শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:১১

থমকে আছে দেওয়ানি আইনের সংশোধনী

বিচার হচ্ছে ১৩২ বছরের পুরনো আইনে, সুফল থেকে বঞ্চিত বিচারপ্রার্থীরা

আরাফাত মুন্না

থমকে আছে দেওয়ানি আইনের সংশোধনী

অধস্তন আদালতের বিচারকদের আর্থিক এখতিয়ার বৃদ্ধি করে সরকার ‘দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭’ সংশোধন করলেও হাই কোর্টের স্থগিতাদেশে তা প্রায় চার বছরেরও বেশি সময় ধরে থমকে আছে। ফলে অর্ধযুগ অপেক্ষার পর মামলাজট কমাতে দেওয়ানি আইন সংশোধন করা হলেও এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। বিচার হচ্ছে ১৩২ বছরের পুরনো আইনেই।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী নিম্ন আদালতের একজন সহকারী জজ দুই লাখের পরিবর্তে ১৫ লাখ, সিনিয়র সহকারী জজ চার লাখের পরিবর্তে ২৫ লাখ এবং জেলা জজ পাঁচ লাখের পরিবর্তে পাঁচ কোটি টাকা মূল্যমানের মামলা নিষ্পত্তি করতে পারতেন। আইন কার্যকর হওয়ার পর হাই কোর্টে বিচারাধীন সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা মূল্যমানের মামলা ৯০ দিনের মধ্যে জেলা জজ আদালতে স্থানান্তরিত হবে বলেও সংশোধিত আইনে উল্লেখ করা হয়। জানা গেছে, ২০১৬ সালে দেওয়ানি আইন সংশোধন করার পর উচ্চ আদালত থেকে প্রায় ১০ হাজার দেওয়ানি মামলা অধস্তন আদালতে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেয় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। কিন্তু উচ্চ আদালতের কয়েকজন আইনজীবী মামলা অধস্তন আদালতে ফেরত প্রদান ঠেকাতে সংশোধিত আইন চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে রিট করেন। রিটের শুনানি নিয়ে ওই বছরের ১৬ জুন সংশোধিত আইনের কার্যকারিতা স্থগিত করে হাই কোর্ট। এরপর থেকে এ পর্যন্ত স্থগিতই রয়ে গেছে সংশোধিত আইনের কার্যকারিতা। রাষ্ট্রপক্ষও ওই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে কোনো আবেদন করেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা এটির আশু সমাধান চাই। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের যে আপত্তি, সেটি নিয়ে তাদের সঙ্গে বৈঠক করব। এ নিয়ে কর্থাবার্তা চলছে। আশা করছি শিগগিরই তাদের সঙ্গে বৈঠক হবে।’

আইনজ্ঞরা বলছেন, সংশোধিত দেওয়ানি আইন কার্যকর হলে বিচারপ্রার্থীদের হাই কোর্টে আসার প্রয়োজন হতো না। নিম্ন আদালতেই অনেক মামলা নিষ্পত্তি হতো। এতে মামলাজট কমার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে যেত। প্রচলিত আইনে মামলার মূল্যমান এক টাকা থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হলে বিচার হবে সহকারী জজ আদালতে। দুই লাখ এক টাকা থেকে চার লাখ পর্যন্ত সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে এবং মামলার মূল্যমান চার লাখ টাকার ওপরে হলে এর বিচার হবে যুগ্ম-জেলা জজ আদালতে। তবে আপিল মামলার ক্ষেত্রে মামলার মূল্যমান পাঁচ লাখ টাকার ওপরে হলেই বিচারপ্রার্থীকে হাই কোর্টে আপিল বা রিভিশন মামলা করতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলেন, সঙ্গত কারণেই ১৩২ বছর আগের দেওয়ানি আদালত আইন বর্তমান প্রেক্ষাপটে অচল। কারণ দেশের যে কোনো শহরেই এখন এক শতাংশ জমির মূল্য কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা। ফলে এক শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলেই আপিল মামলার ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীকে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে ২০১৬ সালের এপ্রিলে আইনটি সংশোধন করে সরকার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘১৩০ বছরের পুরনো আইনটি সংশোধন করে নিম্ন আদালতের বিচারকের আর্থিক এখতিয়ার বাড়ানো হয়েছে। আমি মনে করি সংশোধিত আইনটি কার্যকর করতে পারলে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলার জট কমবে।’ তিনি বলেন, সব মামলা নিয়ে হাই কোর্টে আসতে হবে কেন। পাঁচ লাখ, ১০ লাখ টাকা বা এর সমমানের অনেক মামলা রয়েছে, যেগুলোর বিচার নিম্ন আদালতেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব। এ বিষয়ে হাই কোর্টের সাবেক বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ বি এম আলতাফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেওয়ানি আদালত আইনের সংশোধন অত্যন্ত জরুরি। কারণ, যে আইনটি প্রচলিত আছে, সেটি ১৩২ বছরের পুরনো। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালে সংশোধন করা দেওয়ানি আদালত আইনটি আমি দেখেছিলাম। এটি অত্যন্ত কার্যকর একটা আইন। সংশোধিত আইনটি কার্যকর হলে ছোট ছোট বিরোধ নিয়ে সাধারণ মানুষকে হাই কোর্টে আসতে হবে না। জেলার আদালতেই বিচার পাবেন তারা। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এতে কমবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর