Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ২২:০০

বাংলায় মোদি-মমতার 'কুর্তা' রাজনীতি!

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

বাংলায় মোদি-মমতার 'কুর্তা' রাজনীতি!

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে লোকসভার ভোট মধ্যগগনে। এর মধ্যে মমতা-মোদির ‘কুর্তা ও মিষ্টি’ সৌজন্যকে কেন্দ্র শুরু হয়ে গেল নতুন রাজনীতি। বুধবারই বলিউড সুপারস্টার অক্ষয় কুমারের সাথে একটি বিশেষ সাক্ষাতকারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলে ফেলেছিলেন বিরোধী দলের একাধিক নেতার সাথে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এ প্রসঙ্গেই মোদি বলেন, ‘প্রতিবছরই মমতা দিদি আমাকে কুর্তা ও মিষ্টি পাঠান।’ ব্যাস! একদিন পর বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীকে পাল্টা নিশানা করে দিদি বললেন, রাজনৈতিক মাইলেজ পাওয়ার জন্যই মোদিজি কুর্তা ও মিষ্টি সৌজন্যতাকে ব্যবহার করছেন।   

বুধবার দিল্লিতে নিজের বাসভবনে অরাজনৈতিক ওই সাক্ষাৎকারে মোদি খোশগল্প করেন অক্ষয়ের সাথে। তিনি বলেন, ‘লোকে শুনলে অবাক হয়ে যাবেন। ভোটের সময় এই কথা বলতে হয়তো নির্বাচনে আমার ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু তবুও বলছি যে, প্রতি বছর মমতা দিদি নিজে পছন্দ করে আমার জন্য দুই-একটা কুর্তা (পাঞ্জাবি) উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন।’  মোদি আরও বলেছিলেন, ‘প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি পাঠাতেন। আর মমতা দিদি সেই খবর জানার পর তিনিও আমাকে মিষ্টি পাঠাতে শুরু করেন।’ শুধু মমতাই নয়, বিরোধী দলের একাধিক নেতা-নেত্রীদের সাথে তার সুসম্পর্কের কথা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। 

মোদির মুখ থেকে মমতার সাথে সম্পর্কের এই দিক প্রকাশ্যে আসতেই ফের তৃণমূল-বিজেপির আঁতাতের অভিযোগ তোলে বিরোধীরা। সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী এখানে খুব চেঁচামেচি করছেন কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জেনেই হোক আর না জেনেই হোক-হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন যে উনি (মমতা) জামা-কুর্তা পাঠান। আর ওখান থেকে শেখ হাসিনা যেহেতু মিষ্টি পাঠাতেন, তাই সেটা জানার পর উনি (মমতা) মিষ্টিও পাঠাতে লাগলেন। আমরা জানি, গুজরাট দাঙ্গার পর মমতা ওনাকে (মোদি) ফুল পাঠিয়েছিলেন। এদের চরিত্র আমরা আগে থেকেই জানি।’ 

আর  ২৪ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সিউড়িতে এক নির্বাচনী জনসভা থেকে মোদিকে তোপ দেগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জি বলেন, সৌজন্যতা নিয়ে রাজনীতি করা ঠিক নয়। কুর্তা প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘মোদি বাবু একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমি তাকে নাকি কুর্তা পাঠাই। আরে পাঠালে দোষটা কোথায়?  দুর্গাপূজায় তো আমরা সকলকেই কিছু না কিছু পাঠাই। আমার বিশ্ববাংলা দোকান আছে। বিশ্ববাংলা আমার বাংলার ব্র্যান্ড, সেখানে আমার তাঁতিরা কাজ করে। বর্ধমান, হুগলী, মুর্শিদাবাদ, বীরভূমের তাঁতিরা আমায় তৈরি করে দেয়। সেই জিনিস থেকে কেবল নরেন্দ্র মোদিই নয়, আমি অনেককেই পাঠাই-যারা বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আছে। তবে হ্যাঁ, ওরা বলে দেয়, আমরা বলি না। তার কারণ আমাদের এটা সংস্কৃতি নয়। আমরা পহেলা বৈশাখে লোককে মিষ্টি পাঠাই। আমরা দুর্গাপূজায় লোককে উপহার পাঠাই। আমার এখানে যখন আম হয়, তখন তা সবার কাছে পাঠাই।’ 

রাজনীতির স্বার্থে তার সৌজন্যতাবোধকে নিয়ে মার্কেটিং করা হচ্ছে বলেও মোদিকে তোপ দাগেন মমতা। তিনি বলেন, ‘উনি (মোদি) তো নিজের নামটা বলেছেন। আর আমি আপনাদের এক শতাধিক নাম বলতে পারি। কই আমরা তো কখনও একথা বলি না। তার কারণ এটা হচ্ছে সৌজন্যবোধ এবং সৌজন্যবোধ ও রাজনীতি দুটো পৃথক জিনিস। আমি তো সবার জন্মদিনে চিঠি পাঠাই। আপনার জন্মদিনেও পাঠাই। আমরা তো কারও মৃত্যু কামনা করি না। সবার শুভ কামনা করি। সুতরাং এইভাবে রাজনীতি করা...সৌজন্যবোধকেও বাজারে মার্কেটিং করা...ইমেজ বিল্ড আপ করছে। এতে ইমেজ বিল্ড আপ হয় না।’

মমতার দাবি, ‘আমার তবে কত ভদ্রতা করি বলুন, কিন্তু আপনি তো রোজই এসে আমাকে চমকান। সিবিআই-কে দিয়ে চমকান। রোজই আমাকে গুন্ডা বলেন। আমি যদি গুন্ডা হই, তবে নরেন্দ্র মোদি আপনি কি? আমার হাত দিয়ে কখনও দাঙ্গা হয়নি, আমি দাঙ্গায় লোক মারি না। আমি রক্তের রাজনীতি করি না। কিন্তু আপনার কি ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গার কথা মনে পড়ে?’ 

তবে ‘কুর্তা বা মিষ্টি’ পাঠানোর বিষয়টি সুচতুরতার সাথে প্রকাশ্যে নিয়ে আসার পিছনে রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলার মুসলিম ভোটারদের কাছে মমতার ভাবমূর্তিকে ক্ষুন্ন করারও একটা সুক্ষ প্রচেষ্টা করা হচ্ছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। মোদি খুব সরল ও স্বাভাবিক ভাবেই বলেছেন যে, তিনি প্রতি বছর কুর্তা ও মিষ্টি পেয়ে থাকেন, এর মধ্যে মমতার সাথে তার যে একটা সুদৃঢ় সম্পর্ক আছে তারও ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তথাপি বিভিন্ন সভা বা র‌্যালিতে মোদি-বিরোধী মন্তব্য করে মমতা তার চারপাশের মানুষদের সঙ্গবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেন। 

তবে এটা ঠিক যে কেবলমাত্র মোদিই নন, দিল্লিসহ অন্য অঞ্চলের শীর্ষস্তরের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত উপহার দিয়ে থাকেন মমতা। মিষ্টি ছাড়াও রয়েছে রাজ্যের প্রসিদ্ধ পোশাকজাত দ্রব্য, প্যাকেটজাত আম। যদিও ভারতে আম-রাজনীতি শুরু হয়েছিল মালদহের বাসিন্দা সিনিয়র কংগ্রেস নেতা ও সাবেক রেলমন্ত্রী প্রয়াত এ.বে.এ. গণি খান চৌধুরীর হাত ধরে। তিনিই প্রথম বাক্স বন্দি করে সুস্বাদু ‘কোহিতুর’ আম পাঠাতেন রাজীব গান্ধী, জ্যোতি বসুদের।

বিডি-প্রতিদিন/২৫ এপ্রিল, ২০১৯/মাহবুব

 


আপনার মন্তব্য