শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ জুলাই, ২০১৯ ২৩:৪২

বন্যা ভাঙনে দিশাহারা মানুষ

শেরপুর-জামালপুর সড়কে পানি, যান চলাচল বন্ধ

প্রতিদিন ডেস্ক

বন্যা ভাঙনে দিশাহারা মানুষ
ফরিদপুরে দেখা দিয়েছে ভাঙন। টাঙ্গাইলে রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন -বাংলাদেশ প্রতিদিন

দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলেও কোথাও কোথাও অবনতি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বিভিন্ন স্থানে আরও এলাকা ডুবে গেছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেরপুর-জামালপুর সড়কে পোড়ারদোকান ও শিমুলতলী এলাকা ডুবে যাওয়ায় সেখান দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও  প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

শেরপুর : শেরপুর বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুজিত কুমার ঘোষ জানান, পানির কারণে এখন শেরপুর থেকে জামালপুর হয়ে ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে বাস চালানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার কামারেরচর, চরপক্ষীমারী, বলাইরচর, বেতমারী, ঘুঘুরাকান্দি, চরমোচারিয়া,  শ্রীবরদী উপজেলার ভেলুয়া ও খড়িয়াকাজীরচর ইউনিয়নে শুক্রবার আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নে বিপুলসংখ্যক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কাঁচা ঘরবাড়ি, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, রোপা আমনের বীজতলা, সবজি খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বিপুলসংখ্যক জলাশয়, মাছের খামার ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। গত ছয় দিনে বন্যার পানিতে ডুবে শিশু ও বৃদ্ধাসহ চারজন মারা গেছেন। কামারেরচর বাজার বন্যার কারণে আংশিক তলিয়ে  গেছে। বন্যার্ত এলাকার লোকজন কলার ভেলায় ও ডিঙি নৌকায় যাতায়াত করছে। এদিকে জামালপুরের মাদারগঞ্জের বালিজুড়ি এলাকা বন্যাকবলিত হওয়ায় শুকনো জায়গার অভাবে একটি খামারের মহিষের পাল শেরপুরে পাঠানো হয়েছে।

জামালপুর : যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। জেলার সাত উপজেলায় পানিবন্দী রয়েছেন অন্তত ১৩ লাখ মানুষ। পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। সড়ক ভেঙে জামালপুর-সরিষাবাড়ী সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত জামালপুরে যমুনার পানি সামান্য কমে বিপদসীমার ১৩৯ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে বইছে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। ধীরে ধীরে পানি ছড়িয়ে পড়ছে জেলার বেশির ভাগ এলাকায়। ৬১টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌরসভায় সরকারি হিসাবেই পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন প্রায় ১৩ লাখ মানুষ। পানি ঢুকতে শুরু করেছে জামালপুর শহরের রামনগর, তেঁতুলিয়া, দেউড়পাড় চন্দ্রা, সদরের তিতপল্লা, দিগপাইত, কেন্দুয়া কালিবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি এলাকায়। এ ছাড়াও শনিবার দুপুরে সদরের কেন্দুয়া কালিবাড়িতে বন্যার তোড়ে সড়ক ভেঙে জামালপুরের সঙ্গে সরিষাবাড়ী উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ ছাড়া সকালে বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলক্ষিয়া দক্ষিণ কুসলনগর গ্রামে বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে খেলতে গিয়ে হামিদুল ইসলামের ছেলে রাহাত মিয়া (১০) পানিতে ডুবে মারা যায়। অন্যদিকে শুক্রবার রাতে বকশীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ঝালুরচর পশ্চিমপাড়া গ্রামে রাজাবাদশা (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে সাপে কাটলে মুমূর্ষু অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে শনিবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়। সে ওই এলাকার মৃত কুন্দু শেখের ছেলে। প্রতিদিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে জেলার ১,১০৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান। গত তিন দিন ধরে প্রচ  গরমে বন্যাদুর্গত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ। টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ভূঞাপুরের টেপিপাড়া এলাকায় ভূঞাপুর-তারাকান্দি বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ৪টি উপজেলা। এর ফলে প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জেলার ৬টি উপজেলা টাঙ্গাইল সদর, ভূঞাপুর, গোপালপুর, কালিহাতী, নাগরপুর, দেলদুয়ারের ৩৪টি ইউনিয়নের প্রায় ২১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ৩৩০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তিন হাজার ৩৬ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে ১০২টি। বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০০ টন চাল ও নগদ তিন লাখ টাকা বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। শরীয়তপুর :  শরীয়তপুরের পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার নড়িয়ার সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি ৪৪০ সেন্টিমিটার প্রবাহিত হয়েছে। যা বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। গত দশ দিনে ১৪০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর তীরবর্তী কিছু এলাকায় পানি উঠে প্লাবিত হয়েছে। পানি ওঠার কারণে নড়িয়া-জাজিরা সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ওই সড়কের পাচুখারকান্দি এলাকায় বিকল্প সড়ক ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। আর নদীতে স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় নড়িয়ার নওপাড়া ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি গ্রামে পদ্মা নদীর অস্থায়ীভাবে তীর রক্ষা কাজের ১০০ মিটার অংশ ধসে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গতকাল পদ্মা নদীর পানি নড়িয়ার সুরেশ্বর পয়েন্টে ৪৪০ সেন্টিমিটার প্রবাহিত হয়েছে। গত দশ দিনে পদ্মা নদীতে ১৪০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে নড়িয়ার মোক্তারেরচর, চরআত্রা, নওপারা, জাজিরার বিলাশপুর, বড়কান্দি, পালেরচর, ভেদরগঞ্জের কাচিকাটা, তারাবুনিয়া ইউনিয়নের নদীর তীরবর্তী কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ওই সব এলাকার ফসলি জমি, কাঁচা-পাকা সড়ক ও মানুষের বসতবাড়ির উঠানে পানি উঠেছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নড়িয়া-জাজিরা সড়কের শেহের আলী মাতবরকান্দি, পাচুখারকান্দি এলাকা দিয়ে পানি উঠে গেছে।

রাজশাহী : প্রতিদিন হু-হু করে বাড়ছে পদ্মা নদীর পানি। গত এক সপ্তাহে এক মিটারের বেশি বেড়েছে পানির উচ্চতা। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে বিপদসীমা পার হয়ে যেতে পারে মাঝ বন্যায়। রাজশাহীতে পদ্মার বিপদসীমা হচ্ছে ১৮ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গেজ রিডার এনামুল হক জানান, গত বুধবার সকাল ৬টার সময় ১৫ দশমিক ১৮ মিটার পানি পাওয়া যায়। তবে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪৪ মিটারে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় পানির পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৬০ মিটার। গতকাল দুপুর ১২টায় পানির উচ্চতা ছিল ১৫ দশমিক ৮৬ মিটার। নেত্রকোনা : নেত্রকোনার প্রধান নদীগুলোর পানি কমে গেলেও পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণের ফলে প্লাবিত হওয়া নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে রয়েছে দুর্ভোগ। পানিবন্দী মানুষগুলো চলাচল করতে পারলেও কৃষকরা গো-খাদ্যের সংকটে পড়েছেন। বিভিন্ন সড়কে বেঁধে রাখছেন গবাদিপশু। নওগাঁ : বসতবাড়ির অদূরে ১৫ শতাংশ জমিতে পটোলের চাষ করেছিলেন মান্দার দেলবর হোসেন। তার সেই খেতে এখন কোমর সমান পানি। বাঁধ ভেঙে অন্য কৃষকদের মতো তার জমিও প্লাবিত হয়েছে। পানি ঢুকে পড়েছে ঘরেও। ভেঙে পড়েছে বাড়ির মাটির দেয়ালের একাংশ। এ অবস্থায় স্ত্রী, দুই ছেলে নিয়ে নিজবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশীর ইটের তৈরি বাড়ির দোতলায়। এদিকে আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও ছোট যমুনার পানি তেমন একটা বৃদ্ধি পায়নি। তবে শুক্রবার ভোর রাতে জেলার রানীনগরে বাঁধ ভেঙে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বগুড়া : বগুড়ার যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনার পানি কমলেও বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে বাঙ্গালী নদীর পানি। গত এক সপ্তাহব্যাপী বন্যায় জেলার তিনটি উপজেলায় ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত ১৩ জুলাই যমুনার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর থেকে যমুনার পানি বাড়তে বাড়তে ১৮ জুলাই রাত ১২টায় ১২৮  সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইতে থাকে। ১৯ জুলাই সকাল ৯টা থেকে যমুনার পানি কমতে শুরু করে। গতকাল সকাল সকাল ৯টায় যমুনার পানি কমে বিপদসীমার ১১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে জানান পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ।

তিনি আরও জানান, যমুনার পানি কমলেও শনিবার বেলা ১২টায় বাঙ্গালী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে এখন ১১ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবারের তুলনায় তিন উপজেলা সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনটে ৯ হাজার ৬৫৯ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাটের ক্ষতি হয়েছে ৫ হাজার ৫১২ হেক্টর, আউস ধানের ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার ১০ হেক্টর জমির, বিভিন্ন সবজির ক্ষতি হয়েছে ৬১ হেক্টর জমির। ৬২ হেক্টর জমির বীজতলা নষ্ট হয়েছে। ১০ হেক্টর মরিচ নষ্ট হয়েছে। আখের ক্ষতি হয়েছে ৪ হেক্টরের।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর