শিরোনাম
বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০২২ ০০:০০ টা

ইন্টারপোলের লাল সতর্কতা এড়িয়ে কীভাবে ভারতে পি কে

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

ইন্টারপোলের লাল সতর্কতা এড়িয়ে কীভাবে ভারতে পি কে

হাজার হাজার কোটি রুপি আত্মসাতের অভিযোগে এরই মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট

ডিরেক্টরেটের (ইডি) হাতে গ্রেফতার হয়েছেন প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে পি কে হালদারসহ তার সহযোগীদের গ্রেফতার করেন ইডির কর্মকর্তারা। ১৪ মে পি কে হালদারের গ্রেফতারের পর পাঁচ দিন কেটে গেছে। ইতোমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। অভিযুক্তদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ইডির আইনজীবী। এমনকি উদ্ধার করা হয়েছে ১৫০ কোটির বেশি ভারতীয় রুপি। এমনকি পি কে হালদারের এই বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তারের পেছনে আর কোন কোন সহযোগী বা রাঘববোয়ালের হাত রয়েছে ইডি এরও একটা ইঙ্গিত পেয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। আর সেই সূত্র ধরেই চলছে নতুন করে তল্লাশি অভিযান। কখনো পি কে হালদারকে একা বসিয়ে, আবার কখনো দুজন বা সবাইকে একত্রে বসিয়ে ক্রস চেক করে নিতে চাইছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। আসলে তিন দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবারই পি কে হালদার, তার ভাই প্রাণেশ হালদার, স্বপন মৈত্র ওরফে স্বপন মিস্ত্রি, উত্তম মৈত্র ওরফে উত্তম মিস্ত্রি, ইমাম হোসেন ওরফে ইমন হালদার ও আমানা সুলতানা ওরফে শর্মি হালদারকে কলকাতার স্পেশাল (সিবিআই) আদালত-১-এ তোলা হলে পাঁচ পুরুষ অভিযুক্তকে ১০ দিনের রিমান্ডের নির্দেশ দেয় আদালত। অন্যদিকে অভিযুক্ত এক নারীকে ১০ দিনের জেল হেফাজত দেওয়া হয়। তদন্তে গতি আনতে পাঁচজনকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন- এ আবেদন জানিয়ে তাদের নতুন করে রিমান্ডে নিয়েছে ইডি। তাদের রাখা হয়েছে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির আঞ্চলিক কার্যালয়ে। স্বাভাবিকভাবেই নতুন নতুন তথ্যের সন্ধানে সবাইকে জেরার পর জেরা করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তবে তাদের মূল লক্ষ্য পি কে হালদার। এমনকি তদন্তের স্বার্থে গণমাধ্যমকর্মীদের এড়াতে অভিযুক্তদের সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বিধাননগর মহকুমার হাসপাতালে নিয়ে মেডিকেল চেকআপ বন্ধ করা হয়েছে। বদলে প্রতি ৪৮ ঘণ্টা অন্তর একজন মেডিকেল অফিসার সিজিও কমপ্লেক্সে আসবেন তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। সে ক্ষেত্রে আজ ফের তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হতে পারে। ১৪ মে পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগরসহ প্রায় ১১টি জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালিয়ে ‘টিম পি কে হালদার’-এর সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জেরায় ইডির কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতে এসে পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগরেই আসল নাম বদল করে শিবশঙ্কর হালদার নাম পরিচয় দিয়ে থাকতে শুরু করেন পি কে। এ দেশেই রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড ও আধার কার্ড বানিয়েছিলেন তিনি। ইডি এও জেনেছে, বাংলাদেশ, ভারত ও গ্রানাডা- এই তিনটি দেশের পাসপোর্টের অধিকারী ছিলেন তিনি। ইডির আইনজীবী জানান, একাধিক দেশের পাসপোর্ট ও সেই সব দেশের নাগরিকত্বের নথি পাওয়া গেছে পি কে হালদারের কাছ থেকে। যদিও কোনো একটি মহলের দাবি, তার কাছ থেকে কানাডার পাসপোর্টও পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড কর্নার সতর্কতা জারিও করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই সতর্কতা জারির মধ্যেও কীভাবে পি কে হালদার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেন। সাধারণত বাংলাদেশসহ বিদেশ থেকে ভারতে আসা কোনো ব্যক্তিকে ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট দেখানোর পর পাসপোর্ট স্ক্যানিং করার পর সেই ব্যক্তির বায়োমেট্রিক (চোখের মণির ছবি, আঙুলের ছাপ) করা হয়। সে ক্ষেত্রে পি কে হালদার তার আসল নাম বদল করে শিবশঙ্কর ধারণ করলেও সীমান্ত পেরোনোর মুহূর্তে বায়োমেট্রিক করার সময় তার আসল পরিচয় সামনে আসার কথা। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তিনি গ্রেফতার হতে পারেন- আগাম এ আশঙ্কার আঁচ করতে পেরেই কোনো একটি প্রভাবশালীর মদদে তিনি ইন্টারপোলের রেড কর্নার সতর্কতা জারি হওয়ার আগে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং ভারতে ফিরে অশোকনগরে শিবশঙ্কর নামের আড়ালে বসবাস শুরু করেন। আর সেখানেও পি কে হালদারের মাথার ওপর ছিল প্রভাবশালীদের হাত। কোনো একটি মহল বলছে, ভারত থেকেই ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে হয়তো তিনি কানাডায় যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে শিবশঙ্কর নামেই তিনি কানাডায় গিয়ে থাকতে পারেন। এক ব্যক্তির কাছ থেকে একাধিক দেশের পাসপোর্ট উদ্ধার নিয়ে ইডি জানতে চায়, সংশ্লিষ্ট সেই সব দেশের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব সম্পর্কিত বিভিন্ন নথি পেতে কারা সহায়তা করেছিল। বাংলাদেশর আত্মসাৎ করা টাকা সরাতেই কি তার বিভিন্ন দেশে যাতায়াত ছিল, তাও জানতে চায় ইডি। এদিকে দফায় দফায় জেরায় ইডির কর্মকর্তারা অতিরিক্ত বেশকিছু নাম পেয়েছেন। আর সেই সূত্র ধরেই ইডির তদন্ত কর্মকর্তারা সেই সব জায়গায় গোপনে অভিযান চালাচ্ছেন। সেখান থেকে নথি ও ছবি সংগ্রহ করে তার ফের পি কে হালদারসহ অন্যদের বয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন বলে জানা গেছে। সে ক্ষেত্রে ইডির নজরে রয়েছেন আরও কয়েকজন ব্যক্তি।

সর্বশেষ খবর