শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:৫৩

আসল কাগজ নকল টাকা

মির্জা মেহেদী তমাল

আসল কাগজ নকল টাকা

বিভিন্ন নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসহ জাল টাকার ডিজাইন ও তৈরির ক্ষেত্রে এতদিন অপরাধী চক্রের প্রধান বাধা ছিল টাকা ছাপানোর বিশেষ ধরনের কাগজ। তা না পাওয়ায় অপরাধী চক্র সাধারণ মানের কাগজ, ট্রেসিং পেপার ও আঠা প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে জাল বা নকল টাকা ছাপাত। কিন্তু এতে জাল নোটের ‘টেম্পার’ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ফলে দুই থেকে তিন হাত বদল হতেই টাকার নকল রূপ বেরিয়ে আসে। কিন্তু ভয়ংকর খবর হচ্ছে, ‘নোট জালকারী চক্রে’র হাতে এখন রয়েছে টাকা তৈরির ‘আসল কাগজ’। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, ‘আসল কাগজে’ ছাপা বেশ কিছু নোট ইতিমধ্যে বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছে অপরাধী চক্র। এমন বেশ কয়েকটি নোট বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের হাতেও পড়েছে। এসব জাল নোট চেকিং মেশিন বা কোনো বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করেও ধরার উপায় নেই। এভাবে জাল টাকার বিস্তার দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট অশনি সংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু তাই নয়, ওই অর্থ দিয়ে দেশের ভিতর সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হবে বলেও তাদের ধারণা। তারা বলছেন, জাল টাকা ও আসল টাকার মধ্যে যদি পার্থক্য না করা যায়, তাহলে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, অন্যদিকে যেহেতু পাকিস্তানিরা তাদের এজেন্টদের হাতে এসব জাল টাকা দিয়েছে, তাই তারা এ টাকা দেশের ক্ষতি ও সন্ত্রাসের কাজে ব্যবহার করবে।

ডিবি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে তিন ধাপে তৈরি হয় জাল টাকা। যে কাগজে জাল টাকা ছাপানো হয় তাকে জাল নোট চক্রের ভাষায় ‘কাপড়’ বলা হয়। বাজার থেকে নরমাল কাগজ, ট্রেসিং পেপার ও আঠা দিয়ে প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে এই ‘কাপড়’ তৈরি করা হয়। ‘কাপড়’ তৈরির জন্য রয়েছে পৃথক গ্রুপ যারা ‘জাল টাকা তৈরি চক্রে’র কাছে তা বিক্রি করে। এক বান্ডিল ‘কাপড়’ সাত থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এক কাগজে চারটি টাকা প্রিন্ট হয়, আর এক বান্ডিলে ৪০০টি টাকা প্রিন্ট হয়। এ ছাড়া টাকার নিরাপত্তা সুতা আলাদাভাবে কিনে তাতে গ্রাফিক ডিজাইনার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো বসানো হয়। এভাবে তৈরি হয় সিকিউরিটি রোল। একটি সিকিউরিটি রোল ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে প্রিন্টারের মাধ্যমে ‘জাল টাকা’ ছাপিয়ে তা নির্দিষ্ট সাইজে কাটা হয়। এগুলো মার্কেটে বাজারজাত করার জন্য রয়েছে পৃথক গ্রুপ। এসব গ্রুপের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ থাকলেও একটি গ্রুপ আরেকটির ব্যাপারে তেমন কিছুই জানে না। তবে অনেকেই পুরান ২০ টাকার রং বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে উঠিয়ে সেখানে একশ টাকা ছাপানো হয় বলেও গোয়েন্দাদের কাছে খবর আছে।  পুলিশ বলছে, জাল টাকার ব্যবসা সারা বছরই চলে। তবে ঈদ উপলক্ষে অন্যান্য ব্যবসার মতো এ ক্ষেত্রেও চাহিদা বেড়ে যায়। এখন ঢাকায় এ রকম ৪৫ থেকে ৫০টি গ্রুপ আছে। সারা দেশেই তাদের কাস্টমার আছে। সারা দেশেই জাল নোট সরবরাহ হয় ঢাকা থেকে। স্থানীয় পর্যায়ে জাল টাকা বাজারে ছাড়ার জন্য রয়েছে পৃথক লোক।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের একটি টিম ২৬ লাখ রুপির জাল নোট ও তা তৈরির সরঞ্জামসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পোশাক ও গরু আমদানির কাজে এসব জাল রুপি লেনদেন করার উদ্দেশ্য ছিল প্রতারকদের। গোয়েন্দারা জানান, বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী জেলা, বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারিরা এসব রুপি ব্যবহার করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩১ আগস্ট জাল রুপিসহ যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকার একটি বাসা থেকে লিয়াকত হোসেন জাকির, শান্তা আক্তার ও মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে জাল রুপি তৈরিতে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ, একটি কালার প্রিন্টার, একটি লেমিনেশন মেশিন, জাল রুপি তৈরির বিপুল পরিমাণ কাগজ, প্রিন্টারে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কালির কার্টিজ, সিকিউরিটি সিল সংবলিত স্ক্রিন বোর্ড, গাম ও ভারতীয় জাল রুপি বানানোর জন্য ব্যবহৃত সিল মারা ফয়েল পেপার উদ্ধার করা হয়। জাল রুপি তৈরির সঙ্গে জড়িত প্রতারকরা গ্রেফতার এড়াতে ২-৩ মাস পর পর বাসা পরিবর্তন করত বলে জানান মহানগর গোয়েন্দা (উত্তর) পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান। তিনি বলেন, তারা দ্রুত বাসা পরিবর্তন করত। বাসা ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে বহুতল ভবনের ওপরের দিকের ফ্ল্যাটই বেছে নিত, যাতে লোকজনের যাতায়াত কম থাকে। তবে পুুশি এখন ভীষণ তৎপর।


আপনার মন্তব্য