শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:১৪

পালস অক্সিমিটার নিয়ে কিছু কথা

ডা. অপূর্ব চৌধুরী

পালস অক্সিমিটার নিয়ে কিছু কথা

২০২০ সালে করোনাভাইরাস প্যান্ডেমিক আকারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর মুমূর্ষু কভিড রোগীদের শরীরে অক্সিজেন মনিটরিংয়ের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। এ সময় নতুন করে আলোচনায় আসে পালস অক্সিমিটার। এটি এখন সবার কাছেই পরিচিত। কারণ ভাইরাসটি ফুসফুস এবং হৃৎপিন্ডে সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। আর এ দুটো অংশে রক্তের সঙ্গে অক্সিজেনের উপস্থিতি রোগীর শরীরের সর্বশেষ অবস্থাকে বলতে পারে। অক্সিজেনের ঘাটতির ফলে দ্রুত রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। ভেন্টিলেটরের পাশাপাশি শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি জানতে পালস অক্সিমিটারের বিকল্প নেই। পালস অক্সিমিটার যন্ত্রটি দিয়ে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ জানা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে রক্তে অক্সিজেনের সেচুরেশন বা সম্পৃক্ততা। শরীরের বিভিন্ন কাজে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বলার কিছু নেই। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস থেকে কোষের সব কাজে এ অক্সিজেনের প্রয়োজন। নাক মুখ দিয়ে বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়ার পর রক্ত এ অক্সিজেন বহন করে শরীরের বিভিন্ন অংশে নিয়ে যায়। রক্তের হিমোগ্লোবিন এ বহনের কাজটি করে। রক্তের মধ্যে এমন বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ এবং বিভিন্ন প্রকার গ্যাস থাকে। অক্সিজেন, কার্বন ডাই- অক্সাইড প্রধান। শরীরের রক্তে কতটুকু অক্সিজেন আছেন এটা জানলে বোঝা যায় শরীরের অঙ্গগুলোতে কাজগুলো ঠিক হচ্ছে কিনা। কারণ সেসব কাজের অন্যতম একটি কাঁচামাল হলো অক্সিজেন। শরীরের আর্টারি বা শিরা এ অক্সিজেন যুক্ত রক্ত বহন করে। আর ধমনীগুলো কার্বন-ডাই-অক্সাইড যুক্ত রক্ত বহন করে। এখন শরীরের শিরাগুলোতে থাকা রক্তে কী পরিমাণ অক্সিজেন আছে সেটা জানতে রক্তের কিছু স্যাম্পল শরীর থেকে নিয়ে ল্যাবে পরীক্ষা করে বের করা যায়। এটিকে তখন বলে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ইন আর্টারিয়াল ব্লাড। প্রকাশ করে SaO2 লিখে। কখনো পরিস্থিতি আসে প্রতি মুহূর্তে কিছুক্ষণ পর পর রক্তে অক্সিজেনের সেচুরেশন জানার প্রয়োজন পড়ে। তখন একটি পালস অক্সিমিটার নামক যন্ত্রটি হাতের আঙুলের অগ্রভাগ, বিশেষ করে মধ্যমা অথবা তর্জনী আঙুলের আগায় লাগিয়ে দেখা হয়। পালস অক্সিমিটার দিয়ে যখন শরীরের রক্তে অক্সিজেনের এমন সেচুরেশন মাপা হয়, তাকে বলে পার্শিয়াল অক্সিজেন সেচুরেশন ইন আর্টারিয়াল ব্লাড। চিকিৎসকরা লিখে SaO2 দিয়ে। পার্শিয়াল মানে আংশিক। তার মানে SaO2 হলো পালস অক্সিমিটার দিয়ে মাপা SaO2 এর আংশিক। রক্তে থাকে হিমোগ্লোবিনের সবগুলোই অক্সিজেন বহন করে না। SaO2 দিয়ে জানা যায় রক্তে এই হিমোগ্লোবিনের টোটাল চিত্র। কতটুকু হিমোগ্লোবিন অক্সিজেন বহন করছে এবং কতটুকু হিমোগ্লোবিন অক্সিজেন বহন করছে না, দুটোই। কিন্তু পালস অক্সিমিটার বলে দেয় কতটুকু হিমোগ্লোবিন অক্সিজেন বহন করছে তার শতকরা শতাংশ। মূল কাজটাই পালস অক্সিমিটার করছে বলে খুব অল্প সময়ে শরীরের সর্বশেষ অবস্থা বুঝতে, বিশেষ করে কভিড আক্রান্তদের শরীরে এমন অক্সিজেনের পরিমাপ বুঝতে দ্রুত সাহায্য করে।

বিজ্ঞানীরা এখনো পরিষ্কার করে জানে না - কেন কভিড আক্রান্তদের এমন SaO2 বা রক্তে অক্সিজেনের স্যাচুরেশন কমে যায়। এবং তারা দেখেছে যে - একটি নির্দিষ্ট লেভেলের নিচে চলে গেলে রোগীর অবস্থা মৃত্যুর দিকে চলে যায় অথবা ফুসফুস কিংবা হৃৎপিন্ডের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কারণটি না জানলেও পালস অক্সিমিটার দিয়ে মাপা অক্সিজেনের এমন ক্ষণে পরিমাপ করে রোগীর সর্বশেষ অবস্থা বোঝা, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান করা, কভিড আক্রান্তের মাত্রা বোঝা, কতটুকু অক্সিজেনের প্রয়োজন, রোগীর অবস্থা ভালোর দিকে যাচ্ছে কিনা তা মনিটরিং, ফুসফুস কতটুকু কার্যকর, ভেন্টিলেটরের কখন প্রয়োজন এমনসব সিদ্ধান্ত নিতে পালস অক্সিমিটারের বিকল্প নেই। প্রতি মুহূর্তে পালস অক্সিমিটার যেমন হসপিটালে থাকার রোগীকে বুঝতে সাহায্য করছে, তেমনি পোর্টেবল অক্সিমিটার দিয়ে ঘরে থাকা কভিড রোগীকেও মনিটরিং করা যায় - কখন তার পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, কখন তাকে হসপিটালে নেওয়া প্রয়োজন। ইংল্যান্ডে সরকার কর্তৃপক্ষ ৬৫ বছরের উপরে এবং যাদের হৃৎপি- কিংবা ফুসফুসের জটিল সমস্যা আছে, তাদের বিনা পয়সায় ঘরে রাখার পালস অক্সিমিটার মনিটর দিয়ে থাকে। কারণ তারা দেখতে পেয়েছেন, যারা কভিড আক্রান্ত হয়ে মৃদু লক্ষণ উপসর্গে ভুগছে, এসব সমস্যা থাকলে যে কোনো সময় তাদের শারীরিক পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে এবং হসপিটালে নেওয়া প্রয়োজন হয়ে ওঠে। পালস অক্সিমিটার সে ক্ষেত্রে আগাম সাহায্য করে।

রক্তে অক্সিজেন সেচুরেশনের স্বাভাবিক লেভেল ৯৫ থেকে ৯৯%। ৯৪ কিংবা তার নিচে নামলে বুঝতে হবে রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি যাচ্ছে এবং কভিড আক্রান্ত হলে সেই মুহূর্তে দ্রুত হসপিটালে নেওয়া প্রয়োজন। ৯০% এর নিচে চলে গেলে ইমার্জেন্সি অক্সিজেনের প্রয়োজন, অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং জরুরি ভেন্টিলেটর প্রয়োজন।

লেখক : ইংল্যান্ড প্রবাসী চিকিৎসক।