শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০৪

করোনা চিকিৎসায় যত সুখবর

দেশীয় ভ্যাকসিন নিয়ে আশা, চলতি মাসেই দেশে চীনা ভ্যাকসিন ট্রায়াল জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন ও ব্যবহারে এগিয়ে বাংলাদেশ

জুলকার নাইন

করোনা চিকিৎসায় যত সুখবর

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসে প্রতিদিনই হাজারো মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিদিনের এই মৃত্যুর মিছিলের দুঃসংবাদের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা ও আক্রান্তদের চিকিৎসায় অপেক্ষাকৃত কার্যকর ওষুধ আবিষ্কার বয়ে আনছে সুখবর। ভ্যাকসিন ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির এই প্রচেষ্টার লড়াইয়ে শামিল আছে বাংলাদেশও। এ ছাড়া ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার পর বিশাল সংখ্যক সুস্থতার তথ্যও আশা জাগাচ্ছে মানুষের মনে। জানা যায়, করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহার হওয়া জীবন রক্ষাকারী যে কোনো ওষুধ দ্রুতগতিতে উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় চলে যাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে প্রথম ‘জীবন রক্ষাকারী’ ওষুধ ডেক্সামেথাসন বাংলাদেশেও ব্যবহার হচ্ছে। ডেক্সামেথাসন প্রয়োগে যুগান্তকারী ফলাফল পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা। কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য লাগছে বা ভেন্টিলেটরে রয়েছে এমন করোনা রোগীদের দেহে এ ওষুধ প্রয়োগ করে দেখা গেছে, তাদের এক-তৃতীয়াংশ প্রাণে বেঁচে যাচ্ছেন। ওষুধটি বাংলাদেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় প্রণীত জাতীয় নির্দেশিকায় ডেক্সামেথাসন প্রয়োগের কথা বলা আছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় হাসপাতালে এ ওষুধটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলও ভালো পাওয়া গেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান সীতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, ওষুধটি বাংলাদেশে সুলভ মূল্যে বড় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই তৈরি করছে বহু বছর ধরে। শুধু ডেক্সামেথাসন নয়, সম্প্রতি কভিড-১৯ রোগের চিকিৎসায় যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এফডিএর অনুমোদন পাওয়া অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ রেমডেসিভিরও ব্যবহার হচ্ছে বাংলাদেশে। শুধু ব্যবহার নয়, এর উৎপাদনও শুরু হয়েছে দেশেই। ছয়টি ওষুধ কোম্পানিকে দেশে করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ওষুধ রেমডেসিভির উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর। অন্যদিকে, চলতি মাসে বাংলাদেশে শুরু হতে পারে চীনের করোনার  ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাকের অংশীদার হিসেবে এই পরীক্ষা চালাবে। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, সিনোভ্যাকের ইনঅ্যাক্টিভেটেড করোনাভ্যাক ভ্যাকসিনটি দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে। ১৩ জুন তারা ৭৪৩ জনের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা চালিয়েছিল, যাতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি এবং প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। চীন ও ব্রাজিলে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চালাবে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া বার্ষিক ১০ কোটি ডোজ তৈরির জন্য কারখানা তৈরি করছে তারা। গত মাসে সিনোভ্যাক একাডেমিক জার্নাল সায়েন্সে তাদের গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে, যাতে করোনাভ্যাক নামে তাদের ভ্যাকসিনটি বানরের ওপর পরীক্ষায় সফল বলে জানানো হয়। এটি বানরের শরীরে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার নতুন করোনাভাইরাস রোগের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের দাবি করেছে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিষ্ঠান এই টিকা উদ্ভাবনের দাবি করল। প্রতিষ্ঠানটি গত ৮ মার্চ এই টিকা তৈরির কাজ শুরু করে। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সব ধাপ পার হতে পারলে আগামী ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে টিকা বাজারে আনা সম্ভব হবে। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, করোনাভাইরাসের ১৪০টির বেশি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। ১২৫টি প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপে, ১৪টি প্রথম ধাপে, ১১টি দ্বিতীয় ধাপে, ৩টি তৃতীয় ধাপে ও ১টি ভ্যাকসিন অনুমোদন পেয়েছে। অনুমোদন পাওয়া ভ্যাকসিনটি চীনের ক্যানসিনো বায়োলজিকসের। চীনের ক্যানসিনো বায়োলজকিস ও চীনের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ বেইজিং ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি তৈরি ভ্যাকসিনটি সামরিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য এটি অনুমোদন পেয়েছে। তবে কীভাবে বণ্টন করা হবে, তা পরিষ্কার নয়। পশ্চিমা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি রাখা হয়েছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা মিলে যে ভ্যাকসিন তৈরি করছে তার ওপর। বলা হচ্ছে, এটি মানুষের শরীরে শক্তিশালী প্রতিরোধী ব্যবস্থা তৈরি করে। এখন যুক্তরাজ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা হচ্ছে এই ভ্যাকসিনের। এ ছাড়া তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে। মার্কিন জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মডার্না এমআরএনএভিত্তিক ভ্যাকসিন নিয়েও রয়েছে আশা। পরীক্ষায় দ্বিতীয় ধাপে থাকা অন্য ভ্যাকসিন উৎপাদকদের মধ্যে রয়েছে উহান ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টস ও সিনোফ্রাম, বেইজিং ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্টস ও সিনোফ্রাম, সিনোভ্যাক, নোভাভ্যাক্স, বায়ো এন টেক, ফসুন ফার্মা ও ফাইজার। এদিকে প্রথম ধাপে থাকা আলোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল বায়োলজি, চাইনিজ একাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্সেস, ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালস, জেনেক্সিন কনসোর্টিয়াম, গামেইলা রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ক্লোভার বায়োফার্মাসিউটিক্যালস ইনকরপোরেশন, গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন, ডায়ানাভ্যাক্স, আনহুই জেইফি লংকম বায়োফার্মিসিউটিক্যাল, ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোবায়োলজি, চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, কিউরভ্যাক, পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) একাডেমি অব মিলিটারি সায়েন্সেস ও ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেক। এর বাইরে ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন ও মারডক চিলড্রেনস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১০০ বছর পুরনো যক্ষ্মার টিকা নিয়ে তৃতীয় ধাপের একটি পরীক্ষা চালাচ্ছে। এ ভ্যাকসিন সরাসরি কভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা দেবে না, তবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেবে। জাপানের অ্যানজিস ভ্যাকসিনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে করোনার ভ্যাকসিনের ১০ লাখ ডোজ উৎপাদন করতে চাইছে প্রতিষ্ঠানটি। অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি ভ্যাকসিন প্রথম ধাপে ভ্যাকসিনের পরীক্ষা শুরু করেছে। গত বুধবার কভিড-১৯ প্রতিরোধে পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনের ইতিবাচক ফল পাওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ফাইজার ও জার্মান কোম্পানি বায়ো এন টেক। ভারতের হায়দরাবাদভিত্তিক ভারত বায়োটেক ‘কোভ্যাকসিন’ নামের একটি ভ্যাকসিন উৎপাদনে সফল হওয়ার দাবি করেছে। বিশ্বজুড়ে যে ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে, এতে এটা ভারতের প্রথম ভ্যাকসিন। এ ভ্যাকসিন তৈরিতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি (এনআইভি) একত্রে কাজ করছে। আগামী ১৫ আগস্টের আগে এটি বাজারে আনতে চায় ভারত।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর