শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ মার্চ, ২০২১ ২১:৪০

প্রতিরক্ষা সাংবাদিকতা সময়ের ভাবনা

মেজর জেনারেল ড. মো. সরোয়ার হোসেন (অব.)

প্রতিরক্ষা সাংবাদিকতা সময়ের ভাবনা

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ও রিচার্ড দ্য লায়ন হার্টের মতো সমরবিদও যুদ্ধ পরিকল্পনার সময় জনমতের বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতেন। আমরা আজ একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের সব সুফল ভোগ করছি-এমন একটি সময়ে জনমত গঠনে গণমাধ্যম যে আরও বেশি গুরুত্ব লাভ করেছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এ প্রসঙ্গে অ্যালভিন ও টেইডি টফলার বলেছিলেন, সব ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিগ্রহ হবে গণমাধ্যমনির্ভর। গণমাধ্যমের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা যে কোনো ভবিষ্যৎ যুদ্ধে অবতীর্ণ সৈন্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ঐতিহাসিকভাবে গণমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক কম-বেশি আলোচিত বিষয়। এর পিছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। যে কোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে গণমাধ্যম ও সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে সব সময়ই একটা কাঠামোগত উত্তেজনা বিরাজ করে। গণমাধ্যম যে কোনো কেলেঙ্কারি ও সত্য তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর, অন্যদিকে সশস্ত্রবাহিনী শুধু তাদের ইচ্ছেমতো সংবাদ পেতে আগ্রহী। গণমাধ্যম যখন সশস্ত্রবাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী সংবাদ পরিবেশনে অস্বীকৃতি জানায়, সশস্ত্রবাহিনী এ বিষয়টি সহজে মেনে নিতে পারে না। 

রাষ্ট্র ও সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বর্তমানে কোস্টারিকা, মরিশাস ও হাইতি ছাড়া প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রেরই নিজ নিজ সশস্ত্রবাহিনী রয়েছে। এ দেশগুলোর নিয়মিত সশস্ত্রবাহিনী না থাকলেও এদের রয়েছে আধা সশস্ত্রবাহিনী। সশস্ত্রবাহিনীর ঐতিহাসিক বিবর্তন ও উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মূলত শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপরের সম্পদ ও ভূমি দখল আর বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষার এ দ্বৈত দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা থেকে জনগণের সমন্বয়ে সশস্ত্রবাহিনী সংগঠিত হয়। পৃথিবীর যে কোনো দেশেই সশস্ত্রবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সশস্ত্রবাহিনী মূলত যুদ্ধ আর রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার জন্য নিয়োজিত থাকে।

আধুনিক রাষ্ট্রে সশস্ত্রবাহিনীর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে আমাদের খুব পিছনে যেতে হবে না। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধজুড়ে আমরা আধুনিক রাষ্ট্রে সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা লক্ষ্য করেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শীতল যুদ্ধকালীন দীর্ঘ সময়ে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও সশস্ত্রবাহিনীর উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রসার থেমে ছিল না। বর্তমানে বহিঃশত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ লিপ্ত হওয়ার বদলে সশস্ত্রবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ দমন, আপদকালীন জনগণের পাশে দাঁড়ানো, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনসহ উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত রয়েছে। তথাকথিত যুদ্ধের চেয়ে বর্তমান সময়ে সশস্ত্রবাহিনীকে জনগণের স্বার্থে অনেক বেশি দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ভূমিকা পালন করতে হয়। অর্থাৎ সশস্ত্রবাহিনী কী, কেন, কীভাবে তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করেছে তার সঠিক ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনাই চূড়ান্তভাবে এর সার্থকতা নির্ধারণ করে দেয়। তাই যে কোনো বিষয়কে একটি সুনির্দিষ্ট স্বরূপ প্রদানে গণমাধ্যমের এ অন্তর্নিহিত ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক ও সমাজ বিজ্ঞানীরা গণমাধ্যমকে Fourth Estate হিসেবে গণ্য করে থাকে। ব্রিটিশ এমপি থমাস কার্লাইল সর্বপ্রথম ১৭৮৭ সালে Fourth Estate শব্দটি House of Commons-এর কার্যপ্রণালি নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের প্রাক্কালে ব্যবহার করেছিলেন।

রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ না হয়েও গণমাধ্যম রাজনৈতিক সত্তাকে প্রায়শই ঝুঁকি ও আপত্তির মুখে ফেলতে পারে। এমনকি গণমাধ্যম জনমত গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম; ইতিহাসে এমন অজস্র উদাহরণ রয়েছে। এই তো গত বছর আমরা যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশি বর্বরতায় কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের অকাল মৃত্যুতে গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকার জন্য শক্ত জনমত তৈরি হয়েছিল, যা পুলিশ বিভাগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। Fourth Estate শব্দটি ইউরোপের মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অংশ যথাক্রমে- পাদ্রি, আভিজাত্য ও সাধারণ জনগণ এর সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ব্যবস্থায় গণমাধ্যম বা প্রেস সমাজের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে রয়েছে যে, তা রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রভাবিত করতে পরোক্ষভাবে হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষত উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক দেশে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সমাজবিজ্ঞানী Max Waber-এর মতে A State is a legitimate monopoly of power over a defined territory. বেশির ভাগ গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতা আইন সভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে বিভক্ত। এ তিনটি বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় না থাকলে তা জনগণের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই Watchdog-এর প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এ তিনটি বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যম Fourth Estate হিসেবে পরিগণিত হয়। গণমাধ্যম Watchdog-এর ভূমিকা পালনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কার্যকরী রাখে। আমরা ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ও নিক্সন প্রশাসনের পতন, বোফর্স কেলেঙ্কারি, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে দুর্নীতির দায়ে ক্ষমতাচ্যুত হতে দেখেছি, যার সবই গণমাধ্যমের অসাধারণ ক্ষমতার জন্য সম্ভব হয়েছিল।

প্রেস বা গণমাধ্যম বলতে সমষ্টিগতভাবে সাংবাদিকদেরই বোঝানো হয়ে থাকে। গণমাধ্যমের অভাবনীয় ক্ষমতা দেখে গুসকার উইল্ডি বলেছিলেন, প্রেসই একমাত্র Estate যা অপর তিনটিকে ভক্ষণ করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এমতাবস্থায় গণমাধ্যম ও সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে একটা বোঝাপড়াভিত্তিক, সহযোগিতামূলক ও পেশাদারি সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে এটাও অনস্বীকার্য যে, এ দুই শ্রেণির পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ, প্রেরণা আর লক্ষ্য বিবেচনায় যে মৌলিক তফাৎ বা বৈষম্য রয়েছে সেখানেই সমস্যার মূল কারণ নিহিত। গণমাধ্যম মনে করে সবাইকে সবকিছু জানানো তাদের দায়িত্ব এবং তাদের এ দায়িত্বে অন্য কারও অংশীদারিত্ব নেই বা এ ব্যাপারে অন্য কারও কোনো অভিযোগ আর অনুযোগ থাকতে নেই। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা ভাবেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধুই তাদের। নিজ নিজ দায়িত্বের প্রতি গণমাধ্যম ও সশস্ত্রবাহিনীর এ একগুয়ে মনস্তাত্ত্বিক চেতনাই তাদের মাঝে বিরোধ তৈরি করে।

এখন পৃথিবীর সর্বত্রই অনেক বেশি খোলামেলা নীতি, সার্বিক স্বচ্ছতা ও সরাসরি যোগাযোগে বিশ্বাসী। যোগাযোগ বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ষাট দশক পর্যন্ত মোটামুটিভাবে সব গণতান্ত্রিক দেশের জনগণ সরকারের নেতৃস্থানীয়দের ওপর আস্থা রাখত; তাদের কথা বিশ্বাস করত, এমনকি পুস্তক, পত্রিকা, ম্যাগাজিন আর টেলিভিশনে যা দেখত, যা লেখা হতো তার সবকিছু সত্য বলেই মনে করত। কিন্তু যেমন সময় বদলেছে, বদলেছে তথ্যপ্রযুক্তি। বিশ্বাসের জায়গায় অবিশ্বাস আর সংশয়হীন গ্রহণযোগ্যতার স্থলে সন্দেহ জায়গা করে নিয়েছে। এখন সবাই নেতৃস্থানীয়রা কী করেছেন আর কী করেননি, তা জানতে চায়। তারা যে কোনো বিষয়ে একমত হওয়ার আগে আশা করে যেন সংশ্লিষ্ট নেতৃবর্গ তাদের সব ব্যাপারে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেন। তবে বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশে আমরা উদার গণতন্ত্র চর্যায় সমস্যা দেখছি, যেখানে গণমাধ্যমও বেশ চাপে রয়েছে। এরকম একটা পরিবর্তনের সময় গণমাধ্যম ও সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক অনেক চ্যালেঞ্জিং হবে সেটাই স্বাভাবিক। কোনো বিষয়ের ওপরে একজন সাংবাদিকের দেওয়া ধর্মীয় ব্যাখ্যা যেমন গ্রহণযোগ্যতা পায় না, একই বিবেচনায় একজন ইউনিফর্মধারী ব্যক্তির বদলে গণমাধ্যমে প্রশিক্ষিত যে কেউ সামরিক বিষয়াদির ব্যাপারে মুখপাত্রের কাজ করতে পারে না।

পেশাগত ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সশস্ত্রবাহিনী ও গণমাধ্যমের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে রক্তশপথ গ্রহণ করেন, যা অন্য কোনো পেশার ক্ষেত্রে দেখা যায় না। অবশ্য চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকরা নীতিশাস্ত্রের শপথ (Hippocratic Oath) নিয়ে থাকেন। সশস্ত্রবাহিনী শপথ গ্রহণ ছাড়াও অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট দ্বারা কঠোরভাবে পরিচালিত। ইচ্ছে করলেই সে তার পেশাগত বিষয়াদি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে না। এ ছাড়া সশস্ত্র তথ্যাদি বিভিন্ন নিরাপত্তা শ্রেণিতে বিভক্ত থাকে। রয়েছে আইসিটি অ্যাক্ট, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ও প্রস্তাবিত ব্রডকাস্ট অ্যাক্ট, যা গণমাধ্যমের কর্মকান্ড পরিচালনায় স্বাধীনতা খর্ব করেছে। যখন থেকে সাংবাদিকরা সশস্ত্রবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে যোগদান শুরু করেছে তখন থেকে এ দুইয়ের মধ্যে একটা ঘৃণা ও ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তির এ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের যুগে পুরনো দিনের রেডিওর স্থলে সংঘবদ্ধ ডিজিটাইজড নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের সাংবাদিকরা পৃথিবীর যে কোনো জায়গা থেকে দর্শকদের তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ তথ্য প্রদান করতে সক্ষম। আমরা উপসাগরীয় যুদ্ধে দেখেছি, কীভাবে এবং কত দ্রুততার সঙ্গে সংবাদ সরবরাহ করা সম্ভব। পৃথিবীর লাখ লাখ দর্শক রিয়েল টাইম সংযোগের মাধ্যমে তা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছে। প্রিসিশন গাইডেড মিসাইল বাগদাদের কেন্দ্রস্থলে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তবে এরূপ যে কোনো সংবাদই মানুষের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি যদি সার্বিক কর্মকান্ড সঠিকভাবে পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সেটা যে কোনো দেশের জন্যই ক্ষতিকর হবে। আমরা দেখেছি গণমাধ্যম কীভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের পিছনে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে।

যে কোনো যুদ্ধে যে পক্ষ তথ্য প্রচারে এগিয়ে থাকে সেই চূড়ান্তভাবে বিজয় অর্জন করে। তদুপরি আমরা সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনায় বেশ দুর্বলতা লক্ষ্য করি। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর যথাসময়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সরবরাহের সক্ষমতা অর্জন করুক-এটাই কাম্য। এ ছাড়া সময়ের চাহিদা মেটাতে এ সংস্থাটিকে আরও গতিশীল করা প্রয়োজন।

যখন সশস্ত্রবাহিনী যুদ্ধে জয়লাভ করে, এর রাজনৈতিক প্রভাব নির্ভর করে কীভাবে গণমাধ্যম এ বিষয়ে জনগণকে অবহিত করে। এ প্রসঙ্গে ১৯৭১-এর চূড়ান্ত পর্বে ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক টাঙ্গাইলে পরিচালিত ছত্রীসেনা অভিযানের গণমাধ্যম প্রতিবেদন কীভাবে যৌথবাহিনীর চূড়ান্ত বিজয়কে ত্বরান্বিত করে তা সংক্ষেপে আলোচিত হলো- বাংলাদেশের পূর্বদিক থেকে ঢাকা আগমনের জন্য স্বল্প সময় লাগলেও মেঘনা নদী অতিক্রমের কাজটি ছিল বেশ জটিল। এমতাবস্থায় উত্তর দিক থেকে আক্রমণের জন্য একটা লজিস্টিক ফরমেশনকে স্বল্প সময়ের মধ্যে আভিযানিক ফরমেশনে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। আর উত্তরাঞ্চলে মোতায়েনকৃত পাকিস্তানি বাহিনীকে আটকে রাখতে শত্রু অবস্থানের পিছনে দ্বিতীয় প্যারাসুট ব্যাটালিয়নের ৮০০ ছত্রীসেনা নামানো হয়। কালাইকুন্ডা ও দমদম বিমানবন্দর থেকে ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বিকালে পরিবহন বিমানে করে এ ছত্রীসেনারা পূর্ব-নির্ধারিত ড্রপজোনে অবতরণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টাঙ্গাইলের ছত্রীসেনা অভিযানটি ছিল এ ধরনের সবচেয়ে বড় অভিযান। অভিযান শেষে দ্বিতীয় প্যারাসুট ব্যাটালিয়ন সর্বাগ্রে ঢাকা পৌঁছে, যা পাকিস্তানি সমরনায়ক ও বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়। এ অভিযানের সময় তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পিআরও রামমোহন রাও পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছত্রীসেনা অবতরণের ছবি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। এমতাবস্থায়, প্যারা ব্রিগেড কর্তৃক ১৯৭০-এ আগ্রা ফোর্ট এলাকায় পরিচালিত অনুশীলনের ভিডিও ফুটেজ ও ছবি গণমাধ্যমের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেন। এ ছত্রীসেনা অভিযানই পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় ত্বরান্বিত করে। তখন ঢাকায় প্রায় ২৪ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য মোতায়েন থাকলেও যৌথ বাহিনীর মাত্র তিন হাজার সদস্য তাদের আত্মসমর্পণ করতে সমর্থ হয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তথাপি দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমসহ সাধারণ জনগণ এ ব্যাপারে কমই জানে। বরং মানুষের মনে ঢাকাভিত্তিক কিছু বুদ্ধিজীবী আর তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনের চিন্তা-চেতনাই যেন বেশি গুরুত্ব পায় যা সত্যিই দুঃখজনক। যে কোনো বাহিনীর যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা গণমাধ্যমের চেয়ে অন্য কারও পক্ষে ভালোভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। যখন ঢাকাভিত্তিক বুদ্ধিজীবী আর সংবাদপত্রসমূহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ঠিক তখনই পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান প্রযোজক ম. হামিদকে খাগড়াছড়ি সফরে আমন্ত্রণ জানান। ম. হামিদ খাগড়াছড়ি সফরকালে মেজর জেনারেল ইবরাহিমের সঙ্গে কথোপকথনের কোনো এক পর্যায়ে বলছিলেন, তার সফর প্রায় শেষের দিকে কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, অদ্যাবধি তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের কোনো আলামত দেখতে পাননি। সময়টা ছিল ১৯৮৮ সালের ২৪ এপ্রিল রাতের বেলা। অনেকটা কাকতালীয়ভাবে হলেও তাদের কথোপকথন শেষ না হতেই প্রচন্ড গোলাবর্ষণ শুরু হয়। রিজিয়ন সদর দফতরের অদূরবর্তী এক জায়গায় শান্তিবাহিনী ও নিয়মিত বাহিনীর মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ম. হামিদ ঘটনার পরম্পরায় হতচকিত হয়ে পড়েন। পরে ঢাকা ফেরত এসে তিনি এ বিষয়ে বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

অনেক সময় গণমাধ্যম ও সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে সম্পর্কই সুস্থ প্রেস রিপোর্টিংয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। রিপোর্টারদের সশস্ত্রবাহিনী সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হতে হয় ও হালনাগাদ তথ্যের বিষয়ে অবগত হতে হয়, নয়তো হিতেবিপরীত হতে দেরি হয় না। ১৯৯৪ সাল, একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে আমি ইরাক-কুয়েত সীমান্তবর্তী বুবিয়ান দ্বীপের বিপরীত দিকে অবস্থিত নভেম্বর-৬ পর্যবেক্ষণ চৌকিতে দায়িত্ব পালন করছিলাম। একদিন সকালে হেলিকপ্টার দিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে টহল দেওয়ার সময় ইরাকি অংশের অসামরিকীকরণ অঞ্চলে অসংখ্য  ট্যান্ট (তাঁবু) দেখতে পাই। বিষয়টি পরিস্থিতি প্রতিবেদনের মাধ্যমে উপরস্থ সদর দফতরে জানান হয়েছিল। সমস্যা বাধল যখন কুয়েতি সাংবাদিকরা ওই ট্যান্টগুলোকে ট্যাংক মনে করে সংবাদ প্রকাশ করে। বিষয়টি কুয়েতবাসীসহ সেখানকার অসামরিক পরিমন্ডলে অহেতুক উত্তেজনা তৈরি করেছিল। এভাবে অনেক সময় সামরিক শব্দভান্ডারের সঠিক ব্যবহার/অপব্যবহার অনেক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে।

স্পষ্টতই আমরা প্রতিরক্ষা সাংবাদিকতার গুরুত্ব সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারছি। আমাদের জাতীয় জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আজ সশস্ত্রবাহিনী আগের চেয়ে অনেক বেশি সম্পৃক্ত। সময় এসেছে প্রতিরক্ষা সাংবাদিকতার প্রসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। গণমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর একে অপরকে বোঝা প্রয়োজন, কীভাবে কাজ করে তা দেখা ও জানা প্রয়োজন। প্রশিক্ষিত প্রতিরক্ষা সাংবাদিক তৈরি করা সম্ভব না হলেও প্রতিটি বড় গণমাধ্যম হাউজে অন্তত একজন সশস্ত্র কর্মকান্ড নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির দক্ষতাসম্পন্ন সাংবাদিক নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন যেন সশস্ত্র কর্মকান্ড নিয়ে অযাচিত বা অনুপযুক্ত প্রতিবেদন রহিত করা যায়। সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণসূচিতে গণমাধ্যমবিষয়ক মৌলিক পাঠ সংযুক্ত করে পারস্পরিক সফর ও চিন্তাভাবনা বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হওয়া দরকার। সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্মান করা জরুরি। আবার একইভাবে গণমাধ্যমকে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে এমন প্রতিবেদন ছাপার আগে অনেক বেশি সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। সশস্ত্রবাহিনীকে চলমান আধুনিক তথ্যপ্রবাহের যুগে নিজেকে দূরে সরিয়ে না রেখে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

 লেখক : রাষ্ট্রপতির সাবেক সামরিক সচিব

   শিক্ষক ও গবেষক।


আপনার মন্তব্য