শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:১৬

ভেজাল পণ্যের দৌরাত্ম্য

প্রসাধনীর বাজারে শুধুই নকল

৩৫ গডফাদার করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ

জিন্নাতুন নূর

প্রসাধনীর বাজারে শুধুই নকল

শিশুর খাদ্য থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, প্রসাধনী সামগ্রী, প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, বৈদ্যুতিক তার, মাস্ক, ওষুধ, কাপড়কাচার সাবান, এনার্জি সেভিং বাল্ব, কয়েল, বৈদ্যুতিক সুইচ, গাড়ি ও কম্পিউটারের বিভিন্ন পার্টস, মোবাইল হ্যান্ডসেট সবই নকল তৈরি করা হচ্ছে। গোটা দেশ সয়লাব ভেজাল পণ্যে। এমনকি মহামারীর মধ্যেও লাগাম টেনে ধরা যায়নি ভেজালকারীদের। জানা যায়, শুধু ভেজাল প্রসাধনীর রমরমা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন দেশের ৩৫ গডফাদার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল কোর্টে ভেজালকারীদের যে সাজা দেওয়া হয় তা উল্লেখযোগ্য নয়। অপরাধীরা শাস্তি পেয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে আবার পুরনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তাই যারা ভেজাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের শনাক্ত করে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। দেশি-বিদেশি নামিদামি প্রায় সব ব্র্যান্ডের প্রসাধনীই নকল তৈরি করা হচ্ছে। করোনকালে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জীবাণুনাশক স্প্রেতেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে আমদানিকৃত মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্যের গায়ে নতুন উৎপাদন তারিখ বসিয়ে বিপণন করা হচ্ছে। জনপ্রিয়তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মডেলের টিভি নকল করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। কম দামের লোভ দেখিয়ে ক্রেতাদের কাছে নকল টিভি সেট গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। চীনা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ওপর নামিদামি ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার করোনা সংক্রমণের শুরুতে ভ্রাম্যমাণ অভিযান বন্ধ থাকার সুযোগে কিছুটা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ভেজালকারীরা। করোনার কারণে কিছু পণ্যের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে। যেমন স্যানিটাইজার, জীবাণুনাশক স্প্রে, সাবান, পিপিই, ফেস মাস্ক ইত্যাদি। ফার্মেসি ও বড় দোকানগুলোর পাশাপাশি ফুটপাথেও এখন নিম্নমানের এ পণ্যগুলোর নকল বিক্রি করা হচ্ছে। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ওষুধের মার্কেটগুলোয় এসব নকল পণ্যের জমজমাট ব্যবসা। ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় তৈরি হচ্ছে নকল এন-৯৫ ও কেএন-৯৫ মাস্ক। দেখে মনে হবে হয়তো চীন থেকে এগুলো আমদানি করা। কিছু ক্ষেত্রে আবার ক্রেতার কাছ থেকে চীনা মাস্ক বলেই নেওয়া হয় অতিরিক্ত দাম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, পুরান ঢাকার চকবাজার, লালবাগ ও কেরানীগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নকল প্রসাধনী তৈরির বহু কারখানা। চীন থেকে বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের প্রসাধনীর কৌটা বা পাত্র নকল করে বানিয়ে এনে তা কেরানীগঞ্জ বা চকবাজারের গোডাউনে রিফিল করে বাজারে অরিজিনাল বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু ‘ট্রেসেম’-এর একটি বোতল চীন থেকে হুবহু নকল করে বানিয়ে আনতে একজন ভেজালকারীর খরচ পড়ছে ১৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে যদি এ শ্যাম্পু ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয় তাহলে সেই ব্যবসায়ীর প্রতি বোতলে লাভ ৩৫০ টাকা। একইভাবে চীন থেকে আরেকটি বিশ্বখ্যাত পণ্য ‘ডাভ’-এর নকল সাবান তৈরি করে এনে তা বাজারে আসল ডাভ সাবান বলে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ এ সাবানটির মান দেশের হুইল সাবানের চেয়েও খারাপ। বিখ্যাত কসমেটিকস লোরিয়েলের পণ্যগুলোও চীন থেকে নকল তৈরি করে এনে বাংলাদেশে আসল বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ফেলে দেওয়া বিভিন্ন প্রসাধনীর পাত্রগুলো সংগ্রহ করে পরিষ্কার করার পর তাতে ভেজাল প্রসাধনী ঢুকিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। জানা যায়, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় খুচরা ব্যবসায়ীদের নকল পণ্য কিনতে বাধ্য করেন ভেজাল প্রসাধনীর আমদানিকারকরা। মূলত চকবাজার, কেরানীগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চকমোগলটুলি, উর্দু রোড, জিনজিরা, বেগমবাজার, কামালবাগ, ইসলামবাগ, বড় কাটারা, ছোট কাটারা ও কামরাঙ্গীর চরে ভেজাল প্রসাধনী তৈরির অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বল্প পুঁজিতে অধিক মুনাফার জন্যই ভেজালকারীরা জেল-জরিমানা খেটেও আবার এ ব্যবসায় ফিরে আসেন। আবার মোবাইল কোর্টেও ভেজালকারীদের যে সাজা দেওয়া হয় তা উল্লেখযোগ্য নয়। অপরাধীরা তখন শাস্তি পেলেও স্বল্প সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে আবার পুরনো অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।’ প্রসাধনী ছাড়াও যাত্রাবাড়ীর মীরহাজিরবাগে অনেক আগে থেকেই আছে নকল ফ্যানসহ ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা। রায়ের বাগে আছে নকল ‘খাঁটি’ গাওয়া ঘি, মধু, দই ও মিষ্টির কারখানা। যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা এলাকাতেই নকল ক্যাবল তৈরির কারখানা কমপক্ষে ৫০টি। দনিয়া ও পাটের বাগ এলাকায় নকল মশার কয়েল, ঘি, গুড়, হারপিক, খাবার স্যালাইন, ভিটামিন ওষুধ, সুইচ, সকেট, হোল্ডার কারখানা আছে বেশ কয়েকটি। আছে নকল মিনারেল ওয়াটারের শতাধিক কারখানা। মুগদায় নকল সয়াবিন তেল থেকে শুরু করে নকল ডিটারজেন্ট পাউডার তৈরি হচ্ছে অবাধে। পুরান ঢাকার নর্থ সাউথ রোডের অলিগলিতে তৈরি হচ্ছে নকল টিভি, ফ্রিজ, এনার্জি সেভিং বাল্ব, মোটর, ফ্যান, এয়ারকন্ডিশন মেশিনসহ বিভিন্ন দামি ইলেকট্রিক সামগ্রী। আবার অধিক মুনাফার জন্য একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মসলায় কাপড়ের বিষাক্ত রং, দুর্গন্ধযুক্ত পটকা মরিচের গুঁড়া (নিম্নমানের মরিচ), ধানের তুষ, ইট ও কাঠের গুঁড়া, মটর ডাল, সুজি ইত্যাদি মেশাচ্ছেন। কিছু দিন আগে র‌্যাবের অভিযানে ঢাকার মাতুয়াইলে আজিজ ক্যাবলস নামের কারখানায় বিএসটিআই থেকে তিন ক্যাটাগরির বৈদ্যুতিক ক্যাবলস তৈরির লাইন্সেস নিয়ে বিসিএস, পলি, বিআরবি কোম্পানির নামে নকল তার তৈরি করার বিষয়টি সামনে আসে। ভেজালকারীরা চাইনিজ প্রিন্টিং মেশিন দিয়ে সহজেই নকল তারে নামিদামি কোম্পানির নাম বসিয়ে বাজারে বিক্রি করছেন। এমনকি ক্যাসিয়ো, সিটিজেনসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ক্যালকুলেটরও নকল করে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান নামিদামি ব্র্যান্ডের টিভিও নকল করছে। সম্প্রতি মুনস্টার মার্কেটিং প্রাইভেট নামের একটি প্রতিষ্ঠান সনি, ব্রাভিয়া, এলজি ও স্যাসমাং ব্র্যান্ডের টিভির নকল তৈরি করছিল। এ পণ্যগুলোর গায়ে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তৈরি লেখা থাকলেও র‌্যাবের অভিযানে দেখা যায় তা নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানায় তৈরি। এ ছাড়া অভিযানে বিভিন্ন সময় ব্র্যান্ডের মোবাইলের নকল ব্যাটারি তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পংকজ চন্দ্র দেবনাথ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ মহামারীতেও আমরা প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করছি। যারা খাদ্যে ভেজাল মেশাচ্ছেন তারা কিছু ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে বেশি মুুনাফা লাভের জন্য এমন কাজ করছেন। তবে এদের শুধু শাস্তি দিয়ে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়।’ তিনি আরও জানান, শাস্তি নিশ্চিতের পর কিছু ক্ষেত্রে ভেজালকারীদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আমিমুল এহসান বলেন, ‘দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর প্রথম দিকে এবং লকডাউনে আমাদের অভিযান স্বাভাবিক কারণেই বন্ধ ছিল। কিন্তু এখন নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। প্রতি মাসে শিডিউল অনুযায়ী সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন আমরা ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চালাই।’


আপনার মন্তব্য