শিরোনাম
প্রকাশ : ৬ মার্চ, ২০১৯ ১৮:৩৪
আপডেট : ৬ মার্চ, ২০১৯ ১৮:৪১

উচ্চশিক্ষার পথে 'ধনবাড়ী শিক্ষার্থী সংসদ, ঢাকা'র শিক্ষা বিপ্লব

শামীম আল মাহমুদ (শিমুল)

উচ্চশিক্ষার পথে 'ধনবাড়ী শিক্ষার্থী সংসদ, ঢাকা'র শিক্ষা বিপ্লব

চৈনিক প্রবাদ অনুযায়ী ‘বর্ষব্যাপী পরিকল্পনা করলে ধান রোপণ করুন, যুগব্যাপী পরিকল্পনায় গাছ লাগান, আর জীবনব্যাপী পরিকল্পনাকে সফল করতে মানুষকে শিক্ষিত করুন’। গাছ লাগানোর মতই উচ্চশিক্ষিত হওয়ার উচ্ছ্বাসাকে উসকে দিয়ে মহৎ কাজ করে যাচ্ছে ‘ধনবাড়ী শিক্ষার্থী সংসদ, ঢাকা’র সদস্যবৃন্দ।

‘ঢাকার বুকে এক টুকরো ধনবাড়ী’ স্লোগানকে সামনে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর থেকে জন্ম নেওয়া এ সংগঠনের সদস্যবৃন্দ নিজেদের অর্জিত শিক্ষার ফসলকে নিজ উপজেলা, টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ীতে বপন করে প্রতি বছর। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় বর্তমান সভাপতি মো. শাহীদুল ইসলাম শাহীন এবং সাধারণ সম্পাদক আল আমিনের নেতৃত্বে এক ঝাঁক তাজা প্রাণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ইতিবাচক উদ্বুদ্ধকরণের এ মহাযজ্ঞে।

৪ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানটির সূচনা হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রত্যন্ত এলাকার অবহেলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলদীআটা ফাজিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে। সেখানে আরও জমা হয় নিকটস্থ বীরতারা ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা, জামতলী জহুরা রোস্তম আদর্শ দাখিল মাদ্রাসা, বানিয়াজান দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং বিএসবি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। বলদীআটা ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আফজাল হোসাইন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দের উপস্থিতিতে এখানে প্রথমে শিক্ষার্থীদের বয়স ও অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার অনুরূপ একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর চলে উচ্চশিক্ষায় পদার্পণের পাথেয় স্বরূপ সেমিনার। সেমিনারের পর পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার প্রাপ্তদের মধ্যে পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হয় জ্ঞানের বাহন বই। অংশগ্রহণকারী সকলকে উপহার দেওয়া হয় সংগঠনের এ বছরের ক্যালেন্ডার। এছাড়াও সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঘড়ি প্রদান করা হয়। একই দিন বিকেলে আমিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণ করে গোবিন্দচরণ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও গোবিন্দপুর আলিম মাদ্রাসার ৯ম ও দশম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ। অর্ধদিবস ব্যাপী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আমিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মাসুদুজ্জামান।

১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে পুরোদিন অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয় মুশুদ্দি রেজিয়া কলেজ, মুশুদ্দি আফাজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ও সয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে। সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা কৃষি মন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, এমপি মহোদয়ের নিজ হাতে নির্মিত জ্ঞানের বাতিঘর মুশুদ্দি রেজিয়া কলেজে অনুষ্ঠানটিতে আন্তরিকভাবে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেন কলেজটির অধ্যক্ষ কেশব চন্দ্র দাস। এছাড়াও মুশুদ্দি আফাজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ও সয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সার্বিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক যথাক্রমে সাইফুল ইসলাম ও মো. আনোয়ারুল ইসলাম।

২০ ফেব্রুয়ারি সকালে ‘উচ্চশিক্ষার পথে’ অনুষ্ঠিত হয় আসিয়া হাসান আলী মহিলা ডিগ্রি কলেজে। শুরুতে কলেজটির অধ্যক্ষ মো. আজিজুর রহমান উপস্থিত থাকলেও সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটিতে সাদর সহচর্য দেন কলেজের উপাধ্যক্ষ জনাব মো. সাইফুল ইসলাম বেলাল। একই দিন বিকেলে অনুষ্ঠানটি যুগপৎভাবে অনুষ্ঠিত হয় ধনবাড়ী নওয়াব ইনস্টিটিউশন ও সাকিনা মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। উভয় ক্ষেত্রেই উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের প্রধান শিক্ষক যথক্রমে শফিকুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত) এবং মো. মাহবুবুর রহমান খান খসরু।

২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহরে ধনবাড়ী সরকারি কলেজের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সংগঠনের সদস্যরা হাজির হন পাইস্কা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানকার প্রধান শিক্ষক মো. তোফাজ্জল তালুকদারের উপস্থিতিতে কোমলমতি ছাত্রীদের মাঝে তারা উচ্চশিক্ষার মশাল প্রজ্বলন করে তাদের এ বছরের অনুষ্ঠানমালা সমাপ্ত করেন।

মোট ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটিতেই অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাহীদুল ইসলাম শাহীন এবং উপস্থাপনা করেন সাধারণ সম্পাদক ঢাবির একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী আল আমিন।

গতবারের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত এ বছরের অনুষ্ঠানে কিছুটা বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। এ বছর মূলত প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থান পেয়েছে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে। এছাড়াও এ বছর যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সেমিনার সম্পন্ন হয়েছে তার প্রতিটিতেই ঐ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে বক্তা হিসেবে দেখা গেছে। বক্তা হিসেবে যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন তারা হলেন ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ১ম বর্ষের ইমামুল হাসান নিপুণ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ১ম বর্ষের লিমু রহমান, ঢাকা কলেজের গণিত বিভাগের ২য় বর্ষের আল আমিন, ঢাকা কলেজের ডিগ্রি ৩য় বর্ষের মো. মাইজুর রহমান, ঢাবির অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের ৩য় বর্ষের জাকিয়া ইসলাম শান্তা, ঢাবির ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শাহ আলম শুভ, ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ফেরদৌস ফাহাদ, বাকৃবির এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি বিভাগের ইন্টার্ন সেমিস্টারের কেয়া তাহমিনা, ঢাবির সংস্কৃত বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত সালমা আক্তার, ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হাওয়া খাতুন, শান্ত মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আল আমিন (লেবু), এপিক গ্রুপের আরএএমও মো. উজ্জ্বল হাসান, সিসিমপুর শিক্ষা পরিবারের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম অভয়, মহানগর শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের প্রভাষক ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা-সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মাহমুদ (শিমুল) এবং জামালপুর সদর উপজেলার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোবাখখারুল ইসলাম (মিজান)।

সংগঠনের সভাপতি মো. শাহীদুল ইসলাম শাহীন জানান, সংগঠনটির উৎপত্তি ঢাকায় হলেও নিঃস্বার্থ ও ত্যাগী স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে এর বিস্তৃতি পুরো বাংলাদেশে ছড়ানোর ইচ্ছা আছে তাদের। এছাড়াও ‘উচ্চশিক্ষার পথে’ নামক এ পরশপাথরটি নিয়ে তারা ধনবাড়ী উপজেলা ছাড়াও ক্রমান্বয়ে টাঙ্গাইল জেলা এবং ঢাকা বিভাগের প্রতিটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছে। এখন সংশ্লিষ্ট সকলের সার্বিক সহযোগিতাই শুধু পারে এরকম সর্বজনীন শিক্ষা বিপ্লবকে সফল করতে।

বিশ্বায়নের এ যুগে জ্ঞানই যেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, সেখানে বহুমুখী জ্ঞানের মোহনায় অর্জিত বিদ্যা নিজ অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে বিলানোর এ উদ্যোগটি সত্যিই বাহবার দাবিদার। তাই, উচ্চশিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির এ সাংগঠনিক স্বেচ্ছাসেবার প্রতি রইলো সশ্রদ্ধ সাধুবাদ ও সীমাহীন শুভকামনা।

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা 


আপনার মন্তব্য