শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:১৯

ডিসেম্বরেই টিকা যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য জার্মানির

আ স ম মাসুম, যুক্তরাজ্য

ডিসেম্বরেই টিকা যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য জার্মানির

যুক্তরাষ্ট্রের আগেই ফাইজার ও বায়োএনটেকের টিকার অনুমোদন দিয়ে দিতে পারে যুক্তরাজ্য। এ জন্য আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকে (এনএইচএস) প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

২২ নভেম্বর দ্য টেলিগ্রাফ সাইট এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান। সরকারের একাধিক সূত্রের বরাতে তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সপ্তাহেই টিকার অনুমোদন মিলে যেতে পারে। যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রকরা টিকার আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন শুরু করতে চলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ২০ নভেম্বর বলেছে, তারা ১০ ডিসেম্বর টিকার অনুমোদন-সংক্রান্ত একটি বৈঠকে বসবে। অবশ্য যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রথম টিকা দেওয়ার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নিয়ে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের একজন মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাজ্যের টিকা দেখভালের দায়িত্বে থাকা মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথ কেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি (এমএইচআরএ) ফাইজারের টিকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন। তাদের টিকার চূড়ান্ত তথ্য মূল্যায়নে যত দিন সময় লাগবে, তা নিতে পারে। কভিড-১৯ টিকা দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যাপক পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সরকার এমএইচআরএকে ফাইজারের টিকাটি পরীক্ষার নির্দেশ দেয়। ইতিমধ্যে দেশটি ৪ কোটি ডোজ টিকার ফরমাশ দিয়েছে। তবে এ বছর ১ কোটি ডোজ টিকা পাওয়ার আশা করছে, যা দেশটির ৫০ লাখ মানুষের সুরক্ষায় যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ রবিবার বলেছেন, জানুয়ারি থেকে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করবে তার দেশ। তিন মাসের মধ্যে দেশটির মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য টিকা নিশ্চিত করা হবে। পেড্রো বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে স্পেন ও জার্মানির সম্পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচির পরিকল্পনা নেওয়া আছে। স্পেনে আগামী জানুয়ারিতে টিকা দেওয়ার জন্য ১৩ হাজার টিকাদান কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টিকাদান কর্মসূচির প্রধান মনসেফ স্লাউয়ি টিকা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট তারিখের কথা বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা প্রথম ১১ ডিসেম্বর টিকা পেতে পারেন। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মনসেফ বলেন, অনুমোদন পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকাদান কেন্দ্রে টিকা পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তাই আশা করা যাচ্ছে, অনুমোদনের পরদিনই বা দুই দিনের মধ্যেই টিকা দেওয়া শুরু হবে। সম্ভাব্য তারিখ হতে পারে ১১ বা ১২ ডিসেম্বর। জার্মানিও আগামী মাসে কভিড-১৯ টিকা দেওয়া শুরু করতে পারে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেন্স স্প্যান সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য দেন। তিনি বলেন, ‘এ বছর ইউরোপে একটি টিকার অনুমোদন হবে বলে আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে।’ তিনি জার্মান সরকারকে টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে টিকাদান কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার কথা বলেছেন। দেশটি বিভিন্ন চুক্তি করে ৩০ কোটি ডোজের বেশি টিকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে রেখেছে। স্প্যান বলেছেন, তারা যে টিকার ফরমাশ দিয়ে রেখেছেন তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। দরকার পড়লে অন্য দেশের সঙ্গে ভাগাভাগিও করা যাবে।

করোনার কোন টিকার দাম কেমন

মডার্না : যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি মডার্না ইনকরপোরেশনের দাবি, তাদের তৈরি টিকা করোনা ঠেকাতে ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কার্যকর। তৃতীয় পর্যায়ের ফলের ওপর ভিত্তি করে পাওয়া তথ্যের কথা উল্লেখ করে সম্প্রতি এমন দাবি করেছে মডার্না। মডার্নার আশা, তাদের টিকা রেফ্রিজারেটরে ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। আর মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এটা সংরক্ষণ করা যাবে ছয় মাস। ক্রয়াদেশের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সরকারের কাছে প্রতি ডোজ করোনা টিকার দাম ২৫ থেকে ৩৭ ডলার করে রাখবে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কোম্পানি মডার্না। মডার্নার প্রধান নির্বাহী স্টিফেন ব্যানসেল জার্মানির একটি সাপ্তাহিককে এ কথা জানিয়েছেন। তবে আগস্টে মডার্না জানিয়েছিল, টিকার প্রতিটি ডোজের দাম তারা রাখতে পারে ৩২ থেকে ৩৭ ডলার। তবে উৎপাদন বেশি হলে দাম কমে আসতে পারে।

ফাইজার-বায়োএনটেক : প্রথমে নতুন টিকা দিয়ে কভিড-১৯ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষার দাবি করেছিল ফাইজার-বায়োএনটেক। মডার্নার টিকার কার্যকারিতার ফল প্রকাশের পর আরেক বক্তব্যে ফাইজার কার্যকারিতার নতুন তথ্য জানায়। ফাইজার দাবি করে, তাদের টিকা করোনা ঠেকাতে প্রায় ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তবে তাদের টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে হবে। ফাইজার-বায়োএনটেক জানিয়েছে, তাদের তৈরি টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়তে পারে ২০ ডলার করে। সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি বলছে, সেটি সত্যি হলে মডার্নার চেয়ে ফাইজারের টিকার দাম কম হতে পারে।

স্পুটনিক ফাইভ : এদিকে মঙ্গলবার রাশিয়ার গামালেয়া রিসার্চ সেন্টার ঘোষণা দিয়ে জানায়, তাদের তৈরি স্পুটনিক ফাইভ টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। আরটি ও এফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। তবে রাশিয়ার করোনা টিকার কার্যকারিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব সন্দিহান। মঙ্গলবার টিকাটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগের দ্বিতীয় অন্তর্র্বর্তীকালীন বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে বলে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পুটনিক ফাইভ নামের করোনা টিকাটি ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যাবে। রুশ টিকা প্রস্তুতকারী সংস্থাটির দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে স্পুটনিক ফাইভের প্রতি ডোজ ১০ ডলারের কম মূল্যে পাওয়া যাবে। করোনা ঠেকাতে এ টিকার দুটি ডোজ নেওয়ার নিয়ম। রাশিয়া বলছে, নিজেদের জনগণের জন্য এ টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হবে। টিকাটির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গামালেয়া রিসার্চ সেন্টার, রাশিয়া ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (আরডিআইএফ) ও রুশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার ৪২ দিন পর পাওয়া প্রাথমিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এটি নির্ধারিত হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, প্রথম দফায় একটি ডোজ দেওয়ার ২৮ দিন পর টিকাটির কার্যকারিতা ছিল ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ। তখন ৩৯ জনের ওপর এ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছিল। ৪২ দিন পর টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগের পর এর কার্যকারিতা পাওয়া গেছে ৯৫ শতাংশ। তবে এ ধাপে কতজনের ওপর টিকা প্রয়োগ করা হয়েছিল সে ব্যাপারে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। গামালেয়া রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক আলেকজান্ডার গিন্টসবার্গ বিবৃতিতে বলেন, টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার এক সপ্তাহ পর দ্বিতীয় বিশ্লেষণের উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এর অর্থ হলো, তাদের দেহ দুটি ডোজের ক্ষেত্রেই আংশিকভাবে সাড়া দিয়েছে। তিনি জানান, টিকাটির কার্যকারিতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্পুটনিক ফাইভের প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছিল ২২ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে। আর দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ করা হয় ১৯ হাজার জনের ওপর। এ সময় রাশিয়ার বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভেনেজুয়েলা, বেলারুশ ও অন্যান্য দেশের মানুষের ওপর স্পুটনিক ফাইভের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা : যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনার টিকা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে। সদ্যই এ খবর পাওয়া গেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে মার্কিন কোম্পানি ফাইজার ও মডার্না তাদের তৈরি টিকা ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দিতে পারে বলে দাবি করে। তবে ওই দুই টিকার চেয়ে অক্সফোর্ডের টিকার দাম বেশ কম। আর জটিলতাও কম এর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে। ‘দ্য ল্যানসেট’-এ অক্সফোর্ডের টিকার দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষার ফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের দেহেও এ টিকার রোগ প্রতিরোধ-সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া ভালো। গবেষকরা বলছেন, বয়স্ক মানুষের দেহে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনাভাইরাসের টিকার প্রতিক্রিয়া ‘উৎসাহব্যঞ্জক’। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার বরাত দিয়ে ফিন্যানশিয়াল টাইমস জানিয়েছে, তাদের টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়তে পারে ৩ থেকে ৪ ডলার। প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জানাচ্ছে, অক্সফোর্ডের টিকা অলাভজনকভাবে বাজারজাত করা হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী পৌঁছে দেওয়া হবে বিশ্বের সব প্রান্তে। ভারতের টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ডের টিকা উৎপাদন করবে বলে জানিয়েছে। সেরামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদর পুনাওয়ালা বৃহস্পতিবার এক সম্মেলনে বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ভারতে অক্সফোর্ডের টিকা পাওয়া যেতে পারে। তবে তখন সে টিকা বরাদ্দ থাকবে শুধু স্বাস্থ্যকর্মী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য। আর এপ্রিলের মধ্যে ভারতের সাধারণ মানুষের জন্য অক্সফোর্ডের টিকা সহজলভ্য হতে পারে। ওই টিকার দুই ডোজের দাম পড়বে সর্বোচ্চ ১ হাজার রুপি।

জনসন অ্যান্ড জনসন : এ প্রতিষ্ঠানের তৈরি টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে এখনো স্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে টিকাটি এক ডোজের হওয়ার কথা। সেদিক থেকে অন্যান্য টিকার তুলনায় জনসনের টিকা একটু আলাদা। এরই মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে ৬০ হাজার মানুষের ওপর এ টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির খবরে জানা গেছে, জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা স্বাভাবিক পদ্ধতিতে রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা যাবে। প্রতি ডোজের দাম পড়তে পারে ১০ ডলার করে। এরই মধ্যে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা নিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশ আগাম ফরমাশ দিয়েছে।


আপনার মন্তব্য