Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২৩ জুন, ২০১৯ ০৯:৪৫
আপডেট : ২৩ জুন, ২০১৯ ১০:০০

আওয়ামী লীগের ৭০ বছরের সফলতা ও ব্যর্থতা

সোহেল সানি

আওয়ামী লীগের ৭০ বছরের সফলতা ও ব্যর্থতা

ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ কেবল মুসলমানের নয়, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র মানবের।.... মানবতার চূড়ান্ত মুক্তিসংগ্রাম যাতে বিলম্বিত না হয়, সেজন্য জনতাকে তাহাদের সমস্ত ব্যক্তিগত এব্ং দলগত বিভেদ বিসর্জন দিয়া এক কাতারে সমবেত হইতেই মুসলিম লীগ কর্মীসম্মেলন আবেদন জানাইতেছে।

১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুনের ঢাকার স্বামীবাগের বিখ্যাত রোজগার্ডেনে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে একটি দল গঠনের ঘোষণা দেয়া হলে তার প্রতি উপস্থিত প্রায় সবাই সমর্থন ব্যক্ত করেন।

এর আগে টাঙ্গাইল দক্ষিণ আসনের উপনির্বাচনে বিজয়ী আইন পরিষদ সদস্য শামসুল হক "মূল দাবি" নামে একটি প্রস্তাবে উপরোক্ত কথা বলেন।

অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী ও নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের পদচ্যুত সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকনির্দেশিত পথে ভারত বিভাগপূর্ব আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি (পদচ্যুত) মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে এ কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মী সম্মেলনটি শুরু হয় মওলানা রাগীব আহসানের কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের বাণী তেলওয়াতের মধ্য দিয়ে। দল গঠনের অন্যতম কাণ্ডারী শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে থেকেই এর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

প্রসঙ্গত, ১৯৪৯ সালের ৯ জুন পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অস্থায়ী আহবায়ক দবিরুল ইসলাম (১৯৫৩ তে সভাপতি) হেবাস কপার্স মামলা পরিচালনার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় আসেন। একান্ত অনুগামী শওকত আলীর পরামর্শে ক্যাপ্টেন শাহজাহানের "নূরজাহান বিল্ডিং" এ ওঠেন। এ সময় পুরান ঢাকার ১৫০ মোগলটুলীর মুসলিম লীগের নবীন কর্মীরা ক্ষমতাসীন দলের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলেন। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন সোহরাওয়ার্দী। মওলানা ভাসানী আসামের ধুবড়ী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আগেই ঢাকা এসে আলী আমজাদ খানের বাসায় উঠেছিলেন।

কর্মী সম্মেলন করার জন্য একটি বৈঠকে বসেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাখাওয়াত হোসেন, কুষ্টিয়ার শামসুদ্দীন আহমেদ, ঢাকার শওকত আলী, আলী আমজাদ খান, খন্দকার আব্দুল হামিদ ও ইয়ার মোহাম্মদ খান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রস্তুতি কমিটি গঠন নিয়ে শুরুতেই বিরোধ দেখা দেয়। আলী আমজাদ খান আহবায়ক ও ইয়ার মোহাম্মদ খান সম্পাদক করা হলে শওকত আলী ও খন্দকার আব্দুল হামিদ কমিটির বিরোধিতা করেন। পরে মওলানা ভাসানীকে আহবায়ক ও ইয়ার মোহাম্মদ খানকে সম্পাদক করে প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের রহমতগঞ্জ ইনস্টিটিউট ও পাইকপাড়ায় দু'দফা মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন উদ্যোক্তারা। এসব খবর শুনে ঢাকা মিউনিসিপাল করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান কাজী বশীর হুমায়ুন তার বিখ্যাত রোজগার্ডেনে সম্মেলন অনুষ্ঠানের স্থান নির্ধারণ করে দেন। সরকারি বাধা নিষেধের আড়ালে সম্মেলনের দু'দিন আগেই গায়ে কম্বল জড়িয়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে মওলানা ভাসানীকে রোজগার্ডেনে পৌঁছে দেন শওকত আলী। ২৩ জুন বিকাল তিনটায় একেক করে লোকজন আসতে শুরু করে। তিন শত কর্মীর ওই সম্মেলন চলে গভীর রাত পর্যন্ত। অবিভক্ত বাংলার এককালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে নতুন দল গঠনকে স্বাগত জানিয়ে কয়েক মিনিট বক্তৃতা করে চলে যান।

পার্টির সঙ্গে কেন্দ্রে আওয়ামী মুসলিম লীগ সরকার গঠন করে। সোহরাওয়ার্দী অল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। পূর্ব-পাকিস্তানেও আওয়ামী লীগ আতাউর রহমান খানের মুখ্যমন্ত্রীত্বে সরকার গঠন করে। এ সময় আওয়ামী লীগে ভাঙ্গন দেখা দেয়। আব্দুস সালাম খানের নেতৃত্বে ২৫ জন আইন পরিষদ সদস্য পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর শেরেবাংলার যুক্তফ্রন্টকে বাঁচিয়ে রাখেন আওয়ামী মুসলিম লীগের নামে একটি উপদল সৃষ্টি করে।

কৃষক শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকারকে মুখ্যমন্ত্রী মেনে নিয়ে আব্দুস সালাম খান, হাশিমুদ্দীন আহমেদ মন্ত্রী হন। খন্দকার মোশতাক আহমেদ চিফ হুইপ ও খালেক নেওয়াজ খান পার্লামেন্টের সচিব বনে যান। খালেক নেওয়াজ পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৪ নির্বাচনে পূর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনের জামানত বাজেয়াপ্ত করে সারা পাকিস্তানের চমকে পরিণত হয়েছিলেন। যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গনের পরিণতি ভয়াবহ ফল বয়ে আনে। পার্লামেন্ট কক্ষে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী হামলার মুখে প্রাণ হারান।

কেন্দ্রে ও প্রদেশে ষড়যন্ত্রের মুখে আওয়ামী লীগের দেড় বছরের শাসনামলের অবসান ঘটান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইস্কান্দর মীর্জা ও সামরিক জান্তা জেনারেল আইয়ুব খান। সামরিক আইন জারি করে।

"মুসলিম শব্দ পরিহার"

১৯৫৫ সালে ২১-২৩ সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় কাউন্সিলে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর "মুসলিম" শব্দ পরিহার সম্পর্কিত প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান।

এ সময় পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী "মুসলিম" শব্দ পরিহারের প্রস্তাবটি সমর্থন করলে কাউন্সিলরা স্বাগত জানান। এভাবেই দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি লুপ্ত হয়ে যায়।

চলবে......

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য