শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২ জুন, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ জুন, ২০১৮ ২৩:৫১

রেললাইনে মৃত্যুফাঁদে বসবাস

পাঁচ বছরে মৃত্যু ১৯৮৪ জনের

জিন্নাতুন নূর

রেললাইনে মৃত্যুফাঁদে বসবাস
রেললাইন দখল করে গড়ে উঠেছে বাজার। ঝুঁকি নিয়ে চলে রেল —রোহেত রাজীব

‘তেজগাঁও রেললাইন সংলগ্ন বস্তিতে ট্রেন দুর্ঘটনায় মানুষ আহত বা নিহত হন প্রতি মাসেই। আর হাত-পা ভাঙার ঘটনা তো প্রচুর।’ কথাগুলো বলছিলেন তেজগাঁও রেলবস্তির বাসিন্দা ফুল মিয়া। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, বস্তিতে আছেন প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে। আর তার ভাষ্যে, এই সময়ে হাজারের বেশি মানুষ ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। যাদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এই বস্তির আরেক বাসিন্দা এনাল বেপারি জানান, কয়েক বছর আগে রেললাইনের ওপর খেলায় মগ্ন এক শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি বাম পা হারিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক যে, সেই শিশুটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমানে পঙ্গু হয়ে এনাল বেপারি কর্মহীন দিন কাটাচ্ছেন।

রেল কর্তৃপক্ষ এবং রেলওয়ে পুলিশ রেললাইনের পাশের ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও ফুল মিয়া ও তার পরিবারের মতো আরও অনেক দরিদ্র পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ সত্ত্বেও ঘর ভাড়া দিয়ে রাজধানীর এসব মৃত্যুফাঁদের মধ্যে বাস করছেন। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে এসব রেললাইনের পাশে যে অবৈধ ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে তার বাসিন্দাদের ছোট সন্তানদের রেললাইনের ওপর প্রায়ই বিপজ্জনকভাবে  খেলা করতে দেখা যায়। আর এ সময় তাদের সঙ্গে অভিভাবকও থাকে না। আর বয়সে কিছুটা বড় শিশু-কিশোরদের সেখানে ক্রিকেট খেলতে দেখা যায়। ট্রেন খুব কাছাকাছি চলে এলে তবেই শিশুরা লাইন থেকে সরে দাঁড়ায়। চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় অন্যমনস্ক শিশু ও পথচারীদের অনেকে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে। অন্যদিকে বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ের লাইনম্যানরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, বস্তিতে ট্রেন দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দায়িত্ব তাদের নয়। ট্রেন কাছাকাছি এলে পতাকা নেড়ে তারা শুধু আশপাশের মানুষকে সতর্ক করে দেন। 

বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্যে, রাজধানীতে রেললাইন সংলগ্ন যে দুর্ঘটনা ঘটে তা বেশি হয় আশকোনা সংলগ্ন রেলক্রসিংয়ে। গত পাঁচ বছরে রেলওয়ে দুর্ঘটনায় প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ৪১১ জন, ২০১৪ সালে ৩৯১ জন, ২০১৫ সালে ৪৪৯ জন, ২০১৬ সালে ৩৬৩ জন এবং ২০১৭ সালে ৩৭০ জনের মৃত্যু ঘটে। পাঁচ বছরে সর্বমোট ১৯৮৪ জনের মৃত্যু হয়। সে হিসাবে মাসে গড়ে ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় প্রায় ৪০০ জনের। বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা জোনের সহকারী পুলিশ সুপার মো. ওমর ফারুক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রেললাইনের দুই পাশে যে অবৈধ স্থাপনা ও ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে তা উচ্ছেদের দায়িত্ব রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের। আর এসব বস্তি উচ্ছেদের ক্ষমতা রেলওয়ে পুলিশের নেই। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এসব উচ্ছেদে রেলওয়ে পুলিশের সহযোগিতা চাইলে তারা এগিয়ে যান। তিনি বলেন, সাধারণত রেললাইনের আশপাশে যে বাজার ও বস্তি আছে তা সে সব এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণেই গড়ে উঠেছে। রেলওয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ আরও জানান, ঈদ মৌসুমে রেললাইন সংলগ্ন অবৈধ স্থাপনাগুলোতে হকারদের ব্যবসা বৃদ্ধি পায়। এ জন্য সে সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেশি। সে কারণে এবার ঈদের আগেও রেললাইন সংলগ্ন এই এলাকায় দুর্ঘটনা রোধে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স ও এপিবিএন সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সরেজমিন নগরীর মগবাজার রেলক্রসিং, শ্যাওড়া বাজার রেলক্রসিং, আশকোনায় হাজী ক্যাম্পে যাওয়ার আগের রেলক্রসিং সংলগ্ন বাজার, তেজগাঁও এবং কারওয়ানবাজার রেললাইন সংলগ্ন বস্তি ঘুরে নিম্নআয়ের মানুষদের এই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাজার বসাতে ও বসবাস করতে দেখা যায়। গতকাল তেজগাঁও ও কারওয়ানবাজার রেললাইন সংলগ্ন বস্তিতে গিয়ে দেখা যায় সুমি নামের এক কিশোরী দুই রেললাইনের মাঝ বরাবর খালি স্থানে মাটির চুলায় ভাত রাঁধছে। সুমির সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে হঠাৎ ট্রেনের হুইসেলের শব্দ খেয়াল হলো বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসছে ট্রেন। সুমিকে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসার কথা বললেও শুনেনি। সুমির সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘জন্মের পর থেইক্যা রেলবস্তিতে থাকি। তাই ভয়ডর লাগে না।’ তবে বস্তিতে নতুন মানুষ এলে ট্রেন আসার সময় তাদের সতর্ক করে দেয় সুমি।

বস্তি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তেজগাঁও থেকে কারওয়ানবাজার পর্যন্ত রেললাইনের পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বস্তিঘর, কাঁচাবাজারসহ অন্যান্য স্থাপনা। বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা এড়াতে রেললাইনের পাশে ইস্পাত দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে দিলেও এসব বস্তির বাসিন্দারা সেই সীমানা তোয়াক্কা না করেই সীমানা এলাকার মধ্যে বানিয়েছেন খুপরি ঘর। এতে ট্রেন দুর্ঘটনায় হাজারো মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আবার মগবাজার রেলক্রসিং পেরিয়ে রেললাইনের দুই পাশে বিভিন্ন মোটরসাইকেল-গাড়ি মেরামতের দোকান, লোহার দরজা-জানালা তৈরির দোকান এবং মানুষের আবাসস্থল গড়ে উঠেছে। রেললাইন থেকে মাত্র এক-দেড়গজের মধ্যেই এসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। রেললাইন বরাবর ট্রেন যখন ছুটে যায় তখন এসব স্থাপনা কেঁপে ওঠে। কিন্তু এখানে থাকা মানুষগুলো এ ব্যাপারে নির্বিকার।

এ ছাড়া রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের পাশে শ্যাওড়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রেলক্রসিংয়ের পাশের অবৈধ স্থাপনা বেশ কয়েকবার উচ্ছেদ করা হলেও আবারও তা দখল হয়ে যায়। এসব জায়গায় বিভিন্ন ফলের দোকান, চায়ের দোকান, ভাঙ্গারির দোকান গড়ে উঠেছে। আর বিমানবন্দর রেলস্টেশন পেরিয়ে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের বিপরীতে আশকোনায় হাজী ক্যাম্পে যেতে যে রেলক্রসিং পড়ে সেখানে রেললাইনের উভয় পাশে গড়ে উঠেছে বাজার। রেললাইনের দুই পাশে প্রায় এক গজের মধ্যেই ফল ও কাঁচাবাজারের বেশ বড় বাজার গড়ে উঠেছে।


আপনার মন্তব্য