শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ মার্চ, ২০২১ ১০:৩১
আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০২১ ১৪:০৭
প্রিন্ট করুন printer

ভ্যাকসিন অ্যাস্ট্রাজেনেকা নিয়ে সংশয় এবং প্রকৃত ঘটনা

ডা. ইসমত কবীর

ভ্যাকসিন অ্যাস্ট্রাজেনেকা নিয়ে সংশয় এবং প্রকৃত ঘটনা
ডা. ইসমত কবীর

গত ১১ মার্চ ডেনমার্ক অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাদান দু'সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছে। রক্তজমাট বাধার অসুখ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন একজন টিকাগ্রহিতা। তার প্রেক্ষিতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ডেনমার্কের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এ ঘোষণা দেন। 

এর আগে ৮ মার্চ অস্ট্রিয়াতে ৪৯ বছরের একজন নার্স রক্তজমাটজনিত জটিলতায় মারা যান, তিনি অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাটি নিয়েছিলেন। তাই অস্ট্রিয়াও সাময়িকভাবে টিকাদান স্থগিত করে। একই সাথে ইউরোপের আরো কিছু দেশ এরকম সিদ্ধান্ত নেয়। এদের মধ্যে আছে নরওয়ে, আইসল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুনিয়া, লুক্সেমবার্গ। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, স্পেন ও পর্তুগাল এর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও এ সপ্তাহে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
ইউরোপের বাইরে এশিয়া থেকে থাইল্যান্ড, আফ্রিকা থেকে কঙ্গো অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার আমদানি সাময়িকভাবে স্থগিত করে।

অসুখটা কী?
শিরায় রক্তজমাট বাধার অসুখ বা ভেনাস থ্রম্বো এম্বোলিজম (ভিটিই, ডিভিটি বা ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস, পালমোনারি এম্বোলিজম) একটা গুরুতর অসুখ। সাধারণত পায়ের মাংসপেশির ভেতরের শিরায় রক্ত জমাট বেধে যায় এবং রক্তপ্রাবাহের সাথে ফুসফুসে গিয়ে জমাটবদ্ধ রক্তখন্ড বা 'ক্লট' মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে। আকস্মিক মৃত্যুর এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। পায়ের বা ফুসফুসের শিরা ছাড়াও শরীরের অন্য অংশেও এরকম রক্তজমাট বেধে গিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ রোগটির অনেকগুলো কারণ রয়েছে। কোভিড১৯ এ রোগীর জটিলতা ও আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রেও রক্ত জমাট বাধার জটিলতা দায়ী। সাধারণত প্রতি বছর প্রতি হাজারে অন্তত একজন এ রোগে আক্রান্ত হন। 

টিকা নেওয়ার ফলে কি এমন হতে পারে?
অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে এমন কোন ঘটনার নজির নেই। 
গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এক কোটি সত্তর লক্ষ টিকা প্রাপ্ত ব্যক্তির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে অ্যাস্ট্রাজেনেকা জানিয়েছে রক্তজমাট বাধার ঘটনা বরং টিকাপ্রাপ্তদের বেলায় কম ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ১ কোটি ৭০ লক্ষের মধ্যে এ রকম ঘটনার সংখ্যা ৩৭ (ডিভিটি ১৫ ও পিই ২২) অথচ এমনিতেই এ সংখ্যা হওয়ার কথা এক বছরে ১৭ হাজার বা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩২০।
যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (MHRA) ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক একটি সংগঠন। যুক্তরাজ্যে এক কোটি বিশ লক্ষ ব্যক্তির টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে সংস্থা জানিয়েছে, রক্তজমাট বাধার ঘটনা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গ্রহণের কোন কারণ নেই।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর ২৭টি দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি (EMA) জানিয়েছে, ইউরোপের পঞ্চাশ লাখ টিকা প্রাপ্ত ব্যক্তির মধ্যে এ রকম ঘটনার সংখ্যা মাত্র ত্রিশ যা প্রমাণ করে এটা টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সির একটি বিশেষ কমিটি, ফার্মাকোভিজিলেন্স রিস্ক এসেসমেন্ট কমিটি (PRAC) ব্যাপারটা খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, এমন কি টিকার নির্দিষ্ট ব্যাচের ব্যাপারে আপত্তি তোলার অবকাশ নেই।
গত ১২ মার্চ তারিখে 'বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা' (WHO) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছে, অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিড ১৯ টিকা রক্তজমাট বাধার ঘটনা সংশ্লিষ্ট নয়, তাই টিকাকরণ স্থগিত করার কোন কারণ নেই।

একইদিন 'ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অন থ্রম্বোসিস এন্ড হিমোস্ট্যসিস' (ISTH) এর পক্ষ থেকে বলে হয়েছে, 
(১) লাখ লাখ টিকা গ্রহীতার মধ্যে গুটিকতক রক্ত জমাট বাধা রোগের উপস্থিতি টিকার সাথে সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করে না। 
(২) প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে সোসাইটি বিশ্বাস করে, টিকার উপকারিতা সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে অনেক বেশি, তাই উপযুক্ত হলে প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির এ টিকা নেওয়া উচিত। 
(৩) রক্তজমাটবদ্ধতা বা থ্রম্বোসিস রোগে আক্রান্ত যারা রক্ত তরল রাখার ওষুধ বা এন্টিকোয়াগুলেন্ট নিচ্ছেন তাঁদেরও যথাযথ সাবধানতার সাথে এ টিকা নিতে কোন বাধা নেই। 
১১ মার্চ তারিখে সোসাইটির সংশ্লিষ্ট টাস্ক ফোর্স এর জরুরী সভায় এ সুপারিশমালা গ্রহণ করা হয়।
কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার সাথে রক্তজমাট বাধার ঘটনা সংশ্লিষ্ট নয় বলে সিদ্ধান্তে এসেছে, তাই এ টিকা বিতরণ স্থগিত রাখার কোন কারণ খুঁজে পায়নি।
লক্ষণীয়, এ রকম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ইউরোপের সংশ্লিষ্ট দেশগুলো টিকাকরণে অনেক পিছিয়ে পড়ছে। হাঙ্গেরি চীন থেকে টিকা সংগ্রহ করছে। জার্মানি ও ইতালি রুশ টিকা 'স্পুটনিক ভি' সংগ্রহের চেষ্টায় নেমেছে বলে খবর বেরিয়েছে।

লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস, ইংল্যান্ড।

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন