শিরোনাম
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা

স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মে হার্ডলাইন

দুদক ৪ হাসপাতালে দুর্নীতির সন্ধানে, মামলা হচ্ছে

আহমেদ আল আমীন

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। এরই অংশ হিসেবে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং সিরাজগঞ্জে এম মনসুর আলী হাসপাতালসহ সরকারি চারটি হাসপাতালের দুর্নীতি ও জালিয়াতির খোঁজে মাঠে নেমেছে সংস্থাটি। সর্বশেষ রিজেন্ট হাসপাতালের মো. সাহেদ ও জেকেজি হেলথ কেয়ারের সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ১২ জুলাই কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের ছয় কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছে। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে পর্দা কেলেঙ্কারিতে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত নভেম্বরে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কমিশন। দুদক সূত্র জানিয়েছে, চারটি হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতি উদঘাটনে কমিশনের সর্বাত্মক অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে দুর্নীতির ব্যাপক তথ্য পাওয়া গেছে। শিগগিরই এ ঘটনায় মামলা করা হতে পারে। কমিশনের মুখপাত্র প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, যে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির মতো স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও দুদক হার্ডলাইনে রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি হাসপাতালের বিষয়ে কমিশনের অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জানা গেছে, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, মানিকগঞ্জে কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে দুর্নীতির অনুসন্ধান চলছে। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জে শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে মনসুর আলী মেডিকেলে ২৭৫ কোটি টাকার দুর্নীতির ঘটনায় অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে শিগগিরই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেবে সংস্থাটি।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, মনসুর আলী মেডিকেলের জন্য নিম্নমানের ও ব্যবহার অনুপযোগী যন্ত্রপাতি-আসবাবপত্র কেনাকাটায় ২৭৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। আর এই টাকা আত্মসাতে মূল ভূমিকা রাখার অভিযোগে প্রকল্প পরিচালক কৃষ্ণ কুমার পালকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থার উপ-সহকারী পরিচালক শাহজাহান মিরাজ তাকে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এর আগে ২৬ নভেম্বর কৃষ্ণ কুমারকে তলব করে চিঠি পাঠান স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি অনুসন্ধানে গঠিত কমিশনের একটি টিমের দলনেতা ও সংস্থার উপপরিচালক সামসুল আলম। তবে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুদক সূত্র জানায়, প্রকল্পের দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমে বিভিন্ন ধরনের নথি পর্যালোচনা করেছে দুদক। এর মধ্যে আছে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধানের চাহিদাপত্র, পরিচালক ও অধ্যক্ষের চাহিদাপত্র, অনুমোদিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, বরাদ্দপত্র ও প্রশাসনিক অনুমোদন। এ ছাড়া দরপত্র সংক্রান্ত কমিটি গঠনের নথি, বাজার দর কমিটির প্রতিবেদন, চুক্তিপত্র, কাজের জামানতও খতিয়ে দেখেছে দুদক। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দুর্নীতির দালিলিক প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এর বাইরে কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা সামগ্রী ও ভারী যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধানে নেমেছে সংস্থাটি। দুদকের একটি টিম সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে। এই টিমের অপর সদস্যরা হলেন উপপরিচালক সামসুল আলম, সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী, উপসহকারী পরিচালক জালাল উদ্দিন, শাহজাহান মিরাজ, ফেরদৌসী রহমান ও শহীদুর রহমান। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মানিকগঞ্জে কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের কাছে ৯ জুলাই নোটিস পাঠানো হয়েছে। ওই নোটিসে কেনাকাটায় হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধানের চাহিদাপত্র, তত্ত্বাবধায়কের চাহিদাপত্র, অনুমোদিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ও বরাদ্দপত্রসহ ২৫ ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এই টিমের একজন কর্মকর্তা বলেন, এসব হাসপাতালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কেনাকাটায় কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে দুদকের হাতে। তা নিশ্চিত হতেই তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এসব হাসপাতালে কেনাকাটায় যুক্ত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। দুদকের উপসহকারী পরিচালক জালাল উদ্দিন ৯ জুলাই গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেলের জন্য কেনাকাটায় অনিয়ম খুঁজতে বেশ কিছু তথ্য চেয়েছেন। তিনি ওই মেডিকেলের অধ্যক্ষের কাছে ২২ ধরনের তথ্য চেয়েছেন। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের কেনাকাটায় সব ধরনের তালিকা ও তথ্য সরবরাহ করতেও নোটিস দিয়েছে দুদক। এর আগে গত মার্চে হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া ও তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩৬ কোটি টাকার দুর্নীতির মামলা হয়। এসব মামলায় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কেনাকাটায় দুর্নীতি হয়েছে বলে উঠে আসে।

সর্বশেষ ১৩ জুলাই রিজেন্টে হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদের দুর্নীতির অনুসন্ধানে সংস্থাটির উপপরিচালক মো. আবু বকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করে দুদক। এই টিম থেকে পরদিনই সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ নয়টি প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই দিন জেকেজির চেয়ারম্যান সাবরিনার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানেও মাঠে নামে দুদকের একটি টিম। কমিশনের বিশেষ তদন্ত অনুবিভাগের মাধ্যমে এই অভিযোগের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এর আগে মাস্ক ও পিপিইসহ নিম্নমানের স্বাস্থ্য সরঞ্জাম সরবরাহের ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগে জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রাজ্জাকসহ কয়েকজনকে এরই মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একই অভিযোগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) ছয় কর্মকর্তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে। ১৯ ও ২০ জুলাই তাদেরকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর