Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ জুন, ২০১৯ ২৩:১৬

বাঘের খাবার খায় মানুষ!

চিড়িয়াখানার খাবার চুরি, ধুঁকছে প্রাণী, অনেক খাঁচা ফাঁকা

মোস্তফা কাজল

বাঘের খাবার খায় মানুষ!

ঢাকার মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। খাবার বণ্টন ও পরিচর্যায় অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে অনেক প্রাণী। এসব প্রাণী শুয়ে থাকলে আর দাঁড়াতে পারে না, অনেক প্রাণী ক্ষুধায় কাতর, আবার অনেক প্রাণীকে অহেতুক ভিজতে হয় বৃষ্টিতে। মারাও যাচ্ছে অনিয়মের শিকার প্রাণীরা।

খোঁজ নিয়ে এ ধরনের নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, ১৮৬ একরের এ বিশাল চিড়িয়াখানার অনেক খাঁচাই ফাঁকা। ফলে দূরদূরান্ত থেকে এসে ৩০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে চিড়িয়াখানায় ঢুকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে দর্শকদের। একের পর এক প্রাণী মারা যাচ্ছে। চিড়িয়াখানার পশুখাদ্য কেনাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ মিলেছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। যদিও চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. এস এম নজরুল ইসলাম অস্বীকার করেছেন এসব অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, চিড়িয়াখানায় কোনো ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নেই। প্রাণীদের খাবার বণ্টনে রয়েছে কমিটি। তবে জনবল সংকট রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, চিড়িয়াখানার সামনের ও ভিতরের সড়কের উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। সর্বশেষ ২০১২ সালে আফ্রিকা ও ব্রাজিল থেকে কিছু প্রাণী আনা হয়েছিল। ১০ কোটি টাকা খরচ করে আরও ২০০ প্রাণী আনার কথা থাকলেও নতুন তেমন কোনো প্রাণী আনা হয়নি। প্রাণীগুলোর দুর্বল অবস্থা কেন- জানতে চাইলে ডা. এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘চিড়িয়াখানা আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়েছে। এটা বড় প্রকল্প। এটা শেষ হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে এখানে বাঘসহ অন্যান্য প্রাণীর খাবার চুরি হয়।’ অভিযোগ পাওয়া গেছে, অনিয়মই এখানে নিয়ম। প্রাণীদের সঠিক পরিচর্যার অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রাণীদের খাবার নিয়ে নানা টালবাহানা। বরাদ্দের চেয়ে কম খাবার দেওয়া এখানে স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠেছে। এমনকি যেটুকু খাবার দেওয়া হয় তাও সময়মতো দেওয়া হয় না। সরেজমিন দেখা গেছে, বাঁ পাশের গেটের সামনে লোহার ব্যারিকেড দেওয়া বিশাল স্থানটিতে নানা প্রজাতির হরিণ ছুটে বেড়াচ্ছে। পাশেই কচ্ছপের খাঁচায় মাত্র দুটি কচ্ছপ। বছর দুয়েক আগে একা হয়ে যাওয়া শিম্পাঞ্জি নিঃসঙ্গ বসে আছে। বড়ই বিষণœ-বিমর্ষ এসব জলজ প্রাণী। একটু সামনে গ ারের দুটি খাঁচার মধ্যে একটি খালি। পাশের এল-২৫ খাঁচাটিও খালি পড়ে আছে। তাতে আসলে কোনো প্রাণী রাখা হতো কিনা বোঝা যায় না। সামনে মোড় নিয়ে হাঁটা শুরু করলে দেখা যায়, হায়েনার চারটি খাঁচার মধ্যে দুটি খালি। পাশের প্রাণী জাদুঘরের অবস্থাও যেনতেন। দুই পাশে দুটো কঙ্কালের বাক্স। একটিতে তিমি মাছের কঙ্কাল রয়েছে। আরেকটি ফাঁকা। প্রাণী জাদুঘরের এ অবস্থা দেখে মনসুর নামের এক দর্শনার্থী বললেন, ‘মনে হচ্ছে তিমির লেজে খরগোশের কঙ্কাল জুড়ে দিয়েছে।’

চিড়িয়াখানার ডান দিকের সড়ক দিয়ে ঢুকলে হরিণের খাঁচার পরই রয়েছে কয়েক প্রকারের বানরের খাঁচা। রেসাস বানরের দুটি খাঁচার মধ্যে একটি খালি। হামাদ্রিয়াস বেবুনের দুটি খাঁচার একটি ফাঁকা দেখা গেছে। অজগর সাপের আর-৪ খাঁচায় রাখা হয়েছে কাচ, ঝুড়িসহ কিছু আসবাবপত্র। সোনালি সাপের খাঁচাটিও শূন্য। দর্শকদের অনেকেই বলেন, ‘মনে হয় সাপ গর্তে ঢুকে বসে আছে।’

আমাজন বনের পাখি ম্যাকাও। এটির খাঁচাও ফাঁকা। একটু দূরে পাশাপাশি দুটি বাঘের খাঁচা। তাতে বাঘকে দেখা গেল সটান শুয়ে থাকতে। পাশের খাঁচায় বাঘিনী মরার মতো শুয়ে আছে। ভিতরের খাঁচাগুলোর একটিতে দেখতে পাওয়া গেল একটি সিংহ। কিন্তু সেও নির্জীব-নীরব। প্রাণচাঞ্চল্য বলতে কিছু নেই। বড় রোগা আর দুর্বল চেহারা। পাশের ভল্লুকের দুটি খাঁচার একটিতে রয়েছে ভল্লুক। তবে ময়ূরের খাঁচায় অনেক ময়ূরকে ঘুরে ঘুরে খেতে দেখা গেছে। জানতে চাইলে কর্মচারী আরিফ জানান, ‘কয়েকদিন আগে কয়েকটি ময়ূর আনা হয়েছে।’ মাঝখানের অংশে জেব্রার খাঁচায় একটি ছোট বাচ্চা দেখা গেল। গাপ্পি নামের মাছের অ্যাকোরিয়ামে নেই মাছ। একটু এগোলে কিসিং গোরামি মাছের অ্যাকোরিয়াম। চিড়িয়াখানা কিউরেটরের অফিসকক্ষে গিয়ে দেখা গেছে, প্রাণীদের একটি তালিকা ঝুলছে। এতে উল্লেখ রয়েছে ১০ প্রজাতির মোট ৩৭টি মাংসভুক প্রাণী, ২২ প্রজাতির ২৩৫টি বৃহৎ প্রাণী (তৃণভোজী), ১৯ প্রজাতির ১৮৮টি ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১০ প্রজাতির ৭১টি সরীসৃপ, ৫৬ প্রজাতির ১ হাজার ৭০টি পাখি ও জাদুঘরের অ্যাকোরিয়ামে রক্ষিত ২৩ প্রজাতির ৭৯৯টি মাছ রয়েছে। এক বছরে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় মারা গেছে ১৮ প্রাণী। অথচ এই সময়ে নতুন আনা হয়েছে ৬-৭টি প্রাণী। ২৩ প্রাণীর আয়ুষ্কাল অতিক্রান্ত হওয়ায় রয়েছে মৃত্যুঝুঁকিতে। চিড়িয়াখানাসূত্র জানান, প্রতি বছর ৩২ থেকে ৩৫ লাখ দর্শনার্থী আসেন চিড়িয়াখানায়। কিন্তু তাদের জন্য নেই উপযুক্ত পরিবেশ। হাঁটতে হাঁটতে দর্শনার্থীদের পা ব্যথা হয়ে যায়। নেই তেমন কোনো বসার ব্যবস্থা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যারা চিড়িয়াখানায় পশু চিকিৎসক বা অন্যান্য পদে চাকরি করেন তাদের বন্যপ্রাণীর ওপর বিশেষ কোর্স করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এমনটি হচ্ছে না। এ ছাড়া চিড়িয়াখানায় প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি এবং দৈনিক শ্রমিক সব মিলিয়ে ১৯৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। জাতীয় চিড়িয়াখানায় মঞ্জুরিকৃত ২৪৫ পদের মধ্যে ৪৬টিই খালি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর