শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ জুন, ২০২১ ০০:০৩

দেশে বাড়ছে মানসিক রোগী

২০১৮-১৯ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী ১ কোটি ৭৭ লাখ মানুষ মানসিক রোগে ভুগছেন, ২০০৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২২ লাখ ৪৪ হাজার, এদের ৯২ শতাংশ চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না, করোনাকালে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা

মাহমুদ আজহার ও জয়শ্রী ভাদুড়ী

দেশে বাড়ছে মানসিক রোগী
Google News

সোমবার, বেলা বারোটা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালের বহির্বিভাগে অপেক্ষমাণ রোগীদের জন্য রাখা বেঞ্চে বসে একমনে কথা বলছে এক কিশোরী। তার পাশে বসে অঝোরে কাঁদছেন মা। একটু কাছে গিয়ে খেয়াল করলে কানে আসে কিছু কথা। মেয়েটি বলছে, ‘আম্মাকে বলি আমার বেড়াতে ভালো লাগে, সাঁতার কাটতে ভালো লাগে। কিন্তু আমাকে পানিতে নামতে দেয় না।’ সমস্যা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে মেয়েটির মা হাজেরা বেগম বলেন, তার দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে ছোট ১৩ বছরের তানিয়া। পড়াশোনায় মেধাবী তানিয়া নিয়মিত স্কুলে যেত, পড়াশোনা করত। করোনাকালে তার স্কুলের ক্লাস, প্রাইভেট টিউশন সব চলছে অনলাইনে। সে খুব মনোযোগী লেখাপড়ায়। কিন্তু ছয় মাস আগে তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। অনিয়মিত ঘুম, খাওয়া এবং অসংলগ্ন কথা বলতে থাকে। কিছুদিন ধরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা মানসিক হাসপাতালে এনেছেন। ডাক্তার বহির্বিভাগে দেখেছেন আরও কিছু পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। হতাশা, বিষণ্নতা ও অবসাদ থেকে ভয়াবহ আকারে বাড়ছে মানসিক রোগী। সর্বশেষ জাতীয় জরিপে দেখা যায় দেশে প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গত ১৪ বছরে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগী বেড়েছে ৫৪ লাখ ৫৯ হাজার ৮৩৮ জন। করোনাকালে এ পরিস্থিতি আরও ব্যাপক রূপ নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, চারদিকের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ থেকে এবং আমাদের রোগী দেখার অভিজ্ঞতায় বলছি মানসিক রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। নতুন ধরনের জীবন ধারায় মানসিক ভারসাম্য হারানোর উপাদান বেড়ে যাচ্ছে। জীবিকার সংকট, ভয়, আতঙ্ক, চোখের সামনে বীভৎস মৃত্যু দেখা, নৃশংসতা আমাদের মানসিক রোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।  তিনি বলেন, মানসিক সমস্যা বাড়ছে। মানুষের সহ্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। পারিবারিক সহিংসতা বহু গুণ বেড়েছে। দেশে এলএসডির মতো মাদক সেবন চলছে, মাদকাসক্ত হচ্ছে মানুষ, আত্মহত্যা বাড়ছে। সন্তানকে হত্যা করছে, স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে, মানুষকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করছে। এ রকম ঘটনা আগেও ঘটত কিন্তু ইদানীং আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালে দেশে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৫ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৫ জন। আর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী সে সময় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ ওই সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ৪৪ হাজার ৩১৯ জন। এর পরে সর্বশেষ ২০১৮-১৯ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে উঠে আসে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ১৭ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। ২০১৮ সালে দেশে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ১০৫ জন। সে হিসাবে মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ ৪ হাজার ১৫৭ জন। এসব ব্যক্তির ৯২ শতাংশ চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা সেবা নেন না। জরিপে জানা যায়, ১৮ শতাংশ শিশু-কিশোরের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আছে। তাদের ৯৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেয় না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হিসাবে, দেশের সাড়ে ১৬ কোটির বেশি মানুষের জন্য মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন ২৭০ জন। আর কাউন্সেলিংয়ের জন্য সাইকোলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ২৫০ জন। যেখানে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষের কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এর চিকিৎসায় পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। রয়েছে অবকাঠামো সংকট। সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে দুটি, ঢাকা ও পাবনায়। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, ঢাকায় সরকার অনুমোদিত বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল আছে ১৫টি।  

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত বছর করোনাকালে হাসপাতালে সব বিভাগ মিলিয়ে সেবা নিয়েছেন ৪৯ হাজার ১১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২০ হাজার ৫৮২ জন, নারী ১৬ হাজার ৪৮০ জন এবং শিশু ৫ হাজার ৮৫১ জন। দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় গত বছর তুলনামূলক কম রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। ২০১৯ সালে এই হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা নিয়েছেন ৬৭ হাজার ৪৭৪ জন। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ৬৩ হাজার ৬৬২ জন, ২০১৭ সালে ৫৮ হাজার ৯৮৪ জন এবং ২০১৬ সালে ৫৫ হাজার ৩৬৭ জন মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা নিয়েছেন। এই হাসপাতালে ২০১৬-১৯ সাল পর্যন্ত চিকিৎসা নেওয়া রোগীর পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রতিবছর রোগীর গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। ২০২০ সালে দেশের আরেক বিশেষায়িত হাসপাতাল পাবনা মানসিক হাসপাতালে সেবা নিয়েছেন ৫৪ হাজার ৭১ জন। ২০১৯ সালে বর্হিবিভাগে সেবা নিয়েছেন ৫১ হাজার ৩৪১ জন। সেখানেও প্রতিবছর বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মানুষের মানসিকতা তৈরি হয় সামাজিক পরিবেশ থেকে। আমরা ইদানীং নৃশংসতা দেখছি মানুষের আচরণে। যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা খুব সহজ হয়ে গেছে। ফলে আমাদের দেশের বিভিন্ন ঘটনা ছাড়াও অন্যান্য দেশের ঘটনাবলিও মানুষের আচরণে প্রভাব বিস্তার করছে। বিশ্বজুড়ে যৌনতা ও মাদক নিয়ে বাণিজ্যের এক বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। এই অপরাধ ও সামাজিক বৈষম্য টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় সন্ত্রাসমূলক কাজ। এই প্রত্যেকটা বিষয় আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। এর প্রকাশ হিসেবে সম্প্রতি নৃশংস কতগুলো ঘটনা আমাদের দেশে ঘটেছে। এটা একদিনে হয়নি, দীর্ঘদিনের ফল। টিকটকের মাধ্যমে নারী পাচার হচ্ছে। প্রযুক্তিকে অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার করছে মানুষ। এসব সামাজিক অসুস্থতার প্রকাশ।’

করোনা মহামারীতে জীবন-জীবিকা এলোমেলা হয়ে গেছে। কর্মহারা হয়ে পড়ছে মানুষ, এক বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তালা। শিক্ষা জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়া শিশু-কিশোর-তরুণদের আসক্তি বাড়ছে ইউটিউব, টিকটক, লাইকিসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সার্বিক এই পরিস্থিতি তাদের মনোজগতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এর প্রমাণ মিলেছে অল্প পরিসরে হওয়া কিছু গবেষণায়। গত বছরের ১৯-২৮ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ৫০৯ জন শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা মূল্যায়ন নিয়ে গবেষণা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাহিদা সালমার নেতৃত্ব্ েপাঁচ সদস্যের গবেষণা দলে ছিলেন পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ খায়রুল আলম, ফেরদৌস বিন আলী, রাজন বণিক ও সাবিনা ইয়াসমিন। এই গবেষণা প্রতিবেদনটি জার্মান পাবলিক হেলথ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। গবেষণার ফলে দেখা যায়, এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ হালকা, ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ মধ্যম, ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ মাঝারিভাবে মারাত্মক এবং ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। পরিবারের সদস্যদের করোনা আক্রান্ত হওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অধিক ব্যবহার এবং ধূমপানের অভ্যাস শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতির কারণ।

এ ছাড়া মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, রাজু মাহমুদ, নাজমুল হোসাইন, শরিফ হোসাইন, রাজন বণিক ও সাবিনা ইয়াসমিনকে সঙ্গে নিয়ে করোনাকালে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে নাহিদা সালমার আরেকটি গবেষণা প্রকাশ পায়। গত বছরের ২৫ এপ্রিল-৯ মে পর্যন্ত ১৫ বছরের কম বয়সী ৩৮৪ জনের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, ৪৩ শতাংশ শিশু অতি অল্প মানসিক অস্থিরতায় ভুগছে, ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ অল্পভাবে, ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ পরিমিত মাঝারিভাবে, ৭ দশমিক ২ শতাংশ শিশু মারাত্মকভাবে অস্থিরতায় ভুগছে।

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি জানতে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এ সময় মানুষের উদ্বেগ ও বিষণœতার হার কয়েক গুণ বেড়েছে। আয় সংকুচিত হয়ে মানুষের হতাশা বাড়ছে, মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট দেখা দিচ্ছে। আমরা হয়তো একদিন করোনাভাইরাসের থাবা থেকে মুক্ত হব। কিন্তু আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। মহামারী করোনার প্রতিঘাতে সব বয়সী মানুষকেই মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে। বিশেষ করে কিশোর-তরুণদের মধ্যে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

এই বিভাগের আরও খবর