Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ১ জুলাই, ২০১৯ ২০:৩৪

পোষা পাখি কী সংক্রামক ব্যাধি বহন করে?

কৌশিক সরকার কাব্য:

পোষা পাখি কী সংক্রামক ব্যাধি বহন করে?

কী? শিরোনাম পড়ে কিছুটা শঙ্কিত? তাহলে প্রথমেই বলছি, শঙ্কার কিছু নেই, শখের পাখিটিকে ঘর থেকে সহসাই বিদায় করে দিতে হচ্ছে না, এ ব্যাপারে আপাতত নিশ্চিন্ত থাকুন। তবে বিশেষজ্ঞরা একইসাথে আপনাকে সচেতনতা অবলম্বনের পরামর্শও দিচ্ছেন। 

মল ত্যাগের পরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়ার সচেতনতা যেমন ডায়রিয়া থেকে আমাদের বহুগুণে নিরাপদে রাখছে, তেমনি পাখি পালনে কিছু সচেতনতার অভাবও আপনাকে ভোগাতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু সংক্রমণে! 

তাই জানতে হবে তুচ্ছ কোন ভুল কিংবা অসাবধানতার জন্য শখ-শৌখিনতা আপনার এবং পরিবারের জন্য দিন দিন বিপদের কারণ হয়ে উঠছে কিনা! 

প্যারট ফিভার বা সিটাকোসিস (Psittacosis): Chlamydia psittaci নামক এক ব্যাকটেরিয়া, যা ৪০ শতাংশ পাখির দেহে সব সময়ই বিদ্যমান। যদিও মানবদেহ এদের পছন্দের তালিকায় একেবারে তলানিতে, তবুও সংক্রামিত হলে ফ্লু (ইনফ্লুয়েঞ্জা) জ্বর, সাথে শুকনো কাশি দেখা দেয়। নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকে এর প্রতিকারও সম্ভব, তবে সন্তানসম্ভবা (pregnant) নারীর ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে। এছাড়াও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম (immuno-compromised), বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং যাদের ফুসফুস এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য এই ব্যাকটেরিয়াল সংক্রামণ ক্ষতিকর রুপ নিতে পারে! 

প্যারট ফিভার থেকে বাঁচতে হলে যা করতে হবে, তা হল পাখির মল (poop) নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। মল শুকিয়ে তার সুক্ষ্ম গুঁড়া অন্যান্য ধুলার সাথে মিশে শ্বাসপ্রশ্বাসের (inhalation of aerosolized particles) মাধ্যমে প্রধানত মানবদেহে প্রবেশ করে এই রোগের জীবাণু। তাই নিয়মিত খাঁচার ট্রে এবং আনুষঙ্গিক স্থান এবং পাত্র পরিষ্কার রাখুন। এছাড়া পাখির টিস্যু, পালক, কামড়, লালা (পাখিকে ঠোটে সরাসরি চুমু খাওয়া) থেকেও এটি সংক্রামিত হতে পারে বলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে। টিয়া ও অন্যান্য প্যারাকিট সহ, ম্যাকাও, বাজরিগার এবং ককাটেলের মত জনপ্রিয় পাখিগুলো (এমনকি টার্কি এবং হাঁস) এ রোগের সহজ উৎস। 

অ্যালার্জি (Allergic Alveolitis): “Bird Fancier’s Lung (বার্ড ফ্যান্সিয়ার্স লাঙ)" নামেও পরিচিত, এটি ফুসফুসের একটি অ্যালার্জিক এবং অ্যাজমা জাতীয় রোগ। পাখির দেহের (চামড়া, কেরাটিন, পালকের) মৃত কোষের সমষ্টি, পাখি গা ঝাড়া দিলে (খুশকির মত) ধুলা বা পাউডারের (Dust and Dander) মত বাতাসে উড়তে দেখা যায় সেগুলোসহ খাচার জমাট ধুলা এবং পাখির গায়ে জমে থাকা সুক্ষ্ম ধুলা-মাটি নিঃশ্বাসের সাথে আমাদের দেহে প্রবেশের মাধ্যমে এই সমস্যার সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে এই মৃত কোষের ধুলা (Dust & Dander) গ্রহণের পরই এই সমস্যা টের পাওয়া যায়। ঘন ঘন হাঁচি-কাশি, গলা ব্যথা (sore throat), নাক দিয়ে পানি পড়া/নাক বন্ধ (postnasal drip), চোখ চুলকানো এবং চোখ দিয়ে পানি পড়াসহ চোখের নিচে এক প্রকার কালো দাগ (allergic shiners) দেখা যাওয়া এ ধরনের অ্যালার্জিক উপসর্গ। সমস্যা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে শ্বাসকষ্ট পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। 

এক্ষেত্রে (Dust & Dander থেকে) নিরাপদ থাকতে হলে যা করনীয় - 
১) পাখি ধরার পর, হাত ভালো করে না ধোয়া পর্যন্ত চোখ, নাক এবং মুখে হাত না দেওয়া। 
২) খাঁচা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সময় মাস্ক ব্যবহার করা। 
৩) পাখিকে পর্যাপ্ত গোসলের সুযোগ করে দেওয়া। ক্ষেত্রবিশেষে পারদর্শীতার সাথে পাখিকে নিয়মিত নিজেই গোসল করানো। এতে পাখির গায়ে মৃত কোষের (Dust & Dander) উৎপাদন কম হবে। 
৪) যারা রুমে পাখি পালেন, পর্যাপ্ত বাতাস পরিচলন সুবিধা রাখুন। যদিও এক্ষেত্রে বিশেষ এয়ার ফিল্টার (HEPA) ব্যবহারের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। 
৫) শোবার ঘরে পাখির খাঁচা রাখা থেকে বিরত থাকুন। 
৬) নিয়মিত ঘরের দেয়াল, মেঝে এবং আসবাবপত্র ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার রাখুন। কাপড়ের চেয়ে লেদার সোফায় এসব সূক্ষ্ম ধুলা পরিষ্কার করা সহজ, একই সাথে কাপড়ের পর্দার চেয়ে জানালায় ব্লাইন্ডস (Blinds) ব্যবহার অধিক সুরক্ষার। 
৭) আপনি যদি ধুলাবালিতে বেশী স্পর্শকাতর হন, তাহলে পাখির খাঁচা পরিষ্কারের দায়িত্ব অন্য কাউকে দিন। 
৮) সৌখিনতায় পাখির সংখ্যা কম রাখুন। 
৯) Hypoallergenic (যেসব পাখি অপেক্ষাকৃত কম Dust & Dander উৎপাদন করে, যেমন- Eclectus parrot, Pionus Parrots, Macaw) পাখি পালন করা। 
১০) সর্বোপরি বাড়িতে কোন শিশুর এজাতীয় অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে বা দেখা দিলে, পাখি পালন থেকে বিরত থাকুন। আপনি সৌখিন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য পাখি পালন করেন? তাহলে উপরোক্ত উপসর্গের কোনটি দেখা গেলে অবশ্যই আপনার ডাক্তারকে আপনার পাখি পালনের বিষয়টি অবহিত করবেন। 

এছাড়া কবুতর এবং চড়ুই যেহেতু মানুষের বাসাবাড়িতে অবাধ বিচরণ করে, তাই জেনে রাখা ভালো এদের শুকিয়ে যাওয়া মলে এক প্রকার ফাঙ্গাস জমে তা মানুষের রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়! যা ক্ষেত্রবিশেষে ভয়াবহ রুপ নিতে পারে। তাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন। 

আশাকরি উপরের আলোচনা থেকে মনে ভয় সঞ্চারিত না করে, পরিচ্ছন্নতায় আগ্রহী হবেন। আপনি যদি পরিষ্কার -পরিচ্ছন্নতায় উদাসীন জীবনযাপন করেন, তাহলে জেনে রাখুন, আপনার দৈনন্দিন জীবনে এর চেয়ে অনেক ভয়াবহ জীবাণু ২৪ ঘণ্টা আপনার শরীরকে আক্রমণ করতে মুখিয়ে আছে। যেমন আপনার সাধের মোবাইল ফোনটি এই মুহূর্তে প্রায় ১৭ হাজার ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বহন করছে যদি আপনি একে নিয়মমাফিক পরিষ্কার না করে থাকেন!

শখ এবং সুস্বাস্থ্যের সহাবস্থানের জন্য প্রয়োজন শুধুই সচেতনতার। তাই আসুন নিজে সচেতন থাকি এবং অন্যকে সচেতন করি। 

ভালো থাকুন আপনি এবং ভালো থাকুক আপনার শখের পাখি।

লেখক: কৌশিক সরকার কাব্য, সৌখিন পাখি পালক।

বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য