শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৫৭

আকাশছোঁয়া করোনা চিকিৎসা

বেসরকারি মাঝারি হাসপাতালে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা, তারকা হাসপাতালে ৫ থেকে ১০ লাখ, ঋণ নিয়ে খরচ জোগাড় করছেন অনেকেই

জিন্নাতুন নূর

আকাশছোঁয়া করোনা চিকিৎসা
ঢাকা মেডিকেলে গতকাল এক রোগী .-রোহেত রাজীব

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ও তার পরিবারকে চিকিৎসা খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য সরকারি কিংবা  বেসরকারি হাসপাতালের খরচ, বাড়িতে থেকে ওষুধের খরচ কোনোটিই কম নয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়া হলেও রোগীদের উচ্চমূল্যের ওষুধ খরচ বহন করতে হচ্ছে। কভিড আক্রান্তরা চিকিৎসার জন্য যে আইসিইউ  বেডে ভর্তি হন তার খরচ দৈনিক ২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে চিকিৎসার ধরনভেদে সর্বোচ্চ লাখ টাকা। আবার বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চহারে ফি আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে এক দিনে অক্সিজেনের যে খরচ আসে তা অনেকের পক্ষেই বহন করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় রোগীর পরিবার ঋণ করে চিকিৎসা খরচ চালাচ্ছে। কেউবা হাসপাতালে থাকা প্রয়োজন হওয়া সত্ত্বেও খরচের ভয়ে আগেই হাসপাতাল ছেড়ে দিচ্ছেন। চিকিৎসা খরচ জোগাতে রোগী ও তার পরিবার ব্যাংকের জমানো টাকা শেষ করে ক্রেডিট কার্ড এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিচ্ছেন। রাজধানীর উত্তরার ষাটোর্ধ্ব ব্যবসায়ী শফিকুর রহমান গত মার্চে করোনা পজিটিভ হয়ে উত্তরার একটি মধ্যমানের বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। অক্সিজেন স্যাচুরেশন দ্রুত কমে যাওয়ায় শফিকুরকে হাসপাতালটির বিশেষ কভিড ইউনিটে রাখা হয় এবং বিশেষ একটি ইনজেকশন (এভাস্টিন) যার দাম ১ লাখ ২২ হাজার টাকা এর ডোজ দিতে হয়। এই ব্যবসায়ীকে এক সপ্তাহ আইসিইউতে থাকতে হয়। পরে প্রথমে কভিড ওয়ার্ড এবং করোনা  নেগেটিভ হলে সাধারণ কেবিনে পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে দুই সপ্তাহের বেশি হাসপাতালে অবস্থান করে তার ওষুধসহ চিকিৎসা খরচ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। শফিকুর রহমানের কভিড পজিটিভ হওয়ার তিন দিন পর তার স্ত্রী জোবাইদা আক্তারও করোনায় আক্রান্ত হন। জোবাইদাকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন না হলেও ঘরে থেকে তার যে চিকিৎসা চলে, তাও ছিল ব্যয়বহুল। ‘ফেভিলার’ নামের একটি ট্যাবলেট প্রথম দিন সকালে ৮টি এবং রাতে ৮টি করে খেতে দেওয়া হয়। এর একটি ট্যাবলেটের দামই ২ হাজার টাকা। এক সপ্তাহ জোবাইদাকে খেতে হয় প্রায় ৫০টির মতো ট্যাবলেট। সব মিলিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য শফিকুর দম্পতিকে ভালো অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই ব্যবসায়ীর চাকরিজীবী পুত্র শামিউর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, চিকিৎসার এই বড় অঙ্কের খরচ কভিড আক্রান্তের পরিবারের জন্য অবশ্যই অনেক বড় বিষয়।

নাসরিন আক্তার নামে এক গৃহবধূ জানান, কভিড আক্রান্ত হয়ে তাকে এক সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। এ জন্য হাসপাতালকে দেড় লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। কিন্তু নাসরিন হাই ফ্লো অক্সিজেন সেবা গ্রহণ করেননি। নাসরিনের কভিড পজিটিভ স্বামী নাজিমেরও আইসিইউ সাপোর্টের দরকার পড়ে। এতে এই দম্পতির চিকিৎসা খরচ আরও বৃদ্ধি পায়। সব মিলিয়ে তাদের এক মাস তিন দিনের মতো হাসপাতালে থাকতে হয়। নাসরিনকে আট দিনের মধ্যে কেবিন থেকে ছেড়ে দিলেও তার স্বামীকে থাকতে হয় এক মাস দুই দিন। সব মিলিয়ে তাদের চিকিৎসা খরচ বাবদ ১৩ লাখ টাকা হাসপাতালকে দিতে হয়। বাসায় ফেরার পরও নানারকম চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নাসরিনের স্বামীকে যেতে হয়। এতে সব মিলিয়ে তাদের খরচ হয় ১৮ লাখ টাকা।

করোনা চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকায় একেবারে সাধারণ কেবিন বেডের ভাড়া দৈনিক গড়ে ২ হাজার টাকা। আর মধ্যমানের বেড ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। আর ভালোমানের হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর বেড ভাড়া ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। ওষুধ খরচ ছাড়াও অক্সিজেন, খাওয়ার খরচ, স্টাফ, নার্স মিলিয়ে সবকিছুর আলাদা খরচ রোগীকে দিতে হয়।

অনেক বেসরকারি হাসপাতালে এখন সাধারণ বেড নেই। সাধারণ বেডগুলোকে আইসিইউ রূপান্তর করা হয়েছে। কেবিনের বিছানাতেই দুটি যন্ত্র লাগিয়ে একে আইসিইউ বেড বানানো হচ্ছে। আর আইসিইউতে থাকলেই অতিরিক্ত মেশিন বিল, অক্সিজেনের বিল দিতে হয়। অর্থাৎ সাধারণ হাসপাতালে একটি কেবিন বেডের দৈনিক খরচ যেখানে ৬ হাজার টাকা এর সঙ্গে ওষুধসহ যাবতীয় খরচ গড়ে ১০ হাজার টাকা। সেখানে একই হাসপাতালে আইসিইউতে থাকলে খরচ গড়ে খরচ হবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ বেডের ভাড়া দৈনিক ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর আইসিইউ ও এসডিউ-এর বেডগুলোর খরচ দৈনিক ৬ থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বেড ভাড়ার পাশাপাশি নার্স, ওয়ার্ডবয়, চিকিৎসক সেবা মিলিয়ে আলাদা ২৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়। মধ্যমানের (পপুলার, ল্যাবএইড, আনোয়ার খান মেডিকেল) একটি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত আশঙ্কাজনক কোনো রোগী পাঁচ দিন থাকলে গড়ে বিল ২ লাখ টাকা অতিক্রম করে। আর উচ্চমানের হাসপাতাল (স্কয়ার, এভারকেয়ার, ইউনাইটেড) কোনো রোগী পাঁচ দিন থাকলে গড় চিকিৎসা খরচ ৫ লাখ টাকার বেশি হয়। এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে কেবিনে থাকলেও তাদের কখনো না কখনো আইসিইউতে নিয়ে যেতে হয়। আর শুধু কেবিনে থাকলে খরচ মোট ৫০ শতাংশ কমে যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ও করোনা গবেষক ডা. মো. সালেহ মাহমুদ তুষার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি এমন রোগীও দেখেছি যে তারা তিন দিন হাসপাতালে অবস্থান করার পর যখন মূল চিকিৎসা সেবা দেওয়া প্রয়োজন ছিল সে সময় খরচ বহন করতে না পেরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চলে এসেছে। তিনি বলেন, করোনা চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতালগুলোতে কত বিল হবে তা নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই। তবে দুঃখজনক যে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা না দিয়েও অনেক হাসপাতাল শুধু ব্যবসার জন্য রোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ একেবারে নেই তা বলা যাবে না। উচ্চমূল্যের ওষুধগুলোর ব্যয় রোগীকেই বহন করতে হয়। এন্টিবায়োটিক কিছু ওষুধ আছে (যেমন-মেরোপেনেম) যেগুলো রোগীর অবস্থা যখন সংকটাপন্ন হয়ে উঠে তখন দিতে হয়। এই ওষুধগুলোর উচ্চমূল্যের কারণে সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওষুধের পুরো ডোজ রোগীকে দিতে পারে না। আবার কিছু কিছু দামি ইনজেকশন আছে যেমন রক্ত পাতলা করার একটি ইনজেকশন (এনোক্সাপিরিন) এটি সবসময় সরকারি হাসপাতালগুলো রোগীদের দিতে পারছে না। এর এক-একটি ইনজেকশনের দাম ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। যা রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে দৈনিক একটি বা দুটি দিতে হয়। আর মেরোপেনেম-এর একটি ওষুধের দাম ১৩০০ টাকা। যা এটি রোগীকে প্রতিদিন তিনটি করে দিতে হয়। রেমডেসিভির নামের আরেকটি আন্টিভাইরাল ওষুধ একটি রোগীকে সাধারণত ছয়বার দিতে হয়। এর প্রতিটি ইনজেকশনের দাম সাড়ে ৪ হাজার টাকা।