শনিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ টা

গতি নেই শিক্ষার প্রকল্পে

♦ দফায় দফায় বাড়ে মেয়াদ ♦ অনেক প্রকল্পের অগ্রগতি ১০ শতাংশের নিচে ♦ এক বছরে ১ শতাংশ অগ্রগতিও নেই আইসিটি প্রকল্পে

আকতারুজ্জামান

গতি নেই শিক্ষার প্রকল্পে

শিক্ষার বিভিন্ন প্রকল্প যেন এগোতেই চায় না। বছরের পর বছর চলা কোনো কোনো প্রকল্পের মেয়াদ শেষে দেখা গেছে, ১০ শতাংশ অগ্রগতিও নেই। আবার পুরো এক অর্থবছরে দেখা গেছে কোনো কোনো প্রকল্পের মোট এডিপি বরাদ্দের এক শতাংশ আর্থিক অগ্রগতিও হয়নি। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেরই বাড়ছে মেয়াদ। শিক্ষাবিদরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা আর অযোগ্যতার কারণেই শিক্ষার এসব প্রকল্পের সন্তোষজনক অগ্রগতি হচ্ছে না। তথ্যমতে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের অধীন নয়টি বিনিয়োগ প্রকল্প ও একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প চলমান। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে এডিপিভুক্ত উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি পর্যালোচনা সভার কার্যবিবরণ থেকে জানা গেছে, এসব প্রকল্প নিয়ে হতাশাজনক চিত্র। মাউশি অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদের সভাপতিত্বে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মাউশি অধীন মোট ১০ প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ আছে ২৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ১৪০০ কোটি টাকা। যা মোট এডিপি বরাদ্দের ৫১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। কিন্তু এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৭৬০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা মোট এডিপি বরাদ্দের মাত্র ২৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন (পর্যায় ২)’ প্রকল্পের। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা আগামী জুনে। ২০২০ সালের ৩০ জুন শেষ হয়েছে এ প্রকল্পের মেয়াদ। ইতোমধ্যে দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এ প্রকল্পের। সর্বশেষ বর্ধিত মেয়াদ অনুযায়ী আগামী জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু প্রায় ছয় বছর পরে এসে দেখা গেছে, এ প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিই হয়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ১৫০ কোটি টাকা এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭৯ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে এক শতাংশ আর্থিক অগ্রগতিও সাধিত হয়নি। জানা গেছে, এ প্রকল্পে প্রশিক্ষণ, সভা-সেমিনার আর ওয়ার্কশপ করে খরচ করা হয়েছে ১১৫ কোটি ৪৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। প্রশিক্ষণে ব্যয় হওয়া ১১৫ কোটি টাকাও জলে যাবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। কারণ, প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে একটি করে ডেস্কটপ কম্পিউটার, টেলিভিশন, ওয়াইফাই রাউটার, ইউপিএস ও পেনড্রাইভ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে আরও আধুনিক শিক্ষা উপকরণ বাজারে এসেছে। সংশোধিত ডিপিপির আলোকে নতুন করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, অনেক প্রকল্পে পরিচালকের কর্মসূচি বাস্তবায়নে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। ফলে যারা তুলনামূলক দক্ষ ও বিচক্ষণ তারা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারেন। কিন্তু অন্যরা পিছিয়ে যান। এ ছাড়া যোগ্য স্থানে যোগ্য ব্যক্তিরা আসীন না হওয়ায় প্রকল্প থেকে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না। এ শিক্ষাবিদ বলেন, প্রকল্পে অদক্ষ, অযোগ্যরা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেলে জাতি তার সুফল পায় না, কিন্তু ঋণের বোঝা ঠিকই বাড়ে।

‘শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জেলা সদরে অবস্থিত সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের উন্নয়ন’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী জুনে। গত ১২ বছর ধরে চলা এ প্রকল্পে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট আর্থিক অগ্রগতি তুলনামূলক ভালো হলেও চলতি অর্থবছরে ৩৮০ কোটি টাকা এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বর্তমান অর্থবছরে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় প্রকল্প পরিচালক মুহম্মদ নাসির উদ্দিন অনিষ্পন্ন কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বৃদ্ধি করতে সভায় অনুরোধ জানিয়েছেন। ‘তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজের উন্নয়ন’ প্রকল্প শুরু হয় গত ২০১২ সালের জুলাইয়ে। আগামী ডিসেম্বরে এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। চলতি অর্থবছরে ৪০০ কোটি টাকা এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৩ দশমিক ২ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক ড. আশফাকুস সালেহীন সভায় জানান, প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৬১০ টি কলেজ ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে ১ হাজার ৪২০ টি। গত ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ‘ন্যাশনাল অ্যাক্যাডেমি ফর অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজএ্যাবিলিটি’ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পের মোট আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ১৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক ড. মো. দিদারুল আলম প্রতিবেদককে জানান, প্রকল্পের অগ্রগতির বৃহৎ অংশই একাডেমি নির্মাণ নির্ভর। শিগগিরই এ নির্মাণ কাজ শুরু হবে। মামলাজনিত কারণে প্রায় তিন বছর একাডেমির নির্মাণ কাজ বিলম্বিত হওয়ায় প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি কম। প্রকল্পের চলমান কার্যক্রম বর্তমানে সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি। মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী প্রতিবেদককে বলেন, প্রতিটি প্রকল্পের একটি নির্ধারিত সময় ও উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে উদ্দেশ্যও অর্জন হয় না। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ‘ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্প গত বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। মেয়াদ শেষের পর এক বছর বাড়ানো এ প্রকল্পের অগ্রগতিও হতাশাজনক। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ১৬৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। যা মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ২০৫ কোটি টাকা এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৯৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা এডিপির মোট বরাদ্দের ৪৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় প্রকল্প পরিচালক ড. মীর জাহিদা নাজনীন জানান, প্রকল্পের অগ্রগতি মূলত জমি অধিগ্রহণের পর মূল্য পরিশোধে। প্রকল্পের আওতায় ১০টি জমির মধ্যে ৬টি অধিগ্রহণ কার্যক্রম ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয়ন’ প্রকল্প ২০১৭ সালে শুরু হয়। গত বছরের জুনে প্রকল্প কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ সাড়ে চার বছর পরে এসে মেয়াদ শেষে এ প্রকল্পের হতাশাজনক অগ্রগতির কারণে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়াতে হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত অগ্রগতি প্রাক্কলিত ব্যয়ের মাত্র ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। পর্যালোচনা সভায় প্রকল্প পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন না। প্রকল্পের আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী জুনে। এই প্রকল্পে চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত অগ্রগতি ৪৬৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। যা মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের মাত্র ১৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে আর্থিক অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয় বলে জানা গেছে। ‘নয়টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্প গত জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এই প্রকল্পে গত মে পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ছিল মাত্র ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অগ্রগতি সন্তোষজনক না থাকায় বাড়ানো হয়েছে এ প্রকল্পের মেয়াদ। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে এর অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে। প্রকল্প পরিচালক রায়হানা তসলিম সভায় জানান, বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণেই বড় একটি সময় চলে যায়। আর প্রকল্পের ব্যয় মূলত হয় জমির মূল্য পরিশোধ কেন্দ্রিক। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য তো প্রকল্প চলতে দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ করতে না পারলে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। প্রয়োজনে প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে। মহাপরিচালক বলেন, করোনার কারণে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এসব প্রকল্পের কার্যক্রম। অবকাঠামো সম্পর্কিত বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। এতেও প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর