শিরোনাম
সোমবার, ২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০ টা

মহেশচন্দ্রপুরের মাঠ জুড়ে করলার 'তিতা হাসি'

নাসিম উদ্দীন নাসিম:

মহেশচন্দ্রপুরের মাঠ জুড়ে করলার 'তিতা হাসি'

করলার আবাদের জন্য বিখ্যাত নাটোরের মহেশচন্দ্রপুর গ্রাম। সিংড়া পৌর শহরের সীমানাবর্তী কলম ইউনিয়নের এ গ্রামের মাঠ জুড়ে এখন শুধু করলার 'তিতা হাসি'। কয়েক দশক ধরে করলার আবাদ ও বাম্পার ফলনের কারণে 'করলার গ্রাম' হিসেবে চারদিকে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামটির।

কাক ডাকা ভোর থেকে ক্ষেতের করলা তোলার উৎসব শুরু হয়ে যায়। করলা তোলার পর কৃষকরা ডালি বোঝাই করে কেউবা কাঁধে, কেউবা মাথায় আবার কেউবা অটোভ্যান যোগে স্থানীয় মহেশচন্দ্রপুর বাজারে (পৌরসভার সীমানা শেষে) এসে হাজির হন। আর এখানে সপ্তাহে সাতদিনই বসে করলার বিশাল হাট। বিভিন্ন জায়গার পাইকারী ব্যবসায়ীরা এখানে এসে করলা পাইকারী কিনে নিয়ে যান। প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মণ করলা এখান থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকায় মাঝে মধ্যেই বিপাকে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের। উপজেলা কৃষি অফিসারের পরামর্শ অনুযায়ী এ গ্রামের কৃষকরা করলার আবাদের পাশাপাশি একই জমির মধ্যে পটল, কুমড়া, ঢেড়শ, বরবটি, বেগুন, মরিচ, লাউ আবাদ করে আসছেন। করলার পাশাপাশি এগুলোর আবাদ অত্যন্ত লাভজনক বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

উপজেলা কৃষি অধিদফতরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এ বছর সিংড়া উপজেলায় ২২০ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে  মহেশচন্দ্রপুর গ্রামেই একশ' হেক্টরের বেশি জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদিত করলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৭০মেট্রিক টন। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শনিবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, মহেশচন্দ্রপুর বাজারে কৃষকরা অটোভ্যানের উপর করলার ডালি নিয়ে পাইকারী ব্যবসায়ীদের সাথে দর দাম ঠিক করছেন। এসময় মহেশচন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক জনাব আলী মৃধা জানান, এ গ্রামের প্রায় শতভাগ মানুষ সবজি চাষ করেন। এরমধ্যে করলার আবাদ করেন শতকরা ৯৮জন। তিনি আরও জানান, বীজ কেনা,  পরিচর্যা ও কীটনাশকসহ এক বিঘা জমিতে করলা আবাদ করতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এখানে বেশির ভাগ সাইট্যা জাতের করলার আবাদ হয়। এই জাতের বীজ রংপুর থেকে আনা হয়। এক সপ্তাহ পর পর জমিতে ছত্রাকনাশক দিতে হয়। ভালো মানের করলা হলে এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়া গেলে ৬০ থেকে ৮০হাজার টাকার করলা বিক্রি করা সম্ভব এক বিঘা থেকে। কিন্তু এখানে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে করলা বিক্রি করতে হয়। তাই মাঝে মধ্যেই আমাদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে।
 
গ্রামের পাইকারী ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি একজন স্থানীয় পাইকারী ব্যবসায়ী। তাছাড়া বংশ পরম্পরায় তিনি করলার আবাদ করেন। এ গ্রামের মাঠে প্রতিবছর ভালো মানের করলার আবাদ হয়। এখানকার কৃষকদের বাজার ব্যবস্থাপনা বলতে একমাত্র স্থানীয় মহেশচন্দ্রপুর বাজার। সকাল থেকে শুরু করে সারাদিন এখানেই চলে বেচা-কেনা। প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমে জমি থেকে করলা কম উত্তোলন হয়। তবে মাসের শেষে ও মার্চ মাসের শুরুতে পুরোদমে চলে করলা উত্তোলন। এসময় আমদানি অনেক বেশি হয়।
স্থানীয় কৃষক মোকছেদ আলী ও আ. সোবহান জানান, প্রতি এক সপ্তাহ পরপর এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ২০মন করলা উত্তোলন করা যায়। করলার আমদানি বেশি হওয়ার কারনে দাম তুলনামূলক কম। তবে মৌসুমের শুরুতে করলা প্রতি কেজি ৬৫-৮০টাকা দরে বিক্রি করায় আবাদের খরচ উঠে গেছে। এখন যা বিক্রি করা হবে তাই লাভ। উপজেলা কৃষি অফিসের দেয়া পরামর্শে একই জমিতে করলার পাশাপাশি পটল, কুমড়া, ঢেড়শ, বরবটি, বেগুন, মরিচ, লাউ আবাদ করা হচ্ছে। তাছাড়া এখানে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত করলা উৎপাদন শুরু হয়েছে।

বগুড়া থেকে আগত মহাস্থান গড়ের পাইকারী ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম ও নাটোর থেকে আগত বড়াইগ্রামের পাইকারী ব্যবসায়ী আলম হোসেন  জানান, এখানে করলার আমদানি ভালো। তাছাড়া ভালো মানের করলা পাওয়া যায়। আমরা এখান থেকে করলা কিনে মিনি ট্রাক/বড় ট্রাক যোগে রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, আহমেদপুর,দয়ারামপুর, রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও সাভারের অন্য পাইকারদের কাছে গিয়ে বিক্রি করি। এতে করে কেজি প্রতি ৪টাকা বাড়তি খরচ হয়।
 
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর উপজেলায় তুলনামূলক বেশি করলার চাষ হয়েছে। বিগত বছরের মত এবারও উৎপাদিত করলার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিষমুক্ত করলা উৎপাদনের জন্য 'সেক্স ফেরমন' ফাঁদ সম্পর্কে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে করলা আবাদে কৃষকরা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই পদ্ধতিতে সবজি আবাদ করলে খরচ অনেকটা কম হবে।

বিডি-প্রতিদিন/২১ মার্চ ২০১৬/ এস আহমেদ

সর্বশেষ খবর