শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ জুলাই, ২০২১ ২৩:৪৮

বাড়তি দামে চামড়ার বাজারে স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাড়তি দামে চামড়ার বাজারে স্বস্তি
Google News

দীর্ঘ তিন বছর পর সরকার এবার কোরবানির পশুর চামড়ার বাড়তি দাম নির্ধারণ করে দেওয়ায় চামড়ার বাজারে স্বস্তি ফিরে এসেছে। চামড়া নিয়ে এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা খুব বেশি সুবিধা করতে পরেনি। অন্য বছরের মতো এবার কাঁচা চামড়াও তেমন নষ্ট হয়নি। চামড়া লবণজাত করছে আড়তগুলো। ট্যানারি মালিকরা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, স্থানীয়ভাবে যেন চামড়া লবণ দিয়ে কিছুদিন রেখে দেওয়া হয়। তারা পরে সেগুলো সংরক্ষণ করবেন। অন্যদিকে করোনা সংক্রমণের কারণে সীমান্ত বন্ধ থাকায় এবার ভারতে চামড়া পাচারের বিষয়টিও ছিল অনুপস্থিত। সব মিলিয়ে এ বছর চামড়া নিয়ে সামগ্রিকভাবে সুখবর রয়েছে। অন্যদিকে পাড়ায়-মহল্লায় কম দামে চামড়া বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ট্যানারি মালিকরা বলেছেন, তারা সরকার নির্ধারিত বাড়তি দামেই চামড়া কিনছেন। অন্যান্য বছরের মতো এবার চামড়া নিয়ে তেমন অরাজকতা নেই। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কম দাম হাঁকায় বিপর্যয়ের শঙ্কা থেকে অনেকে চামড়া মসজিদ-মাদরাসায় দান করে দিয়েছেন। সেখানে এসব কাঁচা চামড়ায় লবণ মিশিয়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, এবার চামড়া নিয়ে তেমন সংকট হয়নি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে ১০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। তবে এবার কেউ দাম না পেয়ে ফেলে দেননি। আড়তগুলোতে আসা চামড়া এখন লবণজাত করা হচ্ছে। এসব চামড়া সপ্তাহ দেড়েক পর যাবে ট্যানারিতে। এদিকে সুযোগ বুঝে লবণের কৃত্রিম সংকটে দাম বাড়তি। ৭০০ টাকার বস্তা ঠেকেছে হাজার টাকায়। মোহাম্মদপুরের চামড়া সংগ্রহকারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বজলুল হক বলেন আলহামদুলিল্লাহ, গতবারের চেয়ে এবার কাঁচা চামড়ার বাজার অনেক ভালো। তিনি বলেন, প্রচুর পশু কোরবানি হয়েছে। যতটা ভয় পেয়েছিলাম এবার হয়তো ঢাকায় আশানুরূপ পশু আসবে না, বেশি মানুষ কোরবানি দেবে না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বরাবরের মতোই কোরবানি হয়েছে। আগের চেয়ে দাম একটু বেশি। তবে এলাকাভেদে দাম ওঠানামা করেছে। মোহাম্মপুরের বাসিন্দা রিজওয়ানুল হক ও ব্যবসায়ী এমদাদ খান জানান, তারা দুজনেই কোরবানির পশুর চামড়া এতিমখানায় দান করেছেন। চামড়ার দাম আগের বছরের তুলনায় এবার একটু বেশি বলে জানান তারা দুজনই। গত তিন চার বছর ধরে বিপর্যয় থেকে কাঁচা চামড়ার বাজারকে রক্ষা করার সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল এবার। ঢাকা মহানগরীর মধ্যে এবার প্রতি বর্গফুট চামড়ার মূল্য ২ টাকা বাড়িয়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে ২ টাকা বাড়িয়ে ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা করা হয়েছে। কোরবানি ঈদের এক সপ্তাহ আগে চামড়ার দাম ঠিক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত তিন বছর কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এক অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, এবার তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সরকার চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ৫ টাকা করে বাড়ানোর ফলে বাজারে কাঁচা চামড়ার দাম কিছুটা বেড়েছে।

অবশ্য কিছু সাধারণ ও মৌসুমি ব্যবসায়ী লোকসানের মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ করলেও আড়তদারদের মতে চামড়ার দাম তেমন কমেনি। সায়েন্স ল্যাবের এক মৌসুমি ব্যবসায়ী জানান, পশু জবাই হওয়ার চার ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ লাগানোর কথা। কিন্তু ৮ ঘণ্টা পরও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ায় লবণ লাগায়নি। লবণ না লাগিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার ওপর স্তূপ করে রেখেছে। এ কারণে এবারও চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে। তিনি বলেন, এবার প্রায় ১ কোটি পিস চামড়া পাওয়া যাবে। এর মধ্যে ২-১ হাজার পিস চামড়া নষ্ট হতে পারে। এটা তেমন কেনো বড় সংখ্যা না। বেশি রোদ থাকলে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যেত। তবে গতবারের চেয়ে এবার কাঁচা চামড়ার বাজার ভালো। সাভার প্রতিনিধি জানান, ঈদের তৃতীয় দিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করেছে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে। শিল্প নগরীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন শ্রমিকরা। গতকাল দুপুরে সাভারের হরিনধরা চামড়া শিল্প নগরীর বিভিন্ন ট্যানারি ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়ে। দেখা যায়, ঢাকা এবং আশপাশের এলাকা থেকে একের পর এক ট্রাকযোগে কাঁচা চামড়া বিভিন্ন ট্যানারিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। চামড়াগুলো ট্রাক থেকে নামানোর পর শ্রমিকরা সেগুলোতে লবণ মেখে গুদামে স্তূপ করে রেখে দিচ্ছেন। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হক জানান, ঈদের দিন বিভিন্ন মাদরাসা এবং মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে চামড়া কিনেছেন তিনি। চামড়াগুলো যাতে নষ্ট না হয় এবং ভালো দামের আশায় বুধবার সন্ধ্যায় সেগুলো ট্যানারিতে নিয়ে আসেন। মুক্তা ট্যানারির এমডি এস এম শহিদুল্ল্যাহ বলেন, আমরা সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনছি। কাল থেকে চামড়া কিনে লবণ মেখে সংরক্ষণ করা শুরু করেছি। এবার আমাদের চামড়ার কোনো ঘাটতি থাকবে না। বিসিক শিল্পনগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১২৫টি ট্যানারিতে চামড়া আসা শুরু করেছে। এবার ৮০ লাখ গবাদিপশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় দেড় কোটি গবাদিপশুর চামড়া ক্রয় করা হয়। যার ৮০ ভাগ চামড়াই সংগ্রহ হয় কোরবানির ঈদকে ঘিরে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখওয়াত উল্লাহ বলেন, ঈদের দিন সন্ধ্যা থেকেই ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়া আসা শুরু হয়েছে। গত বছরের মতো এবারও ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সরকারের নির্ধারিত দামের মধ্যেই তারা চামড়া সংগ্রহ করেছেন বলে জানান।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, আমাদের কাছে যারা আসছেন সবাই ন্যায্য দাম পাচ্ছেন। এখানে দাম কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মহল্লায় দাম না পাওয়ায় অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, মহল্লা থেকে যারা চামড়া সংগ্রহ করেন তারা সময়ের ব্যবসায়ী অথবা মহল্লার ছেলে। তারা কম দামে চামড়া কিনছেন এমন তথ্য আমরা পাচ্ছি। তবে আমাদের এখানে দাম কম দেওয়া হচ্ছে না। যারা চামড়া নিয়ে আসছেন আমরা তাদের ন্যায্য দাম দিয়ে দিচ্ছি। গতবারের তুলনায় এবার চামড়ার দাম বেশি দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, চামড়ার গুণগত মান ঠিক থাকলে আমাদের এখানে যত চামড়া আসুক আমরা সংগ্রহ করব এবং ন্যায্য দাম দেব।

চট্টগ্রাম : বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়ার আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মোসলিম উদ্দিন বলেন, এবার সাড়ে ৩ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও দেড় লাখের মতো চামড়া এসেছে চট্টগ্রামের আড়তে। বাকি চামড়াগুলো চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় লবণ নিয়ে মজুদ করেছেন বেপারিরা। কয়েক দিনের মধ্যে এ চামড়াগুলো চট্টগ্রামের আড়ত কিংবা ঢাকার আড়তে যাবে। তিনি বলেন, এ বছর শঙ্কা ছিল লকডাউন এবং গরম আবহাওয়ার কারণে চামড়া নষ্ট হবে। কিন্তু বেপারিরা চামড়া সংগ্রহ করার সঙ্গে সঙ্গে লবণ দেওয়ায় তা নষ্ট হয়নি।

রংপুর : রংপুরে চামড়া কিনতে আসেননি ট্যানারি মালিকরা। ফলে প্রায় ৩০ হাজার পিস গরু ও খাসির চামড়ায় লবণ মাখিয়ে রেখে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দাম বৃদ্ধি পেলে ওইসব চামড়া বাজারে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা।

দিনাজপুর : দিনাজপুরে গত বছর যে গরুর চামড়া ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এ বছর তা ৬০০ টাকা পর্যন্ত হয়। কিন্তু ছাগলের চামড়া কিনতে অনীহা পাইকারি ব্যবসায়ীদের। এ অবস্থা দেখে স্থানীয় অনেক মাদরাসায় ছাগলের চামড়া লবণ দিয়ে রাখা হচ্ছে, যদি পরে দাম পাওয়া যায় সেই আশায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় পশুর চামড়া যাতে কোনোভাবেই পাচার না হয় সে বিষয়ে সব কটি থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জয়পুরহাট : নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেক ফড়িয়া জানান, সীমান্তে কড়াকড়ি না থাকলে তারা ওপারে চামড়া পাঠিয়ে কিছু লাভের মুখ দেখতেন। এবার সেটিও হচ্ছে না। অন্যদিকে চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে বিজিবির টহল বাড়ানো হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর