শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ আগস্ট, ২০২০ ২৩:১৪

আইন-আদালত-বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতা ও ভাবনা

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম

আইন-আদালত-বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতা ও ভাবনা

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়ের উল্লেখযোগ্য অংশ কাটাতে হয়েছিল কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে-নির্জন সেলে। কথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক বক্তব্য প্রদান, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুনের চেষ্টাসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা, ‘দি বেঙ্গল স্পেশাল পাওয়ার অর্ডিন্যান্স, ১৯৪৬’ যা পরবর্তীতে অস্থায়ীভাবে পুনঃপ্রবর্তন ও ধারাবাহিকতা দেওয়া হয় ‘দি ইস্ট বেঙ্গল অ্যাক্ট, ১৯৫১’-এর মাধ্যমে, ‘দি ইস্ট পাকিস্তান পাবলিক সেফ্টি অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৮’ এবং ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুল্্স, ১৯৬৫’, যেগুলো নিরাপত্তা আইন নামে অধিক পরিচিত ছিল, এর আওতায় তাঁকে বারংবার গ্রেফতার ও আটক করে কারাগারে রাখা হয়েছিল। আদালতের আদেশে এক মামলায় মুক্তি পাওয়ার পর জেলগেটেই আবার আরেক মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল একাধিকবার। আপসহীন-সংগ্রামী বঙ্গবন্ধু সেসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন অদম্য সাহস ও জনগণের ওপর গভীর আস্থা রেখে।

সম্প্রতি জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর লেখায় তৎকালীন সময়ের রাজনীতি, শাসকগোষ্ঠীর ভূমিকা, তাঁর নিজস্ব ও অন্য রাজনীতিবিদদের ভূমিকা ও অবস্থান, তাঁকে বারংবার মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার ও নিরাপত্তা আইনে আটকের পাশাপাশি আইন, আদালত ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি বিবৃত করেছেন।

বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম গ্রেফতার হয়েছিলেন সম্ভবত ১৯৩৮ সালের মার্চ বা এপ্রিল মাসে। তিনি তখন স্কুলছাত্র। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। বাংলার ওই দুই নেতার গোপালগঞ্জ আগমন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ওপর দায়িত্ব পড়েছিল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করার। তিনি দল-মত-নির্বিশেষে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে হিন্দু ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থেকে সরে পড়তে শুরু করেছিল কংগ্রেসের আপত্তি ও প্ররোচনায়। এ নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ‘আড়াআড়ি চলছিল’ (বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত শব্দ) এবং দু-একজন মুসলমানের ওপর অত্যাচারও হয়। ওই দুই নেতার সফর হয়ে যাওয়ার কিছু দিন পর বঙ্গবন্ধুর একজন সহপাঠী আবদুল মালেককে হিন্দু মহাসভার সভাপতি সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে ধরে নিয়ে আটক ও মারপিট করার খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে মালেককে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু মালেককে ছেড়ে না দিয়ে সেখানে উপস্থিত রমাপদ দত্ত নামে একজন ভদ্রলোক বঙ্গবন্ধুকে গালি এবং পুলিশে খবর দেন। ঘটনাটি উভয় পক্ষের মধ্যে মারপিট পর্যন্ত গড়ায় এবং অবশেষে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোগীরা মালেককে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য অনুযায়ী রাতে হিন্দু নেতারা থানায় বসে হিন্দু অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে ‘এজাহার’ তৈরি করে মামলা দায়ের করে। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ‘ছোরা’ দিয়ে রমাপদকে আহত করে খুন করার চেষ্টা, লুটপাট ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগিয়েছিলেন; যদিওবা বঙ্গবন্ধুর বর্ণনা মতে তাঁদের হাতে লাঠি ছিল, কোনো ‘ছোরা’ ছিল না। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমানের হস্তক্ষেপে ঘটনাটি আপস হয় পনেরো শত টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-১০-১৩)। উপরোক্ত ঘটনাটি যদি বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে আমাদের সমাজে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে নিরপরাধ ব্যক্তিদের জড়িয়ে এজাহার/অভিযোগ দায়ের করার প্রবণতা এখনো খুব প্রবল ও বাস্তব একটি বিষয়।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একান্ত স্নেহভাজন হিসেবে তাঁকে নেতা মেনে বঙ্গবন্ধু ছাত্র অবস্থায় কলকাতা এবং পূর্ব বাংলায় (আজকের বাংলাদেশ) পাকিস্তান আন্দোলনের প্রথম কাতারের সংগঠক ও ছাত্রনেতা ছিলেন। কিন্তু ৪৭-এ পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পরের বছরেই অর্থাৎ ৪৮-এর ১১ মার্চ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদে ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে’ বলে ঘোষণা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গবন্ধু এর প্রতিবাদ জানান এবং বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা করেন এবং ২ মার্চ ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে ১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনকালে বিক্ষোভরত অবস্থায় সচিবালয়ের সামনে থেকে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যদের গ্রেফতার করা হয়। ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে মুসলিম লীগ সরকার ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুসহ অন্যদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তারপর থেকে মুসলিম লীগ সরকার এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার ও আটক একটি রুটিন কাজে পরিণত করে, যার পরিসমাপ্তি ঘটে স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের লায়ালপুর কারাগার থেকে মুক্তি লাভের মাধ্যমে।

টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক ‘শেখ বাড়ির’ পাশেই আরেকটি পুরনো বংশ আছে, যা কাজী বংশ নামে পরিচিত। দুই বংশের সম্পর্কটি ছিল অমø-মধুর। আত্মীয়তাও ছিল, আবার রেষারেষিও ছিল। কাজীদের কেউ কেউ শেখ পরিবারের সঙ্গে মিশে গিয়ে শেখদের সমর্থন করত। আবার কেউ কেউ কট্টর বিরোধিতা করত, তাদের একজন ছিল সেরাজতুল্লা কাজী। তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। অর্থের লোভে ছেলেরা সেরাজ কাজীকে গলা টিপে হত্যা করে শেখ বাড়ির গরুর ঘরের চালের উপরে রেখে থানায় খবর দেয়। বোন ঘটনাটি জানত, কিন্তু ভাইরা তাকে ভয় দেখিয়ে চুপ করে রেখেছিল। এ মামলায় নিম্ন আদালতে বঙ্গবন্ধুর পূর্ব-পুরুষ শেখ পরিবারের লোকজনের জেল হয়। পরবর্তীতে সাজাপ্রাপ্তদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাই কোর্ট সিআইডি কর্তৃক মামলাটি আবারও তদন্তে প্রেরণ করে।

বঙ্গবন্ধু আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমাদের এডভোকেট হাইকোর্টে দরখাস্ত করল সিআইডি দ্বারা মামলা আবার ইনকোয়ারি করাতে। কারণ, এ মামলা ষড়যন্ত্রমূলক। হাইকোর্ট মামলা দেখে সন্দেহ হলে আবার ইনকোয়ারি শুরু হল। একজন অফিসার পাগল সেজে আমাদের গ্রামে যায় আর খোঁজখবর নেয়। একদিন রাতে সেরাজতুল্লাহ কাজীর তিন ছেলের মধ্যে কী নিয়ে ঝগড়া হয় এবং কথায় কথায় এক ভাই অন্য ভাইকে বলে, ‘বলেছিলাম না শেখদের কিছু হবে না, বাবাকে অমনভাবে মারা উচিত হবে না।’ অন্য ভাই বলে, তুই তো গলাটিপে ধরেছিলি তাই তো বাবা মারা গেল। বোনটা বলল, ‘বাবা একটু পানি চেয়েছিল তুই তো তাও দিতে দিলি না।’ সিআইডি এই কথা শুনতে পেল ওদের বাড়ির পেছনে পালিয়ে থেকে। তার কয়েকদিন পরেই তিন ভাই ও বোন গ্রেফতার হলো এবং স্বীকার করতে বাধ্য হলো তারাই তাদের বাবাকে হত্যা করেছে।’ (পৃষ্ঠা-৬)। আত্মজীবনীতে এ ঘটনার সঠিক সময়কাল উল্লেখ করা না হলেও ধারণা করা যায় যে, ঘটনাটি সম্ভবত এখন থেকে দেড়শত বছর বা তারও অধিক পূর্বের হবে। সম্পত্তি-অর্থের লোভে পিতাকে হত্যা, ভাইকে হত্যা, এমনটি নিজের শিশুসন্তানকে হত্যা করে সহোদর ভাই-বোন কিংবা অন্য শরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে অংশীদারকে, রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য প্রতিপক্ষ, এমনকি নিজ দলের লোককেও হত্যা করার ঘটনা আজও আমাদের সমাজে অহরহ ঘটছে। সঠিক তদন্ত ও সাক্ষ্যের অভাব, আদালতে বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য উপস্থাপন না করার কারণে অনেক সময় ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। প্রকৃত দোষী থেকে যায় বিচারের আওতার বাহিরে-বিড়ম্বনার স্বীকার হন নিরপরাধ ব্যক্তিরা।

বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মাত্র কয়েকদিন। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হয় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় ডাকাতি ও খুন করার চেষ্টা, লুটতরাজ ও সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট করা সংক্রান্ত একটি মামলায়। ঘটনাটি ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় যোগদানের আগে, যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই। চকবাজার এলাকায় জেল সিপাহিদের সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণের কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে জেল সিপাহিরা গুলি করেছিল। একজন লোক মারা যায়, আহত হয় অনেকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বঙ্গবন্ধু ওই এলাকায় বসবাসরত জনাব আতাউর রহমান খানকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়াও ঘটনাস্থলে আসেন। স্থানীয় জনগণের অভিযোগ ছিল ঢাকা জেলের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সার্জেন্ট মিস্টার গজ নিজেই গুলি চালিয়েছিলেন এবং তারা মি. গজের বিচার দাবি করেন। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা চকবাজার এলাকায় মি. গজের বাড়ি আক্রমণ করে। বঙ্গবন্ধু উপস্থিত মন্ত্রী, অন্যান্য নেতা ও সরকারি কর্মচারীদের অনুরোধে মি. গজের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবাইকে শান্ত ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর পুলিশের তৎকালীন আইজিপি দোহা সাহেব কয়েকজন পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ফেলে বলেন, ‘আপনি গ্রেফতার’। বঙ্গবন্ধু উত্তর দেন, ‘খুব ভাল’। জনতার চিৎকারে ও প্রতিবাদে আইজিপি সাহেব বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে ওই ঘটনার মামলায় গ্রেফতার ও বিচারের সম্মুখীন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন-“১৯৫৫ সাল পর্যন্ত এই মামলা চলে। জনাব ফজলে রাব্বী, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে বিচার হয়। অনেক মিথ্যা সাক্ষী জোগাড় করেছিল। এমনকী মিস্টার গজের মেয়েও আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিলেন। পাবলিক সাক্ষী জোগাড় করতে পারে নাই। জেল ওয়ার্ডের মধ্য থেকেও কয়েকজন সাক্ষী এনেছিল। তার মধ্যে দুইজন ওয়ার্ডার সত্য কথা বলে ফেলল যে, তারা আমাকে দেখেছে গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করতে এবং লোকদের চলে যেতেও আমি বলেছিলাম, তাও বলল। জেল সুপারিনটেনডেন্ট মিস্টার নাজিরউদ্দিন সরকার কিন্তু সত্য কথা বললেন না, পুলিশ যা শিখিয়ে দিয়েছিল তাই বললেন। এক একজন সাক্ষী এক এক কথা বলল এবং কিছু কিছু সরকারি সাক্ষী এ কথাও স্বীকার করল যে, আমি জনতাকে শান্তি রক্ষা করতে অনুরোধ করেছিলাম। তাতে ম্যাজিস্ট্রেট আমার বিরুদ্ধে কোনো কিছু না থাকায় আমাকে বেকসুর খালাস দিলেন এবং রায়ে বলেছিলেন যে, ‘আমাকে শান্তিভঙ্গকারী না বলে শান্তিরক্ষকই বলা যেতে পারে।” (পৃষ্ঠা-২৭৭)।

মিথ্যা মামলার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এইভাবে-“একজন কয়েদি কিছুদিন পূর্বে ২০ বৎসর সাজা খেটে মুক্তি পেয়েছিল, তিন বৎসরের মধ্যেই আবার ২৫ বছর জেল নিয়ে ফিরে এসেছে। খবর নিয়ে জানলাম, যারা তাকে খুনের মামলায় সাক্ষী দিয়ে জেলে দিয়েছিল তারা খুব প্রভাবশালী লোক। কোথায় একটা ডাকাতি ও খুন হলো আর তাকে আসামি করে সাক্ষী দিয়ে আবার সাজা দিয়ে দিয়েছে। শপথ করে বলল, এ ঘটনা সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। বাড়ি যেয়ে বিবাহ করেছিল। ঠিক করেছিল, যে কয়দিন বেঁচে আছে, সংসার করবে আর কোনো গোলমালের মধ্যে যাবে না। প্রথম যখন জেলে এসেছিল তখন যে স্ত্রীকে রেখে এসেছিল সে তারই এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে পরে বিবাহ বসে। চাচাতো ভাইয়ের ভয় হয়েছে, যদি প্রতিশোধ নেয়। তাই সেও তার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল।” (রোজনামচা পৃ. ১৯১)।

১৯৫০ সালে জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এক কয়েদি, নাম লুদু ওরফে লুৎফর রহমানের পরিচয় হয়। ঢাকা শহরের লুৎফর রহমান লেনে বাড়ি ছিল। বঙ্গবন্ধু আবার যখন ১৯৫৪ এবং ১৯৫৮ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আসেন তখন আবারও লুদুর সাক্ষাৎ পান। প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে লুদুর কারাগারে আসা-যাওয়া। ১৩ বছর বয়স থেকে চুরি ও পকেট মারতে শুরু করেছিল। বিভিন্ন সময় ধরা পড়ে লুদু জেলখানায় আসে-আবার জামিন অথবা সাজা খেটে বের হয়। লুদুর জীবনকাহিনি বঙ্গবন্ধু বিশদভাবে তুলে ধরেছেন ‘কারাগারের রোজনামচা’-গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-৪৭-৫৪)। দীর্ঘ সাড়ে সাত পৃষ্ঠার বর্ণনায় লুদু কী কারণে চুরি ও পকেটমারের পেশা গ্রহণ করেছিল, তার পারিবারিক অবস্থা এবং ওইসব কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন থানা পুলিশের দারোগা, সিআইডি, জিআরপিকে নিয়মিত কীভাবে ‘নজরানা’ দিতে হতো তার বর্ণনা আছে। লুদুর এ কাহিনি বর্ণনার যুক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- “একটা সামান্য চোরের জীবন আমি কেন লিখছি- এ প্রশ্ন অনেকেই আমাকে করতে পারেন। আমি লিখছি এর জীবনের ঘটনা থেকে পাওয়া যাবে আমাদের সমাজব্যবস্থার চিত্র। মনুষ্য চরিত্র সম্বন্ধে, যারা গভীরভাবে দেখতে চেষ্টা করবেন, তারা বুঝতে পারবেন আমাদের সমাজের দুরবস্থা এবং অব্যবস্থায় পড়েই মানুষ চোর ডাকাত পকেটমার হয়। আল্লাহ কোন মানুষকে চোর ডাকাত করে সৃষ্টি করে না। জন্মগ্রহণের সময় সব মানুষের দেহ একভাবেই গড়া থাকে। বড়লোকের ছেলে ও গরীবের ছেলের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না, যেদিন জন্মগ্রহণ করে। আস্তে আস্তে এক একটা ব্যবস্থায় এক একজনের জীবন গড়ে ওঠে। বড়লোক বা অর্থশালীর ছেলেরা ভাল খায়, ভাল পায়, ভাল শিক্ষা পায়। আর গরীবের ছেলেরা জন্মের পরে যে অবস্থা বা পরিবেশে বেড়ে উঠে এবং যাদের সঙ্গে মেলামেশা করে তাদের স্বভাব-চরিত্রই তারা পায়।”

কারাগারে থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন বছরের পর বছর ধরে অনেক হাজতিকে কীভাবে বিনাবিচারে কারাগারে থাকতে হতো। সাক্ষীর জন্য ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির না করে সময় নিয়ে নেয়। একটি গ্যাং কেস ডাকাতি ও খুনের মামলা। আসামি প্রায় ১০০ জনের মতো ছিল। দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষীর অভাবে বিচার শেষ হচ্ছিল না। একদিন কোর্ট থেকে ফিরে আসামিরা হইচই করেছিল। আসামিদের ওপর ঘর বন্ধ করে টিয়ার গ্যাস মেরেছিল। গুরুতর আহত অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। একজন আসামি বঙ্গবন্ধুর কাছে ছিল, বঙ্গবন্ধু তার কাছ থেকে শুনলেন- “সাত-আট বছর আমরা হাজতে। বিচার হয় না। মাঝে মাঝে কোর্টে নিয়ে যায়, আর ফিরিয়ে আনে। সিআইডি ইচ্ছা করেই দেরি করায়। একরারীদের ওপর নির্ভর করে এ মামলা। তারা ইচ্ছামতো কোর্টে যায়। আবার ইচ্ছা হলো না, সিআইডির পরামর্শে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমাদের কী আর আছে। বাড়িঘর আত্মীয় পরিজন কিছুই তো নেই। যারা ছিল, না খেয়ে মরে গেছে বা কোথাও ভিক্ষা করে খেতেছে। আসামিদের পক্ষ থেকে হাকিমকে জানাল, স্যার আমাদের বিচার করুন।... হাকিম সাহেবও নাকি সিআইডির ওপর রাগ করেছে কয়েকবার। আজ যখন কোর্টে গিয়ে বলেছে, আজ মামলা হবে না, একরারী কোর্টে আসেনি- তখনই এরা প্রতিবাদ করে বলেছে, আমাদের এখানেই রেখে দিন আমরা আর জেলে যাব না। আর যায় কোথা! গ্যাস পার্টি এনে এরা কোর্টে যেখানে জালের বেড়ার মধ্যে ছিল সেখানে টিয়ার গ্যাস ছেড়ে ছিল। কোন দয়া মায়া নাই। অনেকে চক্ষু মেলতেই পারে না। অনেকে বমি করতে করতে বেহুঁশ হয়ে গেছে। ছয়জনের অবস্থা নাকি খারাপ। জেল হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ইনসাফ কি এদেশ থেকে একেবারেই উঠে গেল? ...। ভাবলাম সাত-আট বৎসর যদি একটা মামলা চলে তারপরে যদি শাস্তি হয় তবে অবস্থা কি হয়! ভুগতেই হবে তোমাদের। তোমরা যে ‘স্বাধীন দেশের নাগরিক’। ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান  তোমাদের রাষ্ট্র। ভুগতেই হবে তোমাদের ‘দেশের খাতিরে’। ইহকালে কষ্ট করলে কি হবে, পরকালে অনেক কিছু পাবা। হুরপরি, চিন্তা নাই।” (রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১৬৪-১৬৫)।

আমাদের বিচারব্যবস্থায় ‘টেলিফোনের’ একটা প্রভাব আছে মর্মে জনশ্রুতি আছে। বঙ্গবন্ধু এ বিষয়ে নিজ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এভাবে- “কোর্ট তো জেলগেটেই বসবে। মাত্র ছয়দিন আছে, কখন কাগজপত্র নিবে, নকল নিতে সময় লাগবে কোর্ট থেকে। কোন কোন এডভোকেট আসবে? এরা বিচারের নামে প্রহসন করতে চায়। মার্শাল ল’ যখন চলছিল তখনও বিচার পেয়েছিলাম, আজকাল জামিনের কথা উঠলেই টেলিফোন বেজে উঠে।” (রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১৮৫)।

মোবাইল কোর্টের অপব্যবহারের বিষয়েও বঙ্গবন্ধু অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। ঐতিহাসিক ৬ জুন ১৯৬৬। ছয় দফার সমর্থনে হরতালকে কেন্দ্র করে নিরীহ জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ, গণগ্রেফতার এবং সামারি কোর্ট করে সাজা দিয়ে শত শত নিরীহ ব্যক্তি এমনকি শিশুদেরও সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- “বিকালে আরও বহুলোক গ্রেফতার হয়ে এল। প্রত্যেককে সামারী কোর্ট করে সাজা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাহাকেও এক মাস, কাহাকেও দুই মাস। বেশির ভাগ লোকই রাস্তা থেকে ধরে এনেছে শুনলাম। অনেকে নাকি বলে রাস্তা দিয়া যাইতেছিলাম ধরে নিয়ে এল। আবার জেলও দিয়ে দিল। সমস্ত দিনটা পাগলের মতোই কাটলো আমার। ...। দিনভরই লোক আনছিল, অনেক। কিছু সংখ্যক স্কুলের ছাত্রও আছে। জেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে কেহ কেহ খুবই ভাল ব্যবহার করেছে। বাধ্য হয়ে জেল কর্তৃপক্ষকে জানালাম, অত্যাচার বন্ধ করুন। তা না হলে ভীষণ গোলমাল হতে পারে। মোবাইল কোর্ট করে সরকার গ্রেফতারের পর এদের সাজা দিয়ে দিয়েছে। ...। সাধারণ কয়েদি, যাদের মধ্যে অনেকেই মানুষ খুন করে অথবা ডাকাতি করে জেলে এসেছে তারাও দুঃখ করে বলে, এই দুধের বাচ্চাদের গ্রেফতার করে এনেছে। এরা রাতভর কেঁদেছে। ভাল করে খেতেও পারে নাই।” (রোজনামচা, পৃষ্ঠা-৭০-৭১)

বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-৩৭) বর্ণনা করেছেন বিত্তবান ও প্রভাবশালী হাজতি-কয়েদিরা জেলের ডাক্তারকে অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করে কভিাবে অসুস্থ না হয়েও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে জামিন লাভের জন্য ‘অসুস্থতার প্রত্যয়নপত্র’ সংগ্রহ করে। কারাগারের এ চিত্র ও অভিযোগ আজও বিদ্যমান।

বঙ্গবন্ধু আইনের শাসন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় ছিলেন সোচ্চার। কারণ এই আইনের অপপ্রয়োগে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিনাবিচারে আটকে রাখা হতো। বিনাবিচারে আটকের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সব সময় সোচ্চার ও প্রতিবাদী।

১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ গণপরিষদের অধিবেশনে সেফটি অ্যান্ড প্রিভেনটিভ ডিটেনশন অ্যাক্টের ওপর সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “স্যার, ...। আমরা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র অফ পাকিস্তান দিয়ে শুরু করেছি। এটা ভাল নাম এবং অবশ্যই আমরা এতে খুশী। কিন্তু আমি কি তাঁকে (বিলটির উপস্থাপক) অনুরোধ করব এটা দেখাতে যে, ইসলামিক আইনে কাউকে বিনাবিচারে শাস্তি দেওয়া যায়? আমি যতদূর জানি, বিচার ব্যতিত কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। যদি তাই হয়, তাহলে এটা হবে জনগণকে ধোঁকা দেওয়া। ...। আমি মাওলানা আতাহার আলী ও জনাব ফরিদ আহমেদকে জিজ্ঞাসা করতে চাই- তাঁরা কি বলতে পারবেন ইসলাম বিনাবিচারে একজন ব্যক্তির আটককে সমর্থন করে? স্যার, বিগত সাত বছরে পূর্ব বাংলায় এই বিশেষ আইন ক্ষমতাসীন দল তাদের বিরোধীদের দমন করার জন্য ব্যবহার করেছে, যা ইতিহাসে নজীরবিহীন। যে জনগণ পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম, ত্যাগ স্বীকার, জীবন বিপন্ন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎকে নষ্ট করেছে তাদের বিরুদ্ধে এই বিশেষ আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু কেন? শাসক মুসলিম লীগের কায়েমী স্বার্থ রক্ষার জন্য। ...। এখন পর্যন্ত আইনসভার সদস্য জনাব আবদুস সামাদ, জনাব মান্নান, জনাব মফিজুল ইসলামসহ অনেকেই কারাগারে আটক এই আইনে। ...। স্যার, এটা আপনার ও আমাদের জন্য অপমান নয়? ...। স্যার, আমরা পূর্ব বাংলায় মানুষের কাছে এই আইন বাতিলের জন্য অঙ্গিকারাবদ্ধ ছিলাম; এটা সংবিধানের অংশ হতে পারে না। কারো বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে, আমরা আদালতে যাব, আমাদের বিচারব্যবস্থা আছে। আমরা বিচারের জন্য আদালতে সোপর্দ করবো, শাস্তি দিতে পারি, ফাঁসি দিতে পারি; আমাদের তা করার অধিকার আছে, কিন্তু কেন এই কালো আইন, ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের কথা বলে বিনাবিচারে আটক। স্যার, ২১ দফা কর্মসূচিতে ‘সেফটি অ্যান্ড প্রিভেনটিভ ডিটেনশন’ আইন বাতিলের কথা উল্লেখ আছে এবং বিনাবিচারের আটককৃত সকলকে মুক্তি এবং প্রকাশ্য আদালতে বিচার করার কথা উল্লেখ ছিল। ...। স্যার, আমরা যদি জনগণকে সাংবিধানিক কর্মকান্ড করতে না দেই, তাহলে জনগণ অসাংবিধানিক পথ বেছে নিবে। স্যার, এটাই ইতিহাস। জনগণকে সংবিধান অনুযায়ী চলতে দিন, অন্যথায় তারা অসাংবিধানিক উপায়ে সরকারকে উৎখাত করবে। জনগণকে সংবিধান অনুসারে চলতে, সংঘটিত ও মতামত প্রকাশের সুযোগ দিন, নতুবা তারা গুপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। স্যার, এটাই ঘটবে।” (মূল বক্তব্যটি ইংরেজিতে ছিল; অনুবাদ নিজের)।

বঙ্গবন্ধু দীর্ঘদিন বিভিন্ন পর্যায়ে কারাগারে থেকে আটক বিভিন্ন শ্রেণির বন্দীদের (হাজতি-কয়েদি ও নিরাপত্তা আইনে আটক) খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের দুঃখ, কষ্ট, হয়রানি, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, বন্দীদের সংসার ভেঙে যাওয়া, কারাগারের অভ্যন্তরের ঘুষ-দুর্নীতি, আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রভূত সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। সে কারণে স্বাধীনতার পর তাঁর প্রত্যয় ছিল আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার করে এটাকে সহজতর করা, যাতে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সহজে বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বঙ্গবন্ধুকে সবসময় পীড়া দিত এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি ছিলেন উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত। বঙ্গবন্ধু তাঁর উপলব্ধি বর্ণনা করেছেন এভাবে- “যদি কেহ অন্যায় করে থাকে, বিচার করো তাড়াতাড়ি। এই জেলে অনেক লোক আছে যারা দুই তিন বৎসর হাজতে পড়ে আছে সামান্য কোন অপরাধের জন্য। যদি বিচার হয় তবে ৬ মাসের বেশি সেই ধারায় জেল হতে পারে না। বিচারের নামে একি অবিচার। আমার মনের অবস্থা আপনারা যারা বাইরে আছেন বুঝতে পারবেন না। কারাগারে এই ইটের ঘরে গেলে বুঝতে পারতেন।” (রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১৩৬)

বিচারের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন- “একটা কোর্টে বিচার গেলে একটা যদি সিভিল মামলা হয়; আপনি তো উকিল, স্পীকার সাহেব। আল্লাহর মর্জি যদি একটা মামলা সিভিল কোর্টে হয়, ২০ বছরেও সে মামলা শেষ হয় বলতে পারেন আমার কাছে? বাপ মরে যাবার সময় বাপ দিয়ে যায় ছেলের কাছে। আর উকিল দিয়ে যায় তার জামাইর কাছে সেই মামলা। আর ক্রিমিনাল কেস হলে এই লোয়ার কোর্ট, জজ কোর্ট- বিচার নাই। জাসটিস ডিলেড জাসটিস ডিনাইড- উ হ্যাভ টু মেইক এ কমপ্লিট চেইঞ্জ এবং সিস্টেমের মধ্যে পরিবর্তন করতে হবে। মানুষ যাতে সহজে বিচার পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচার পায়। ব্যাপক পরিবর্তন দরকার।” বঙ্গবন্ধু একই দিন সংসদের অপর অধিবেশনে বলেছিলেন- “নতুন স্বাধীন দেশ। স্বাধীন মতবাদ, স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করতে হবে। সেখানে জুডিসিয়াল সিস্টেমের অনেক পরিবর্তন দরকার।”

২৬ মার্চ ১৯৭৫ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু উপরোক্ত বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বিচার বিভাগকে নতুন করে গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ঘোষণা দিয়েছিলেন- ইংরেজ আমলের বিচারব্যবস্থা পরিবর্তন করে মানুষ যাতে এক বছর, দেড় বছরের মধ্যে বিচার পায়, তার বন্দোবস্ত করার। একক জাতীয় দল ‘বাকশাল’ করার পর ২১ জুলাই ১৯৭৫ নবনিযুক্ত জেলা গভর্নরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘‘আর, বিচারব্যবস্থা তাড়াতাড়ি বদলে ফেলা দরকার। বিচারের নামে অবিচার আর চলে না। এবার নতুন একটা কাঠামো করুন। সোজাসুজি বিচার হয়ে যাক। ...। দেখুন গিয়ে লোকে জেলের মধ্যে ফিফটি ফোর-এর আসামি হয়ে ছয় মাস, এক বছর পড়ে থাকে, কিন্তু তার পনের দিন জেল হয়। জীবনভর আমি জেল খেটেছি, কয়েদিদের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছি। আমি জানি তাদের কি দুঃখ, কি কষ্ট। বিচার হোক, জেল খাটুক। কিন্তু বিচার হয় না, হাজতে থাকে। ফিফটি ফোর-এর এক বছর দু-বছর হাজত খেটে এক মাস জেল হয়। আর, এই যে এক বছর এগার মাস গেল, তার ক্ষতিপূরণটা কে দেয়? আবার অনেক সময় খালাস হয়ে যায়।”

’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন- “শাসনতন্ত্রের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা বিধান করা হবে। শাসনতন্ত্রে প্রশাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণের নিশ্চয়তা থাকবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখার মতো চরিত্রবান, জ্ঞানবান এবং ন্যায়বান ব্যক্তিরাই যাতে বিচার বিভাগের সদস্য হতে পারেন শাসনতন্ত্রে সেইরূপ বিধান রাখা হবে।” বঙ্গবন্ধু ঘোষণাপত্রে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারকগণের যোগ্যতার বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন।

১৮ ডিসেম্বর ১৯৭২-এ গৃহীত নতুন সংবিধানের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল- ‘আদালতের অধিকারের হস্তক্ষেপ করা হবে না’ এবং ‘দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবেই’।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)-এ মৌলিক অধিকার হিসেবে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিতের বিধান করা হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২-এ রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূ হ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১১৬ক সংযোজন করে বিচার-কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

কারাগার, আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন, ভাবনা ও প্রত্যয়সমূ হ বর্তমান সময় হতে ৬০-৭০ বছর আগের। কিন্তু তাঁর ওইসব মূল্যবান অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যয়সমূ হকে যদি বর্তমান সময়ের আইন-আদালত-বিচারব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়- তবে বলতে দ্বিধা হওয়ার কথা নয় যে, বঙ্গবন্ধু যেন বর্তমান সময়ের বাস্তবতাকেই লিখে গেছেন। আরও বলতে দ্বিধা নেই যে, আইনি শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার-স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করার জন্য ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অঙ্গীকার’ পূরণে এখনো অনেক করণীয় রয়েছে- যার দায়ভার মূলত রাষ্ট্রের নির্বাহী ও বিচার বিভাগের। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি গভীর আন্তরিকতা ও অঙ্গীকার নিয়ে ভাবতে হবে। প্রণয়ন করতে হবে যথাযথ কর্মকৌশল- জনকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁর রক্তঋণ পরিশোধের জন্য।

লেখক : বিচারপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ।


আপনার মন্তব্য