শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৪৩

পশ্চিম থেকে পুবে চোখ সরকারের

সরাসরি সমুদ্র যোগাযোগ থাইল্যান্ডের সঙ্গে, যুক্ত হবে চীন মিয়ানমার ভিয়েতনাম কম্বোডিয়া

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

পশ্চিম থেকে পুবে চোখ সরকারের

ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তির পর বাংলাদেশ এবার একই ধরনের চুক্তি করতে যাচ্ছে থাইল্যান্ডের সঙ্গে। বঙ্গোপসাগরের পুবের এই দেশটির সঙ্গে উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তির বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। থাইল্যান্ড দিনক্ষণ জানালেই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করবে বাংলাদেশ। চুক্তিটি কার্যকর হলে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে থাইল্যান্ডের রানং বন্দরে সরাসরি জাহাজ চলবে। এক্ষেত্রে ভায়া হবে মিয়ানমারের কোনো একটি বন্দর। নৌপরিবহন সচিব মো. আবদুস সামাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, থাইল্যান্ডের সঙ্গে উপকূলীয় জাহাজ চলাচলের খসড়া নিয়ে কাজ করছি আমরা। এখন থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে তারিখ জানালে এমওইউ সই করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সূত্রগুলো জানায়, উপকূলীয় জাহাজ চলাচলের থাইল্যান্ডের দিক থেকেই প্রথম প্রস্তাব আসে। তারা বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগ সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে কথা-বার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৮ জানুয়ারি ব্যাংককে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় যৌথ বাণিজ্য কমিশনের সভায়ও দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সমুদ্র যোগাযোগ সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে থাইল্যান্ড। এর আগে ২০১৬ সালে দেশটির প্রতিনিধিরা চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করে গেছেন। এখন বাংলাদেশও চুক্তিটি করার ব্যাপারে সমান আগ্রহ দেখাচ্ছে।

কেন এই আগ্রহ : থাইল্যান্ডের সঙ্গে পুবের এই সামুদ্রিক রুটটি সচল করার মাধ্যমে মূলত মিয়ানমার ও চীনের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যেটিকে বাণিজ্য স্বার্থের অনুকূল বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে থাইল্যান্ডের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য হয় সিঙ্গাপুর বন্দর দিয়ে। এর ফলে শুধু পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়ছে তাই নয়, সময়ও বেশি লাগছে। প্রস্তাবিত চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হলে পণ্য পরিবহনে সময় এবং অর্থ ব্যয় অর্ধেকে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানান, চুক্তি হলে প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে অন্তত দুটি জাহাজ চলাচলের পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন এত বেশি নয়, যা দিয়ে দুটি জাহাজ সপ্তাহে পরিচালনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে চুক্তিটি করা হলে এটি ফলপ্রসূ হবে। সে ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমারের সিত্তে বা রেঙ্গুন বন্দর দিয়ে থাইল্যান্ডের রানং বন্দরে জাহাজ চলাচল শুরু করলে তা লাভজনক হতে পারে। বাংলাদেশ শিপার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট গত সপ্তাহে মিয়ানমার সফরে দেশটির সিত্তে-তে যে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন, সেটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে চট্টগ্রাম থেকে রানং পর্যন্ত জাহাজ চলাচল প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে এটিকে পণ্য আমদানি-রপ্তানির বৃহত্তম জলপথ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। কারণ, বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন। ওই দেশটি মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সম্পর্ক তৈরি করতে বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভ (বিআরআই)। এটির মাধ্যমে চীন সরাসরি সিত্তে গভীর সমুদ্র বন্দরে নিজ দেশ থেকে পণ্য আনা-নেওয়া করবে। আর বাংলাদেশ যদি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সিত্তে বন্দরের যোগসূত্র স্থাপন করে রানং বন্দর পর্যন্ত সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগ সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়, তবে চীনসহ পুবের এই দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি ব্যয় অনেক কমে যাবে। সময়ের সাশ্রয় হবে। আর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটিই হবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথ। বঙ্গোপসাগর দিয়ে পূর্ব দিকের এই রুটটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সম্প্রতি ব্যাংককে যৌথ বাণিজ্য কমিশনের সভায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধসহ যেসব পণ্যের চাহিদা থাইল্যান্ডে প্রচুর এমন আরও ৩৬টি পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা চেয়েছেন। এমন কি বাংলাদেশ-থ্যাইল্যান্ড উভয় দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। থাইল্যান্ড বলেছে, তাদের সঙ্গে সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগ সম্পর্ক হলে দেশটি কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামের সঙ্গেও বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্য সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ফলে যৌক্তিকভাবেই এখন বাংলাদেশের চোখ পশ্চিম থেকে পুবের দিকে সরে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জনান, ভারত পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার পর মিয়ানমার, চীন, মিসর, তুরস্ক থেকে জাহাজে পিয়াজ এনে সংকট শামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারের দিক থেকে মনে করা হচ্ছে, ভারতের ওপর অতি নির্ভরশীলতার কারণে পণ্যটির দাম কয়েকগুণ বেড়ে কেজিতে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। এ অবস্থায় থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র যোগাযোগ সম্পর্ক তৈরি হলে নিত্যপণ্য আমদানিতে ভারত-নির্ভরশীলতা কাটানোর একটা সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া চীন, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এসব দেশে প্রচুর কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। এমন কি খাদ্য সংকট দেখা দিলেও এসব দেশ থেকে ধান বা চাল আমদানি করে সংকট মোকাবিলার সুযোগ রয়েছে। সরকারের খাদ্য ও নিত্যপণ্য আমদানিজনিত বিষয়টিও পূর্বমুখী সামুদ্রিক যোগাযোগ সম্পর্ক স্থাপনে প্রভাব রাখছে বলে জানান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য থাইল্যান্ডের সঙ্গে। ২০১৮ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য হয়েছে ১২৫ কোটি ডলারের। এ মুহূর্তে থাইল্যান্ড বাংলাদেশকে ৬ হাজার ৯৯৮টি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর