শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩০

বিপাকে হাজার হাজার খামারি

করোনাভাইরাসের থাবা শিলাকাঁকড়ায়

শেখ আহসানুল করিম, বাগেরহাট

করোনাভাইরাসের থাবা শিলাকাঁকড়ায়

চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সুন্দরবন সন্নিহিত ৫টি জেলার হাজার হাজার খামারে চাষ হওয়া শিলাকাঁকড়া রপ্তানিতে ধস নেমেছে। উৎপাদিত এসব শিলাকাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানি হতো  চীনে। করোনাভাইরাসের কারণে ২৩ জানুয়ারি থেকে চীনে শিলাকাঁকড়া রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। একদিকে প্রধান আমদানিকারক দেশ চীনে শিলাকাঁকড়া রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় ও শীতকালের শেষে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ৫ পিপিটির নিচে নেমে যাওয়ায় খামারে উৎপাদিত কাঁকড়া মরতে শুরু করেছে। কেজিপ্রতি ৩ হাজার টাকার শিলাকাঁকড়া বর্তমানে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থায় কাঁকড়া খামারিরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

মৎস্য বিভাগের হিসাবে, গত অর্থবছর বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনাসহ সুন্দরবন সন্নিহিত পাঁচটি জেলা ছাড়াও কক্সবাজার-চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৯ হাজার ৮৫৪ হেক্টর জমিতে ১১ হাজার ৭৮৭ মেট্রিক টন রপ্তানিপণ্য কাঁকড়া ও কুঁচে উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে বাগেরহাটসহ সুন্দরবন সন্নিহিত পাঁচটি জেলায় উৎপাদিত বিশ্বখ্যাত শিলাকাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানি হয়ে থাকে চীনে। এর মধ্যে গত অর্থবছরে ১১ হাজার ৪৩৫ মেট্রিক টন কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানি করে দেশ আয় করে ২১৭.৫৩ কোটি টাকা।

বাগেরহাট সদরের বিষ্ণুপুর গ্রামের সোহরাব হোসেন, মোংলার কানাইমারী গ্রামে অনিল মন্ডল ও রামপালের পেড়িখালী গ্রামের শিলাকাঁকড়া খামারি কবির হোসেন জানান, তারা একেকজন থেকে ১ থেকে ২ হেক্টর জমির খামারে রপ্তানিপণ্য শিলাকাঁকড়া চাষ করে এবার বিপাকে পড়েছেন। চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর ২৩ জানুয়ারি থেকে দেশটি শিলাকাঁকড়া আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। খামারগুলোতে কাঁকড়া পূর্ণবয়স্ক হলেও একদিকে চীনে শিলাকাঁকড়া রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ ও শীতকালের শেষে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ৫ পিপিটির নিচে নেমে যাওয়ায় খামারে উৎপাদিত কাঁকড়া মরতে শুরু করেছে। ১৯ ও ২০ জানুয়ারিতে বড় সাইজের এক কেজি শিলাকাঁকড়া তারা ৩ হাজার টাকায় ডিপো মালিকদের কাছে বিক্রি করলেও এখন তা বর্তমানে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শিলাকাঁকড়ার উৎপাদন ভালো হলেও করোনাভাইরাসের কারণে চীনে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব খামারির মতো হাজার হাজার কাঁকড়াচাষি চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ অবস্থায় ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কাঁকড়াচাষিরা সর্বস্বান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

রামপালের কাঁকড়া ডিপো মালিক আ. রাজ্জাক বলেন, ‘বাগেরহাট জেলার চাষিদের খামারগুলোতে উৎপাদিত শিলাকাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানি হয়ে থাকে চীনে। করোনাভাইরাসের কারণে ২৩ জানুয়ারি থেকে চীনে রপ্তানি বন্ধ থাকায় কাঁকড়া বেচাকেনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। চীনে রপ্তানি বন্ধের আগে ৩ হাজার টাকা কেজিপ্রতি কেনা কাঁকড়া নিয়ে এখন আমরা উৎকণ্ঠায় রয়েছি। খামার থেকে তোলার পর কাঁকড়া ২৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ কমে যাওয়ায় একদিকে চাষিদের খামারে যেমন পূর্ণবয়স্ক কাঁকড়া মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে আগে কেনা শিলাকাঁকড়া এখন আমাদের ডিপোতেই মারা যাচ্ছে। এ অবস্থায় খামারিদের পাশাপাশি আমরা ডিপো মালিকরাও চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। এখন বড় সাইজের কাঁকড়ার দাম কেজিপ্রতি ৬০০ থেতে ৮০০ টাকায় নেমে এলেও আরও ক্ষতির আশঙ্কায় কোনো ডিপো মালিক আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে সে দামেও কাঁকড়া কিনছেন না।’

চীনে শিলাকাঁকড়া রপ্তানিকারক ও বাগেরহাট শহর রক্ষা বাঁধ এলাকার কাঁকড়া ব্যবসায়ী সাধন কুমার সাহা বলেন, ‘বাগেরহাট জেলার চাষিদের খামারগুলোতে উৎপাদিত শিলাকাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানি হয়ে থাকে চীনে। আর দেশের মোট কাঁকড়া রপ্তানির ৩০ ভাগই হয়ে থাকে বাগেরহাট জেলা থেকে। আমি সর্বশেষ ২২ জানুয়ারি চীনে শিলাকাঁকড়া রপ্তানি করেছি। করোনাভাইরাসের কারণে এখন চীন আর কাঁকড়া আমদানি করছে না। চীনের আমদানিকারকরা আমাদের জানিয়েছেন, সেখানে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে তারা আর কাঁকড়া আমদানি করবেন না। ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত চীনে শিলাকাঁকড়া রপ্তানির ভরা মৌসুম। এই ভরা মৌসুমে চীন শিলাকাঁকড়া আমদানি বন্ধ করে দেওয়ায় বাগেরহাটসহ সুন্দরবন সন্নিহিত এলাকার কাঁকড়াচাষিদের পাশাপাশি আমরা রপ্তানিকারকরাও আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। আগে কেনা শিলাকাঁকড়া এখন আমাদের ডিপোতেই মারা যাচ্ছে। চীনে করোনাভাইরাসের থাবা দেশের রপ্তানি-বাণিজ্যেও পড়েছে।’

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. খালেদ কনক জানান, বাগেরহাটের সাতটি উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে চাষিদের ৩ হাজার ৭৭৮টি খামারে সনাতন ও আধুনিক বক্স পদ্ধতিতে শিলাকাঁকড়া ও কুঁচে চাষ হয়েছে। অধিকভাবে লাভজনক হওয়ায় বাগেরহাট জেলায় প্রতিবছর শিলাকাঁকড়া ও কুঁচে চাষের জমি এবং খামারের সংখ্যা বাড়ছে। গত অর্থবছর বাগেরহাটের খামারিরা ২ হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন শিলাকাঁকড়া উৎপাদন করেছেন। এ বছর উৎপাদন ভালো হয়েছিল। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চীনে শিলাকাঁকড়া রপ্তানির ভরা মৌসুম। এ সময় খামারগুলোতে পূর্ণবয়স্ক পেটে ঘিলু ভরা শিলাকাঁকড়া পাওয়া যায়। এই জেলায় উৎপাদিত শিলাকাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানি হয়ে থাকে চীনে। আর দেশের মোট কাঁকড়া রপ্তানির ৩০ ভাগই হয়ে থাকে বাগেরহাট জেলা থেকে। করোনাভাইরাসের কারণে চীনে শিলাকাঁকড়া রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় খামারিদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমাতে জেলা মৎস্য বিভাগ সরেজমিনে চাষিদের খামারগুলো পরিদর্শন করে পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ৫ পিপিটির ওপরে রাখতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে করে পূর্ণবয়স্ক কাঁকড়া মারা না যায়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর