শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:১৭

বাদী নিজেই ছিলেন খুনি

মির্জা মেহেদী তমাল

বাদী নিজেই ছিলেন খুনি

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বংশীতলা গ্রামের বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ। দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন তিনি। খুনের পর মামলা হয়েছে, মামলার তদন্তও ঘুরেছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যের হাতে। তিন দশকেরও বেশি সময় লেগেছে হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে। পুলিশ জানতে পারে, বাদী নিজেই ছিলেন খুনি। অন্যকে ফাঁসাতে খুনি নিজেই বাদী হয়েছিলেন। কিন্তু এক সময় তদন্তে আসল সত্য ঠিকই বেরিয়ে এসেছে। বাদী হয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি খুনি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, খুনি নিজেকে রক্ষা করতে যত কৌশলই নিক, কোনো লাভ হবে না। ধরা তাকে পড়তেই হবে। কারাগারই হবে তার আসল ঠিকানা। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদস্যদের তদন্তে এমনই এক ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। ৩১ বছর পর খুনি ধরা পড়েছে। মামলার বাদী নিজেই খুন করেছেন সেই নূর মোহাম্মদকে! প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুন করা হয় তাকে। পিবিআই জানায়, দরিদ্র নূর মোহাম্মদ শ্বশুরবাড়ি বংশীতলা গ্রামে বসবাস করতেন। সেখানে মাজেদ আলী জোয়ার্দার ও আলতাফ মোল্লা নামে দুজন মাতব্বর ছিলেন, এলাকায় তাদের কথাই ছিল শেষ কথা। মাজেদ আলীর বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন নূর মোহাম্মদ। ১৯৮৭ সালের জুন মাসের এক সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় খুন হন নূর মোহাম্মদ। এ ঘটনার পরদিন ২৫ জুন কুষ্টিয়া সদর থানায় মাজেদ আলী    

বাদী হয়ে মামলা (নম্বর-২৬) করেন। মামলায় আসামি করা হয় গ্রামের আরেক মাতব্বর আলতাফসহ ১৩ জনকে। এরপর রহস্য ভেদের দিন গণনা শুরু হয়, এক এক করে কেটে যায় ৩১ বছর। ঘটনার প্রায় দুই মাস পর মামলাটি পুলিশের তদন্তকারী সংস্থা (সিআইডি)-তে হস্তান্তর করা হয়। এর কয়েক মাস পর নূর মোহাম্মদের স্ত্রী তহরুন্নেসা ‘তদন্ত সঠিক হচ্ছে না’ মর্মে অভিযোগ এনে আদালতে ফৌজদারি মিস মামলা দায়ের করেন। ছয় মাস শুনানি শেষে আদালত সেই অভিযোগ খারিজ করে দেয়। অর্থাৎ খুনের মামলার তদন্ত সঠিক হচ্ছে। তদন্তের সময় চলে যাচ্ছিল বলে সিআইডি আদালতের কাছে দুই মাস সময় বৃদ্ধির অনুমতি চায়। আদালত এক মাস সময় মঞ্জুর করে আদেশ দেয়। এরপর নূর মোহাম্মদের স্ত্রী ’তদন্ত সঠিক হচ্ছে না’ ও ’তদন্ত সময় এক মাস বৃদ্ধি’ আদেশ দুটির বিরুদ্ধে হাই কোর্ট বিভাগে রিভিশন করতে আদালতে আবেদন করেন এবং রিভিশন চলাকালীন মামলার ডকেট আদালতে রাখতে চান।

আদালতের নির্দেশে কেস ডকেট সিআইডি থেকে আদালতের হেফাজতে চলে আসে। রিভিশন মামলা দুটির প্রায় ছয় বছর শুনানি শেষে হাই কোর্ট জেলা আদালতের পক্ষেই রায় দেয়। এরপর সিআইডি আবার মামলার তদন্ত শুরু করে। এরপর সিআইডি নূর মোহাম্মদের ছেলে আমিরুলকে দিয়ে কুষ্টিয়া সদর থানায় আরেকটি নতুন হত্যা মামলা দায়ের করায়। এ মামলায় আগের মামলার বাদী মাজেদসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। একই দিন সিআইডি আগের মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠায়। রিপোর্টে আলতাফসহ অন্য আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদিকে, প্রথম মামলার বাদী মাজেদ সিআইডির ’ফাইনাল রিপোর্টের’ বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ’না রাজি’ দেন, অর্থাৎ এ মামলাও চলবে। নিয়ম অনুযায়ী একই ঘটনায় দুটি মামলা চলতে পারে না। ফলে দ্বিতীয় মামলাটির তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। তখন মাজেদ নূর মোহাম্মদ খুনের ন্যায়বিচারের জন্য ’না রাজি’, ’আপিল’, ‘রিভিশন’ ও ‘আদালত পরিবর্তন’সহ বিভন্ন পন্থায় চেষ্টা করতে থাকেন। এদিকে নূর মোহাম্মদের স্ত্রীসহ পরিবার ততদিনে সব আশাই ছেড়ে দেয়। বাদী মাজেদের বয়স ৯০ বছর। মৃত্যুশয্যায় থাকা মাজেদ আদালতেও যান না। এ বিষয়ে সব তদবির থেমে যাওয়ায় গত বছর আদালত প্রথম মামলার ফাইনাল রিপোর্টটি গ্রহণ করে এবং নূর মোহাম্মদের ছেলে আমিরুলের দায়ের করা দ্বিতীয় মামলাটির তদন্ত পিবিআইতে দেয়। খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রায় তিন দশক আগের একটি খুনের ঘটনায় পিবিআই প্রমাণ পায় প্রথম মামলার বাদী মাজেদ আলীর প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও উপস্থিতিতে ১০ জন মিলে নূর মোহাম্মদকে খুন করে। খুনের আগমুহূর্তে অন্ধকারে চিৎকার করে গ্রামে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেন কোনো সাক্ষী না থাকে। সেই মাজেদ আলীই নূর মোহাম্মদের স্ত্রীকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে নিজে মামলার বাদী হয়েছিলেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর