শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৩৩

অভিজিৎ হত্যায় জিয়াসহ পাঁচ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড

আদালত প্রতিবেদক

অভিজিৎ হত্যায় জিয়াসহ পাঁচ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড

ব্লগার অভিজিৎ হত্যা মামলার রায়ে পাঁচ জঙ্গিকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি এক জঙ্গিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান ও বরখাস্ত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক, জঙ্গিনেতা আকরাম হোসেন ওরফে আবির ওরফে আদনান, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ও আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম। যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত হলেন শফিউর রহমান ফারাবী। এদের মধ্যে আসামি জিয়াউল হক ও আকরাম হোসেন পলাতক। বাকি আসামিরা কারাগারে আছেন।

বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্য হলো জননিরাপত্তা বিঘিœত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ ও নিরুৎসাহ করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশ না করতে পারেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণকে মত প্রকাশ ও স্বাধীন কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত আসামিদের কারও ভূমিকা ছোট বা বড় করে দেখার সুযোগ নেই। রায়ে বিচারক বলেন, অভিজিৎ রায় হত্যায় অংশগ্রহণকারী অভিযুক্ত আসামিরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহী হবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তমনা লেখকরা স্বাধীনভাবে লিখতে এবং মত প্রকাশ করতে সাহস পাবেন না। কাজেই আসামিরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারে না। তাই সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ৬(২)(অ) ধারায় এই পাঁচ আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড দেওয়া হলেই নিহতের স্বজনরা শান্তি পাবেন এবং মুক্তমনা লেখকরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সাহস পাবেন। অন্যদিকে জঙ্গিরা ভবিষ্যতে এমন জঘন্য অপরাধ করতে ভয় পাবে এবং নিরুৎসাহিত হবে। এ ছাড়া অপর আসামি উগ্রপন্থি ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবী এই হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত না থাকলেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে অভিজিৎ রায়কে হত্যার প্ররোচনা দেওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়াই সমীচীন। রায় ঘোষণা উপলক্ষে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয় আদালত এলাকায়। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সকাল ১০টার দিকে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার পর দন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় অভিজিৎকে। হামলায় অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদও গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে মামলা তদন্ত করে ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রযুক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর আসামি আবু সিদ্দিক সোহেলকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। অভিজিৎ হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন সোহেল। আদালতে সে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সোহেলকে প্রটেক্টেড টেক্সট আইডি খুলে দেয় চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া। আসামি আকরাম ও মোজাম্মেল এলিফ্যান্ট রোডে ভাড়া বাসায় থাকত। সোহেলকে আসামি মোজাম্মেল জানায়, অভিজিৎ রায় একজন বড় মাপের নাস্তিক। এ ছাড়া সোহেলকে অভিজিতের ছবি দেখায় আসামি আকরাম। ২৬ ফেব্রুয়ারি সোহেল, আকরাম, মোজাম্মেল ও হাসান এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় যায়। সেখানে মোজাম্মেল সবাইকে বুঝিয়ে দেয়, বইমেলায় কে কোথায় থাকবে, কীভাবে তারা অভিজিৎকে অনুসরণ করবে। সেদিন মোজাম্মেল সবাইকে জানায়, অভিজিৎ বইমেলায় এসেছেন। মোজাম্মেল আনসার আল ইসলামের অপারেশন শাখার মুকুল রানাকে খবর দেয়। সেদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে অভিজিৎ ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বইমেলা থেকে বের হয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের উত্তর-পূর্ব রাস্তার ফুটপাথের ওপর আসেন। তখন আনসার আল ইসলামের অপারেশন শাখার চারজন অভিজিৎকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় তার স্ত্রী রাফিদা বাধা দিলে তাকেও কুপিয়ে বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে ফেলে জঙ্গিরা। তখন চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া, সেলিম, আকরাম, হাসান, মোজাম্মেল, আবু সিদ্দিক সোহেল ও মুকুল রানা চারপাশে গার্ড হিসেবে অবস্থান নেয়, যাতে হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া জঙ্গিরা সেখান থেকে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারে। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্যে রেকি করাসহ হত্যাকান্ডে সহায়তা করে আসামি সোহেল। হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় আসামি মোজাম্মেল। আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিজিৎ রায় হত্যায় মোট ১২ জন জড়িত ছিল। তাদের মধ্যে হত্যায় প্ররোচনা জোগায় শফিউর রহমান ফারাবী। আসামিদের মধ্যে মুকুল রানা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে।

এই বিভাগের আরও খবর