শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:২৮

মৃত্যুদণ্ডেও ভয় নেই ধর্ষকের

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস আজ

জিন্নাতুন নূর

বাংলাদেশে ধর্ষণের জন্য অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড ঘোষণার পরও ধর্ষণের ঘটনা কমেনি, উল্টো বেড়েছে। গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা যায়। অর্থাৎ মৃত্যুদন্ডেও ধর্ষকদের ভয় নেই! নারী নেত্রী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশিরভাগ মানুষেরই ধর্ষণ সংক্রান্ত সংশোধিত নতুন আইন সম্পর্কে ধারণা নেই। এ ব্যাপারে মানুষজনকে সচেতন করতে হলে হাট-বাজারে বিলবোর্ড বা স্ক্রিনে ছবিসহ সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনে অনেক দুর্বলতা আছে বলেও তারা মন্তব্য করেন। এগুলো না কাটালে বিচার সঠিকভাবে হবে না। এই অবস্থায় আজ বিশ্বের সঙ্গে তাল রেখে বাংলাদেশেও পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আজ থেকে আগামী ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষও পালিত হবে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘কমলা রঙের বিশ্বে নারী বাধার পথ দেবেই পাড়ি।’ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৭৬২ জন নারী  ধর্ষণের শিকার হন। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ২০৮ জন। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয় ৪৩ জনের। এ সময় মামলা দায়ের করা হয় ৭১৯টি ধর্ষণের ঘটনায়। একই সংস্থার তথ্যে জানুয়ারি থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ১ হাজার ৬৬ জন  নারী ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ২৭৭ জন। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয় ৪৬ জনের। এ সময় ৯৪৮টি ধর্ষণের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। অথচ গত অক্টোবর মাসেই ধর্ষণের শাস্তি বৃদ্ধি করে মৃত্যুদন্ড করা হয়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের স্বাক্ষরের পর গত ১৩ অক্টোবর ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২০’ আকারে গেজেট প্রকাশিত হয়। কিন্তু শাস্তি মৃত্যুদন্ড হওয়ার পরও অক্টোবরে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা যে ধর্ষকদের কথা বলছি, তারা এই আইন সম্পর্কে আদৌ জানে কিনা, সন্দেহ আছে। ফলে সংশোধিত আইনে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। এ ধরনের মানুষ এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন না। যারা কিছুটা জানেন, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকেই কিছুটা জেনেছেন। মানুষের মধ্যে এ সম্পর্কিত সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। দেশবাসীকে নতুন আইন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। হাটে-বাজারে বিলবোর্ড বা স্ক্রিনে ছবিসহ সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে। আর তখনই মানুষ বিষয়টা নিয়ে ভাববে। টিভি ও ফেসবুকেও এই বিষয়গুলো প্রচার করতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করেই এই অপরাধ কমানো যাবে না। ক্ষমতাধর ও বিকৃত রুচির ধর্ষকদের সমাজই তৈরি করেছে। কারণ পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা সমাজই এদের করে দিয়েছে। আইন তৈরি হয় অপরাধ কমিয়ে আনার জন্য; কিন্তু আইন বাস্তবায়নের যে অবকাঠামো প্রয়োজন, তা আমাদের নেই। শক্ত মনিটরিং ব্যবস্থা রাখতে হবে। পর্নোগ্রাফি বন্ধের ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণেও কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে। নারী অধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক কাঠামো, বিচারিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সব জায়গায় কিছু একটা দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে। ধর্ষণের সঙ্গে অনেক ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা দেখছি কোনো একটি বিষয় যখন প্রধানমন্ত্রীর কানে যায় তখন তিনি সে বিষয়ে অ্যাক্ট করতে বলেন। কিন্তু একটি সিস্টেম একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সবার দায়িত্ব আছে। মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা অনেক বেড়ে গেছে। ধর্ষকরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণে এমন হচ্ছে। শুধু স্লোগানের ওপর একটি আইন সংশোধন করা যায় না। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে মাত্র তিন ভাগের রায় হয়েছে। সেই রায়ে ধর্ষককে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে মাত্র ০.৪ শতাংশ। তাহলে ধরে নিতে হবে পুলিশি তদন্ত এবং এ সংক্রান্ত সাক্ষী দেওয়ার ব্যবস্থায় দুর্বলতা আছে। ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনে অনেক দুর্বলতা আছে। এগুলো না কাটালে বিচার সঠিকভাবে হবে না। ধর্ষকরাও প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যাবে।

 


আপনার মন্তব্য