শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৪ ০০:০০ টা

হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি

হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি

হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি আর তাল গাছে থাকা তাদের দৃষ্টিনন্দন বাসা। গাছপালা তথা বনাঞ্চল ধ্বংস করাসহ প্রাকৃতিক নানা বৈরী প্রভাবে আবহমানকালের এ ঐতিহ্য বিপন্ন হতে চলেছে। তাই এখন আর আগের মতো তালগাছও চোখে পড়ে না, মেলে না বাবুই পাখিও।
বাবুই পাখির ইরেজি নাম ‘বায়া ওয়েভার’ (BAYA WEVER) । প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এখনো গ্রাম-বাংলায় ‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে’ কাব্য কথার প্রচলন থাকলেও তালগাছের দেখা মেলা যেমন অনেকটাই কঠিন, তেমন বাবুই পাখি মেলাও ভার হয়ে উঠেছে। গাছ কেটে উজাড় করার কারণে এ অবস্থা হয়েছে। এতে করে হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছের সঙ্গে সঙ্গে বাবুই পাখিসহ তাদের শৈল্পিক বাসা। জানা গেছে, এমন একটা সময় ছিল যখন বাবুই পাখি ধরে ধরে অপ্রচলিত পণ্য হিসেবে বিদেশে রপ্তানি করা হতো। চড়া দামে শোপিস হিসেবে বাবুই পাখির বাসাও রপ্তানি হতো ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে। এখনো এ রপ্তানি চলমান আছে। কোনো কোনো সূত্রমতে, জ্বালানির প্রয়োজনে গাছ কেটে উজাড় করাসহ শিকারী ও মানুষের বিভিন্নমুখী অত্যাচার এবং নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাবুই পাখি অনবরত ভিন্ন আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে। লোকালয়ে বাবুই পাখি খাদ্য সংকটেও ভুগছে। যে কারণে এখন আর সহসাই বাবুই পাখিসহ তাদের বাসা দেখতে পাওয়া যায় না। অবশ্য বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন হিরণ পয়েন্টের ট্যুরিজম এলাকায় সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি তালগাছে রয়েছে বাবুই পাখির বাসা। সেখানে নৌবাহিনী অফিসের বাম পাশের গেট দিয়ে মংলা বন্দর রেস্ট হাউস এলাকায় ঢুকতেই চোখে পড়ে এই দৃশ্য। তালগাছের প্রতিটি ডেগার পাতায় পাতায় শত শত বাবুই পাখির বাসা। জানা গেছে, এখানে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ‘পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করায় কেউ এই বাবুই পাখি শিকার করেন না। ফলে এখানে বাবুই পাখির অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। এখান থেকে বাবুই পাখির বাসা আগের মতো ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিদেশের বাজারেও রপ্তানি করা হয় না বলে এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা গেছে।
 হিরণ পয়েন্টে কথা হয় মৎস্য অধিদফতরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শেখ মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, অনেক পাখিই হারিয়ে যাচ্ছে। বাবুই পাখিরা যেখানে ভালো খাবার ও তালগাছ পাচ্ছে, সেখানে চলে যাচ্ছে। তার মতে, এ পাখিদের রক্ষা করা জরুরি। পাখি গবেষক শরীফ খান জানান, ‘আদিকালে বাবুই পাখির বিচরণ ছিল সব জায়গাতেই। যেখানে খাবার পায়, মানুষের অত্যাচার নেই ও তালগাছ থাকে- সেখানে ওরা বাসা বাঁধে এবং বংশবিস্তার করে। ওদের প্রধান খাবার আউশ ও আমন ধান। বর্তমানে এই প্রজাতির ধান উৎপাদন ও তালগাছ কমে যাওয়ার কারণে বাবুই পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বুনোঘাসের ফল (বীজ) বাবুই পাখির খাবার। সুন্দরবনে এগুলো মেলে। তালগাছও সুন্দরবনে বেশি। এ জন্য সুন্দরবনকে এখনো এই পাখিরা নিরাপদ মনে করে।’ তিনি এক প্রশ্নের জবাবে জানান, ‘তালগাছে একটি পুরুষ বাবুই পাখি প্রথমে অর্ধেক বাসা তৈরি করে। পরে ওই পুরুষ পাখিটি তার সঙ্গী করার জন্য মহিলা পাখিদের শরণাপন্ন হয়ে বাসা দেখাতে নিয়ে যায়। যদি মহিলা পাখির বাসা পছন্দ হয়, তাহলে সে তাকে সঙ্গী করে উভয়ে খড়কুড়া নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বাসা তৈরি করে বসবাস করে। সেখানে বাবুই পাখিরা বংশবিস্তার ঘটায়।’ তিনি জানান, বাংলাদেশের যেসব জেলায় তালগাছ আছে সেখানে বাবুই পাখি এবং তাদের বাসা মিলবে। তবে বাগেরহাটসহ কয়েকটি জেলায় তালগাছ হারিয়ে যাওয়ার কারণে বাবুই পাখির বিচরণ কমে গেছে।

সর্বশেষ খবর