শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:১৩

বর্ষা মৌসুমে বাঁধ সংস্কারের তোড়জোড়

জলে যায় সংস্কারের বরাদ্দ, শুষ্ক মৌসুমে নেই কোনো উদ্যোগ

শামীম আহমেদ ও জয়শ্রী ভাদুড়ী

বর্ষা মৌসুমে বাঁধ সংস্কারের তোড়জোড়

শুষ্ক মৌসুমে খোঁজখবর না থাকলেও বর্ষা এলেই বাঁধ সংস্কারের তোড়জোড় শুরু হয়। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না করায় বৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসে ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে বাঁধ তীরবর্তী এলাকার মানুষ। প্রায় প্রতি বছরই বাঁধ ভেঙে ফসলি জমি, মাছের খামার, বসতভিটাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ক্ষয়ক্ষতির এ চিত্র জানা থাকলেও টনক নড়ে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। জাতিসংঘের ২০১৭ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩২০ কোটি ডলার বা ২৭ হাজার ৪০ কোটি টাকার (প্রতি ডলার ৮৪.৫০ টাকা) সম্পদ ক্ষতি হয়; যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ তিন গুণ বেড়ে বছরে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে যত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে, তাতে সব মিলিয়ে ১ হাজার কোটি ডলার বা প্রায় ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

উপকূল ও শহররক্ষা বাঁধ নির্দিষ্ট সময়ে সংস্কার এবং যথাযথ তদারকি না হওয়ায় প্রতি বছর বন্যা-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। ২০১৭ সালের বন্যায় কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর ওপর নির্মিত বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছিল। কারণ খুঁজতে গিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা জানান, পুরো বাঁধেই ইঁদুরের গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৯৮-২০০০ সালের পর বাঁধে কোনো সংস্কার কাজ করা হয়নি বলে জানান তারা। ফলে বন্যা শুরু হলেই প্লাবিত হয় এলাকা। তখন শহর বাঁচাতে ব্লক, বালুর বস্তার নামে লাখ লাখ টাকা খরচ করলেও তা পানিতে ভেসে যায়। ২০১৭ সালের বন্যায় সারা দেশে ৩৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সম্পূর্ণ ও ২৮৯ কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এগুলো মেরামতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁধ মেরামতের আলোচনা উঠলেও বাস্তবে কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

এ ব্যাপারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দুর্যোগে ক্ষতি কমিয়ে আনতে আমরা সব সময় তৎপর। বর্ষার মৌসুম শুরু হতেই আন্তমন্ত্রণালয় সভা করা হয়েছে। আমরা বেশ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ পরিদর্শন করেছি। এগুলো সংস্কার যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পড়েছে আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কার কাজ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করব। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের নামে চলছে বিভিন্ন অনিয়ম। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে উঠে এসেছে এসব অনিয়মের চিত্র। সাতক্ষীরা থেকে মনিরুল ইসলাম মনি জানান, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া ও চুনা নদীর প্রবল জোয়ারের কারণে বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় ১৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৯ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের কাজ কেবল শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এখনো শেষ হয়নি মেরামত কাজ। পুরো সংস্কার না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাঁধ যে কোনো মুহূর্তে পানির তোড়ে ভেসে যেতে পারে। এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের জানান, চারটি উপজেলার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় ফণি-পরবর্তী বাঁধ মেরামতের জন্য ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এসব এলাকার বেড়িবাঁধে জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। খুলনা জেলার কয়রার ১৬টি স্পটে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। রাজশাহী থেকে কাজী শাহেদ জানান, বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্কে থাকেন নদীতীরের মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে দেখা না মিললেও, বর্ষার আগে নদীর তীরে দেখা মেলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের। সিসি ব্লক আর বালুর বস্তা পানিতে ফেলার নামে চলে হরিলুট। এবারও বন্যা শুরু হওয়ার আগে শুরু হয়েছে তোড়জোড়। রাজশাহীর বুলনপুর থেকে সোনাইকান্দি পর্যন্ত চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। রাজশাহী মহানগরীর বুলনপুর থেকে পশ্চিমে পবা উপজেলার নবগঙ্গা পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার এলাকার পদ্মাপাড় বাঁধানো হচ্ছে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৬৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রথম ধাপে পাঁচটি প্যাকেজে গত বছরের জুনে বুলনপুর থেকে হাড়ুপুর পর্যন্ত ২ হাজার ৬৫০ মিটার নদীতীর রক্ষার কাজ শুরু হয়েছে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম জানান, এ কাজটি জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা করতে পারেনি। তবে শিগগিরই কাজটি শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘জুলাই থেকে জুন না হয়ে এপ্রিল থেকে মার্চ অর্থবছর হলে কাজ করতে অনেক সময় পাওয়া যেত।’

সিরাজগঞ্জ থেকে আবদুস সামাদ সায়েম জানান, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের আগ থেকে শেষ পর্যন্ত যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ অংশের বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। পাউবো স্থায়ী সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ না করে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জরুরি কাজের নামে কোটি কোটি ব্যয় করে। কিন্তু ভাঙন রোধ না হওয়ায় সরকারের সব টাকা চলে যাচ্ছে জলে। এ বছর বন্যা শুরুর চার-পাঁচ মাস আগ থেকেই সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের খুদবান্ধি থেকে শুভগাছা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। এ ছাড়া এনায়েতপুরের ব্রাহ্মণ গ্রাম থেকে পাঁচিল পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার ও শাহজাদপুরের কিছু এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব ভাঙন ঠেকাতে কয়েকটি পয়েন্টে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অনেক স্থানে জিও ব্যাগসহ বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। খাসপুকুরিয়া এলাকার ৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন শুরু হলে ৫০ লাখ টাকার জরুরি কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে বাজেট না থাকায় জরুরি ভিত্তিতে বসতভিটা ও ফসলি জমি রক্ষায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করার চেষ্টা হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, একটি প্রকল্প পাস হতে ছয় মাস থেকে এক বছর লাগে। এজন্য নদী ভাঙন রক্ষায় জরুরিভাবে বরাদ্দ এনে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর