শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ জুলাই, ২০২০ ০০:১৭

পানির নিচে গ্রামের পর গ্রাম

১০ লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে, উঠানের পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

পানির নিচে গ্রামের পর গ্রাম
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা এলাকায় বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি -বাংলাদেশ প্রতিদিন

ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দ্বিতীয় দফা বন্যায় তলিয়ে গেছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর অধিকাংশ এলাকা।  ফের পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ১০ লক্ষাধিক মানুষ। কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে দুই শিশু। লালমনিরহাটে নদীগর্ভে বিলীন পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফুলগাজীর মুহুরী নদী ও পরশুরামের কহুয়া নদীর ৯টি স্থানে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে ১২টি গ্রাম। অব্যাহতভাবে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। গতকাল সকাল নাগাদ পর্যবেক্ষণাধীন ১০১টি পানি সমতল স্টেশনের ৬৪টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২৩ পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ধরলা, তিস্তা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, গুড়, আত্রাই, ধলেশ্বরী, আপার আত্রাই, পদ্মা, সুরমা, কুশিয়ারা, পুরাতন সুরমা ও সমেশ্বরী নদীর পানি। তবে কয়েকটি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকালের পূর্বাভাস অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদী আরিচা পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নাটোর, নওগাঁ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তবে নীলফামারী, লালমনিরহাট, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও রংপুর জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে আগামী ২৪ ঘণ্টায়। আমাদের বিভিন্ন জেলার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো সর্বশেষ বন্যা পরিস্থিতির অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো-কুড়িগ্রাম : নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা থানার বল্লভের খাষ ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ডুবে লামিয়া খাতুন (২) ও মিমি খাতুন (৭) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বাড়ির উঠানে থাকা বন্যার পানিতে পড়ে মৃত্যু হয় লামিয়ার। অপরদিকে বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মারা যায় মিমি। জামালপুর : যমুনাসহ শাখা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যমুনার পানি বেড়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকা ছাড়াও বিস্তীর্ণ জনপদে পানি ঢুকে গেছে। জামালপুর সদর, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার প্রায় ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বসতবাড়ি, ফসলি জমি, নলকূপ বন্যার পানিতে তলিয়ে দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও গো-খাদ্যের তীব্র সংকট। প্রথম দফার বন্যায় পাওয়া ত্রাণ সহায়তা ফুরিয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষ। বন্যাদুর্গতরা সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়াও বিভিন্ন উচু বাঁধ, সেতু এবং সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গত এলাকার বেশির ভাগ জায়গায় স্থানীয় ও আঞ্চলিক সড়কে বন্যার পানি উঠে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের ৫টি ইউনিয়নের রাস্তাঘাটসহ নিচু এলাকার বেশ কিছু বাড়িঘর বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। হাওরে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এম এল সৈকত জানান, ভারতের ত্রিপুরায় স্লুইস গেট খুলে দেওয়ায় খোয়াই নদীতেও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এখনো পানি বিপৎসীমার নিচে আছে। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে দু-এক দিনের মধ্যেই তা বিপৎসীমার ওপরে চলে যেতে পারে। কুড়িগ্রাম : নদী তীরবর্তী সাড়ে ৪ শতাধিক চর ও দ্বীপচর নিমজ্জিত হয়ে পড়ায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে আড়াই লক্ষাধিক মানুষ। সদর উপজেলার সারডোবে একটি বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রবল স্রোতের তোড়ে হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, ঘরের ধান-চালসহ অনেক জিনিস ভেসে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলার ৫৬টি ইউনিয়নের ৪ শতাধিক গ্রাম বন্যার কবলে পড়েছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড গতকাল দুপুর ৩টায় জানায়, ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী পয়েন্টে ৯৫ সেন্টিমিটার এবং দুধকুমার নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮৯  সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদীর পানি সামান্য কমে বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা-উপজেলা শহরের সঙ্গে চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে এসব এলাকার মানুষ। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। উঁচু রাস্তা, বাঁধ, স্কুল ঘর ও আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ।

সিরাজগঞ্জ : যমুনার পানি বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের ২১৬টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের কয়েক লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী মানুষের মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। চরাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার পানির মধ্যেই মানবেতর জীবনযাপন করছে। সার্বক্ষণিক পানির মধ্যে থাকায় হাত-পায়ে ঘা দেখা দিয়েছে। টিউবওয়েল তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি সংকট দেখা দিয়েছে।

নেত্রকোনা : নেত্রকোনায় প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। জেলার কংস নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও সীমান্ত উপজেলা কলমাকান্দার উব্দাখালি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জেলার কলমাকান্দা, বারহাট্টা ও সদর উপজেলাসহ নদী তীরবর্তী অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু কলমাকান্দা উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ২ শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজারের মতো মানুষ এখন পানিবন্দী। এ ছাড়াও জেলার সদর বারহাট্টা, দুর্গাপুরসহ হাওর উপজেলাগুলোর বিভিন্ন এলাকায় ২০ হাজারের মতো মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় আছে।

লালমনিরহাট : কমতে শুরু করেছে তিস্তার পানি। তবে জেলার ৫ উপজেলায় তীব্র ভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।

ফেনী : টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনীর ফুলগাজীর মুহুরী নদী ও পরশুরামের কহুয়া নদীর ৯টি স্থানে বাঁধ ভেঙে দুই উপজেলার ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলের খেত। ভেসে গেছে মৎস্য খামারসহ পুকুর। স্থানীয়রা বলছেন, ‘পাউবো টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে তাদের সর্বস্ব বিলীন হয়ে যায়। টেকসই বাঁধ চাই, ত্রাণ নয়।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর