শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ মার্চ, ২০২১ ২৩:৩৩

মেঝের ওপর রক্তে ভেজা কাপড়

মির্জা মেহেদী তমাল

মেঝের ওপর রক্তে ভেজা কাপড়
Google News

সাতসকালে ঘরের দরজা খুলে পুলিশ দেখেই বিরক্ত লাবণী। ম্যাডাম, আমি মিরপুর থানা থেকে এসেছি। আপনার নাম কি লাবণী? পুলিশের এমন প্রশ্নে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয় লাবণীর। তিনি জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন রাখেন, কেন বলুন তো? না, আমরা একটি জিডির তদন্ত করতে এসেছি। আপনি যদি লাবণী হয়ে থাকেন, তাহলে এটি আপনি করেছেন। আপনিই তো আপনার স্বামী সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে জিডি করেছেন। এ কথা শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন লাবণী। ও আচ্ছা, তাই বলুন। হ্যাঁ, আমার নাম লাবণী। আসুন, ভিতরে আসুন। বসুন। পুলিশের এসআই ড্রইং রুমের একটি শোফায় বসেন। চারদিকটা দেখে নিচ্ছেন ভালো করে। লাবণী তার উল্টো পাশের শোফায় বসে কথা শুরু করলেন। দেখুন না, আমি তো কেমন ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। হঠাৎ পুলিশ কেন এলো, কী বিষয়ে এলো! আপনাকে দেখে অবাক আমি। শুনে পুলিশ লাবণীর দিকে তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকায়। বলে, কেন আপনি যে আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে জিডি করেছিলেন, তা ভুলে গেছেন? আপনার স্বামীকেও প্রয়োজন। স্বামীর কথা শুনেই চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায় লাবণীর। পুলিশের চোখ এ বিষয়টি এড়ায় না। পুলিশ কর্মকর্তা লাবণীর কাছে এক গ্লাস পানি চান। লাবণী পানি আনতে ভিতরে চলে গেলেন। মিরপুর থানায় লাবণী একটি জিডি করেন। জিডিতে তিনি তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, তাকে মারধর করেন। তিনি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। অন্যদিকে লাবণীর শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও নিখোঁজের বিষয়ে জিডি করা হয়। লাবণীর স্বামীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এই জিডির খবর লাবণী জানতেন না। পুলিশের কর্মকর্তা দুটো জিডির তদন্ত করতে লাবণীর ফ্ল্যাটে যান। লাবণী পানি আনতে গেলে কর্মকর্তা আশপাশে চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। বাসায় কি আর কেউ নেই? তাহলে তারা যে সংবাদ পেয়েছিল, সেটা কি সঠিক? তার স্বামী নিখোঁজ বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে স্ত্রীর বিরুদ্ধে তা কতটুকু সত্য হতে পারে! এমন নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে পুলিশ কর্মকর্তার। ছোট ছোট পায়ে খুব সাবধানে তিনি ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে করিডরের দিকে যান। ফ্লোরের এক কোণে রক্তে ভেজা কাপড় দেখতে পান। সেটি দ্রুত তুলে নেন। বেশি সময় হয়নি রক্ত লেগেছে। বুঝতে পারেন তিনি। সেটি নিয়েই তিনি ড্রইং রুমে চলে আসেন। নাস্তা-পানি নিয়ে চলে এসেছেন লাবণী। পুলিশ কর্মকর্তার সরাসরি প্রশ্ন, আপনার স্বামী সালাউদ্দিনকে খবর দিন। লাবণী বলেন, ও তো বাসায় নেই। কাল রাতে বেরিয়েছে। ফেরেনি এখনো। আমাকে কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন। তার আগে নাস্তা করে নিন। কিন্তু সেই রক্তের কাপড় দেখে পুলিশ কর্মকর্তার আর ভালো লাগছে না। লাবণীর জিডি তদন্ত করতে গিয়ে উল্টো তাকেই সন্দেহ করছে পুলিশ। ভাবছে, সালাউদ্দিনের পরিবার যে অভিযোগ করেছে, তা কি সঠিক? লাবণীকে প্রশ্ন করতে গেলেই উল্টো প্রশ্ন রাখেন পুলিশকে। কিন্তু বেশিক্ষণ এভাবে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি লাবণী। পুলিশ যখন রক্তে ভেজা কাপড়ের টুকরোটি লাবণীর চোখের সামনে ঝোলাতে থাকেন, তখন আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে না লাবণীর। ধরা তাকে দিতেই হবে। পুলিশের নানা প্রশ্নের জালে স্বীকার করতে বাধ্য হন। পুলিশ ওয়ারড্রোব খুলে ড্রয়ার থেকে বের করে আনে সালাউদ্দিনের লাশ। স্বামী হত্যার দায়ে গ্রেফতার হন লাবণী। পুলিশ জানিয়েছে, পরকীয়ার সন্দেহে স্বামীকে হত্যা করেছেন লাবণী। ঘটনাটি রাজধানীর মিরপুরের কল্যাণপুরের। ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর সালাউদ্দিনের লাশ পুলিশ উদ্ধার করে ওয়ারড্রোব থেকে। স্ত্রী লাবণী বঁটি দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে তাকে। গুম করতে লাশটি লেপ মুড়ি দিয়ে ওয়ারড্রোবের ভিতরে লুকিয়ে রাখে। লাবণীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

প্রেম করে দুটি বিয়ে করেছিলেন সালাহউদ্দিন। তবে প্রথম স্ত্রীর অজান্তে দ্বিতীয় বিয়ে করেন তিনি। এই বিয়ের কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন তার প্রথম স্ত্রী লাবণী। হত্যার আগে স্বামীর বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। হত্যার পর তার লাশটি লেপ ও চাদর দিয়ে মুড়ে ওয়ারড্রোবের ভিতরে রেখে দেওয়া হয়। সময় সুযোগ মতো লাশটি বাসার বাইরে নিয়ে গুম করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু নিজের করা জিডির তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ফাঁস হয়ে যায় ভয়ংকর সেই খুনের ঘটনা। তাৎক্ষণিক আটক করা হয় লাবণীকে। পুলিশ জানায়, খুন করার আগে লাবণী তার স্বামীর বিরুদ্ধেই থানায় জিডি করে আসেন নিজেকে নিরাপদে রাখতে।

পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসা তথ্যে জানা যায়, দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে লাবণীর সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ চলছিল। এক পর্যায়ে সালাউদ্দিন বাসা থেকে বেরিয়ে যান। তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী মাহমুদা আক্তারের বাসায় ওঠেন। সেখান থেকে পরে যান গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়ার আটপাড়ায়। কিন্তু সালাউদ্দিনের মা পারভীন আক্তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম স্ত্রী লাবণীর বাসায় যান। তিনি সালাউদ্দিনকে ওই বাসায় রেখে চলে যান। দুই পরিবারের গার্ডিয়ানদের মধ্যে বৈঠক হয়। সেখানে তাদের মিলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু লাবণী সবার সামনেই সালাউদ্দিনকে মারধর করেন। সালাউদ্দিন এ সময় তার মাকে বলেন, ‘মা আমাকে এখানে রেখে যেও না। তোমাদের সামনেই আমাকে মারল। তোমরা চলে যাওয়ার পর আমাকে মেরেই ফেলবে।’ এ সময় পরদিন আবারও বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেই রাতেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আঁটেন লাবণী।

সালাউদ্দিনের মা, বোন ও ভগ্নিপতি চলে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে আবারও ঝগড়া বাধে। সালাউদ্দিন কিছু সময়ের জন্য বাইরে যান। আবারও বাসায় ফিরে আসেন। লাবণী ওই ফাঁকে থানায় গিয়ে তার স্বামী নিখোঁজ বলে জিডি করেন। তিনি বাসায় ফিরে এসে সালাউদ্দিনের সঙ্গে আবারও ঝগড়া বাধান। রাতে ঘুমিয়ে পড়েন সালাউদ্দিন। এরপর বঁটি দিয়ে ঘুমন্ত সালাউদ্দিনকে কোপাতে থাকেন লাবণী। ঘটনাস্থলেই মারা যান সালাউদ্দিন। সকালে লাশ গুম করতে বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। সালাউদ্দিনের লাশ লেপ দিয়ে মুড়িয়ে ওয়ারড্রোবে ভরে রাখেন লাবণী। লাশের মাথা নিচে ও পা ওপরের দিকে করে ভাঁজ করা ছিল।