শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:৩৬

কাগজ শিল্পে অশনিসংকেত

দেশের ১০৬টি কাগজ কলের মধ্যে ৫৯টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ৬টি আংশিক চালু থাকলেও বন্ধের পথে। ১৫টি কাগজ কল নিজেদের অন্য ব্যবসার সহযোগিতায় উৎপাদন ধরে রাখতে পারলেও বাকিগুলো ধুঁকছে

শামীম আহমেদ

কাগজ শিল্পে অশনিসংকেত

নানা সংকটে ক্রমেই রুগ্ন শিল্পে পরিণত হচ্ছে সম্ভাবনাময়ী কাগজ শিল্প। দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্বপ্ন নিয়ে যে শিল্পটি বড় বিনিয়োগে মাঠে নেমেছিল, সেই খাতটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। লোকসানে পড়ে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে কাগজ কল। দেউলিয়া হচ্ছে বিনিয়োগকারী। বেকার হচ্ছে শ্রমিক।

ইতিমধ্যে দেশের ১০৬টি কাগজ কলের মধ্যে ৫৯টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ৬টি আংশিক চালু থাকলেও বন্ধের পথে। ১৫টি কাগজ কল নিজেদের অন্য ব্যবসার সহযোগিতায় উৎপাদন ধরে রাখতে পারলেও বাকিগুলো ধুঁকছে। এ পরিস্থিতিতে কয়েক বছরের মধ্যে বাকি মিলগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ, গ্যাস-বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অবৈধ আমদানি, সড়কে লোডসীমা বেঁধে দেওয়ায় পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও নিম্নহারে রপ্তানি প্রণোদনার কারণে সম্ভাবনাময়ী খাতটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কাস্টমসে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে, আন্ডার-ইনভয়েসিং ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে রাতের আঁধারে রাজধানীর কাগজের বাজারে দেদারসে ঢুকছে চোরাই কাগজ। শুল্ক ফাঁকি দেওয়া এসব চোরাই কাগজের মূল্য কম হওয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না দেশি কাগজ। এতে রাষ্ট্র যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি হুমকির মুখে পড়েছে দেশি কাগজ শিল্পের বিপুল বিনিয়োগ। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় মিলগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ঋণের উচ্চ সুদ ও চড়া ইউটিলিটি বিলের কারণেও উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ফলে বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রেও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে দেশের কাগজকে। চলতি বছর বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্যাপিটাল পেপার অ্যান্ড পাল্প ইন্ডাস্ট্রিটির অর্থ বিভাগের প্রধান কাজী আবদুস সালাম এখন বনানীতে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছেন। তিনি বলেন, পুঁজির অভাবে ক্যাপিটালের দুটি মিলই চলতি বছর বন্ধ হয়ে গেছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঋণ নেওয়া ছিল। সুদ দিতে দিতে পুঁজিতে টান পড়ে। কারখানায় একটি বয়লার ও একটি জেনারেটর ছিল। এতে দুই কারখানায় মাসে গ্যাস বিল আসত প্রায় দেড় কোটি টাকা। মিল বন্ধ থাকলেও বড় অঙ্কের বিল দিতে হতো। কয়েক বছরের বিল বকেয়া পড়ায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এরপরই মিল দুটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৪০০ কর্মী ছিল। কেউ অন্যত্র যোগ দিয়েছে। বাকিরা বেকার।

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) সচিব নওশেরুল আলম বলেন, চোরাই কাগজের সঙ্গে পেরে উঠছি না। নানা সুবিধা দেওয়ার পরও সরকারি কাগজকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আর আমাদেরকে পদে পদে প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হচ্ছে। গার্মেন্টের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কিছু কাগজ পণ্যে সরকারের দেওয়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে প্রয়োজনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কাগজ শুল্কমুক্ত সুবিধায় এনে অবৈধভাবে খোলা বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এক কাগজের ঘোষণা দিয়ে ডিউটি ফাঁকি দিয়ে আনছে অন্য কাগজ। শুল্কমুক্ত সুবিধা ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আনা এসব কাগজের সঙ্গে দামে টিকতে পারছে না দেশি কাগজ। এ শিল্পে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ কমছে। ৫৯টি পেপার মিল বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও ধুঁকছে। খাতটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে ১০ লাখ ও পরোক্ষভাবে ৬০ লাখ মানুষের জীবিকার সম্পর্ক। এরইমধ্যে অনেকে বেকার হয়েছে। অনেক কারখানায় বেতন বন্ধ। এতে শুধু বিনিয়োগকারীরাই পথে বসেনি, কয়েক লাখ কর্মী বেকার হয়েছে। বড় বিনিয়োগ হওয়ায় হঠাৎ করে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। তাই কোনোটি লোকসান দিয়ে চালু রেখেছে, কোনোটি ন্যূনতম লাভে চলছে। তিনি বলেন, সরকার ব্যাংক সুদ একক সংখ্যায় নামিয়ে আনার ঘোষণা দিলেও আমাদেরকে ১৪-১৫ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে। এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে। নয় লাখ টন চাহিদার বিপরীতে দেশের মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা আছে ১৬ লাখ টন। অথচ, আমরা ৬ লাখ টন উৎপাদন করেও বিক্রি করতে পারি না। আমাদের কাগজ অনেক উন্নত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ৩২টির বেশি দেশে রপ্তানি হয়। ২০১৮ সালে ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাগজ আমরা রপ্তানি করি। এ বছর ৩০ মিলিয়ন ছাড়াবে আশা করছি। রপ্তানি আরও বাড়াতে পারলেও সংকট দূর হতো। কিন্তু রপ্তানিতে প্রণোদনা মাত্র ১০ শতাংশ। এ ছাড়া দফায় দফায় ইউটিলিটি বিল বাড়ানোয় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিযোগিতামূলক দামে রপ্তানিও কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হারে একক সংখ্যা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (মুখপাত্র) সিরাজুল ইসলামের অফিশিয়াল ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয় তিনি বিদেশে আছেন। পরে ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি। ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করলে তার পিএ পরিচয় দিয়ে একজন ওপাশ থেকে বলেন, ‘স্যার এ বিষয়ে কথা বলবেন না। আপনি মুখপাত্রের দফতরে যোগাযোগ করেন।’ ফের সিরাজুল ইসলামের ল্যান্ডফোনে ফোন দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে- জানতে চাইলে জেনারেল ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদের ল্যান্ডফোন নম্বর দেওয়া হয়। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘শিল্পে ব্যাংক ঋণের সুদের হার একক সংখ্যায় আনার নির্দেশনা কিছু ব্যাংক বাস্তবায়ন করেছে। বাকি বিষয় স্যার বলতে পারবেন অথবা আমাকে জেনে জানাতে হবে।’ পরে জানাবেন বলে তিনি মোবাইল নম্বর রাখলেও আর জানাননি।

এদিকে সরেজমিন রাজধানীর নয়াবাজারের পাইকারি কাগজের দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দেশি ও বৈধভাবে আমদানি করা কাগজের পাশাপাশি দোকানগুলো ঠাসা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা বিভিন্ন কাগজপণ্যে। পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত বিশেষ টিস্যু কাগজ, ডুপ্লেক্স বোর্ড, নন-কার্বন রিকোয়ার্ড (এনসিআর) আর্ট কার্ড থরে থরে সাজানো। দোকানিদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, উন্নত মানের দেশি কাগজ থাকলেও দাম কম হওয়ায় বিদেশি কাগজের চাহিদা বেশি। রাত ১১টার পর এসব অবৈধ পণ্যের ট্রাক আনলোড হয়। ধরনভেদে এসব কাগজ দেশি কাগজের তুলনায় প্রতি রিম ৫০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমে বিক্রি হচ্ছে। এনসিআর কাগজ উৎপাদনে দেশের কাগজকলগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ইসিজি পেপারের নামে মিথ্যা ঘোষণায় এ কাগজ অবাধে ঢুকছে খোলা বাজারে। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার মো. আল আমিন বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। গত ১৮ এপ্রিল থেকে দুই মাসে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা ৭৬ টনের ওপরে বিভিন্ন ধরনের কাগজ আটক করেছি। ঢাকার ছয়টি, মোংলার একটি ও ফকিরহাটের একটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছি। এদিকে সরকারের নানা পৃষ্ঠপোষকতা থাকার পরও বন্ধ হয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস ও নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস। কর্ণফুলী পেপার মিলসটি এখনো ধুঁকে ধুঁকে চললেও দেনায় ডুবে আছে। মিলটি বাঁচাতে সম্প্রতি প্রায় সাড়ে চারশ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. হাইয়ুল কাইয়ুম বলেন, দেশের স্বার্থে, কর্মীর স্বার্থে ঋণ দিয়ে হলেও কাগজকলটি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু ৬০-৭০ বছরের পুরনো যন্ত্রপাতি। পণ্যের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। দেনায় ডুবে আছে। কর্মীদের বেতন-ভাতা, পেনশন দিতে হয়। আগের ঋণ রয়েছে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে আরও লোকসানে পড়ছে। আয়ের অর্ধেকটাই যায় গ্যাস বিল দিতে। এত লোকসান দিয়ে চালিয়ে রাখা দুষ্কর। মিলটি বাঁচাতে করণীয় ঠিক করে আগামী তিন মাসের মধ্যে একটি পরিকল্পনা জমা দেব। বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির চেয়ারম্যান শহীদ সেরনিয়াবাত বলেন, ওষুধ, গার্মেন্টের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কিছু বিশেষায়িত কাগজপণ্য আমদানি দরকার। তবে ছাপার কাগজ আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশেই কিছু কাগজ কল উন্নত কাগজ তৈরি করছে। এগুলো বিদেশেও যাচ্ছে। দেশে সক্ষমতা থাকলে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে কাগজ আনার প্রয়োজন কী?


আপনার মন্তব্য