শিরোনাম
সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

দায় নিচ্ছে না কেউই

পূজামন্ডপে হামলা মৃত্যু ও অন্যান্য ঘটনায় গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি স্থানীয় এমপি ও রাজনৈতিক ব্যর্থতাও আলোচনায়, পীরগঞ্জে ২৫ বাড়িতে আগুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দশ জেলায় পূজামন্ডপে হামলা, ভাঙচুর ও প্রাণহানির দায় নিচ্ছে না কেউ। চলছে পারস্পরিক দোষারোপ। কেউ দুষছে প্রশাসনকে। কেউ বলছে গোয়েন্দা ব্যর্থতার কথা। রাজনৈতিক মহলে গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ঠেকানো না গেলেও হামলা ও প্রাণহানির পর কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। দেশের বিভিন্ন জেলায় মামলার পর গ্রেফতার অভিযান চলছে। প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে কর্মসূচিও পালন হয়েছে কয়েকটি স্থানে।

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাস গুপ্ত গতকাল দুপুরে চৌমুহনী গিয়ে নোয়াখালীর ডিসি ও এসপির অপসারণ দাবি করেছেন। নোয়াখালীর চৌমুহনী পৌর এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দোকানপাট, একাধিক মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার জন্য তিনি তাদের অপসারণ চান। গতকাল দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন মন্দির পরিদর্শন শেষে রানা দাস গুপ্ত বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ এ জাতীয় আইনের আওতায় সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে চিহ্নিত করে তাদের অনতিবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং মন্দিরগুলোর যা ক্ষতি হয়েছে এটি পুনরায় নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন জায়গায় মন্দিরে হামলার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। হামলাকারীদের উদ্দেশ্য হলো, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে যে উন্নয়ন হয়েছে সে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিদেশে বিনষ্ট করা এবং এই জাতীয় হামলার মধ্য দিয়ে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা। পরে গত রাতে ফেনীতে বিভিন্ন মন্দির পরিদর্শন করে রানা দাশ গুপ্ত বলেন, ফেনীতে মন্দিরসহ হিন্দুদের অনেক দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও ফেনীর এমপি, জেলা প্রশাসকের কোনো ভূমিকা ছিল না। তারা মাঠে আসেননি। অতীতেও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে, নারীদের নির্যাতন করা হয়েছে। তার কোনো বিচার না হওয়ায় আজ এ ঘটনা ঘটছে। জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কুমিল্লার এ ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হয়নি। তিনি বলেন, বেশ কিছু দিন আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল এবার দুর্গা পূজায় মৌলবাদী সংগঠনগুলো কোনো তৎপরতা চালাতে পারে। তাই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উচিত ছিল এ বিষয়টি কঠোর নজরদারিতে রাখা। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় প্রশাসনও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সৌদিফেরত একটা লোক ওসির সামনে ফেসবুক লাইভে নানা ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছিল। অথচ ওসি সেই লাইভ বন্ধের কোনো ব্যবস্থাই নেননি। আর বিদেশে থাকা সাইবার সন্ত্রসীরা তো প্রস্তুতই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে তারা এই ভিডিও ভাইরাল করে দিয়েছে। তাই আমি বলব, এখানে সবাই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মীজানুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দোষারোপের রাজনীতির কারণে প্রকৃত অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যাবে। এখন রাজনৈতিক ব্লেইম গেম চলছে। এটা বন্ধ করতে হবে। কুমিল্লার ঘটনায় সরকার এবং সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করতে হবে। এ ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়াতে যাওয়ার পর যেসব এলাকায় ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা হলো, প্রত্যেকটি ঘটনা খতিয়ে দেখে প্রকৃত আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু দেখা গেছে, কোনো ঘটনারই তেমন বিচার হয়নি। ২ থেকে ২০ জনের নামে মামলা হয়, গ্রেফতার হয় আবার তারা বেরিয়ে যায়। যার ফলে এসব ঘটনা ঘটছে। এটাই যেন শেষ ঘটনা হয়, সে জন্য ব্লেইম গেম বন্ধ করে প্রকৃত আসামিকে সরকারকেই চিহ্নিত করতে হবে। এটা সরকারের দায়িত্ব।  হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বলছে, এবার দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন দিনে ৭০টি পূজামন্ডপে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিবাদে ২৩ অক্টোবর ঐক্য পরিষদের ডাকা ছয় ঘণ্টার অনশন ও গণঅবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। এ কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো। 

নোয়াখালীতে গ্রেফতার ৪৪ : নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত ৪৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ছয়টি মামলা করেছে। এ নিয়ে বেগমগঞ্জ চৌমুহনীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ১৮টি মামলা করেছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও বিজিবিসহ যৌথ বাহিনী মাঠে রয়েছে। নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলাম পিপিএম জানান, পরিস্থিতি এখন শান্ত। পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ খুব শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

সিলেটে গ্রেফতার ১২, আসামি ২৫০ : সিলেট থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সিলেট নগরীর আখালিয়ার হালদারপাড়ায় দুর্গা পূজামন্ডপে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছেন সিলেটের জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান। এর আগে শনিবার রাতে এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৪২ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়।

চট্টগ্রামে আরও গ্রেফতার : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে হামলার ঘটনায় শনিবার দিবাগত রাতে আরও চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে শনিবার সকালে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলার পর ৮৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরও ৫০০ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়।

ফেনীতে দুই মামলায় আসামি ৪০০ : ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীর ট্রাঙ্ক রোডসহ শহরের বিভিন্ন সড়কে দাঙ্গা-হামলা, দোকান ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। একটি মামলায় ১০০-১৫০ জন ও অপর মামলায় ২০০-২৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। ফেনী শহরের মন্দিরগুলোতে পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছে। শনিবার বিকালে ফেনী বড় মসজিদ ও কালি বাড়ির সামনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি প্রতিবাদ সভাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও দাঙ্গা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ফেনী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জসহ ৪০ জন আহত হন। রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দুই শতাধিক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। রবিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল এ এস এম ইউছুফ, ফেনী জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসান, পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী, পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী প্রমুখ। ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন জানান, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে আসামিদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে।

চাঁদপুরে আরও আটক : চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায় বুধবার রাতে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষের ঘটনায় শনিবার রাতে ও রবিবার ভোরে হাজীগঞ্জ থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও আটজনকে আটক করা হয়েছে। পরে রবিবার বিকালে আদালতের মাধ্যমে সবাইকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সভা মানববন্ধন : কুমিল্লার ঘটনার প্রতিবাদ, ’৭২-এর সংবিধানে ফেরা, জাতীয় চার মূলনীতিসহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার দাবিতে গতকাল রাজশাহীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে মানববন্ধন করেছে ওয়ার্কার্স পার্টি। মানববন্ধনে বক্তারা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে কুমিল্লায় ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে বলে মনে করেন। সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সামনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ। এ সময় বক্তারা বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা চলাকালীন কুমিল্লার নানুয়ার দীঘিরপাড় মন্দিরে পরিকল্পিতভাবে রেখে দেওয়া পবিত্র কোরআন শরিফকে নিয়ে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সৃষ্টি করা হয়েছে তা কোনো স্বাধীন দেশের সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে না। কুড়িগ্রামে জিরোপয়েন্ট শাপলা চত্বরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুড়িগ্রাম জেলা শাখা বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও হত্যা, মন্দির বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ সমাবেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সংগঠন সংহতি প্রকাশ করে অংশগ্রহণ করে।

পীরগঞ্জে ২৫ বাড়িতে আগুন : রংপুরের পীরগঞ্জে ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননা করে স্টাটাস দেওয়ার অভিযোগ তুলে একটি গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রায় ২৫ বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রাত ১০টার দিকে উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় করিমপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ গিয়ে টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে ওই গ্রামের সনাতনধর্মী এক যুবকের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ উঠে। এরপর কিছু লোক বড় করিমপুর গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের গ্রামে গিয়ে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। তারা সুবর্ণ রায়, সুধারামসহ প্রায় ২৫ জনের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। গত রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। ঘটনার পরপরই পুলিশ সুপার, র‌্যাব-১৩ এর অধিনায়ক, জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর