন হাসিবুর রহমান মানিক। আজিমপুরের লেগুনাসহ বিভিন্ন পরিবহনে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বলা হয়, মানিক বর্তমানে যে বাড়িতে বাস করেন ওই বাড়িটি চুক্তিতে একজনের কাছ থেকে নিয়ে আর ফেরত দেননি। এ ছাড়া সন্ত্রাস ও মাদকের কারণে বিতর্কিত প্রার্থীদের মধ্যে উত্তরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে হারুন অর রশিদ এবং দক্ষিণে ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে হাবিবুর রহমান হাবু, ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে মোহাম্মদ হোসেন, ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডে মাহমুদুল হাসান পলিন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। উত্তরের ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈম। একই সিটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হেলাল উদ্দিন তালুকদার, ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে দলটির সমর্থিত প্রার্থী হারুনুর রশিদ খোকা ও ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডে আলী আকবর।


আপনার মন্তব্য