শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:৫০

গণমানুষের গণমাধ্যম চ্যালেঞ্জের মুখে

পীর হাবিবুর রহমান

গণমানুষের গণমাধ্যম চ্যালেঞ্জের মুখে

গণমানুষের গণমাধ্যম মানেই স্বাধীন মুক্ত গণমাধ্যম। তবে গণমাধ্যম কোনো বিপ্লবের জায়গা নয়। দায়িত্বশীলতার বড় প্রশ্নও জড়িত। তাই বলে কালাকানুনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ বা যে কোনো মাধ্যমে গণমাধ্যমের কণ্ঠ চেপে ধরার মাধ্যমে কখনো গণমানুষের গণমাধ্যম জাতির সামনে তুলে ধরা সম্ভব নয়। স্বাধীন মুক্ত গণমাধ্যমই কেবল তার নিশ্চয়তা দিতে পারে। গণমাধ্যম হলো সমাজের দর্পণ। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের চরিত্র সরকারের কর্মকান্ড এমনকি রাজনৈতিক সামাজিক প্রশাসনিকসহ বিদ্যমান সকল জগতের চেহারাও উন্মোচন করে। সত্যের সন্ধানে নিয়োজিত গণমাধ্যম দায়িত্বশীল হলেও সেলফ সেন্সরশিপের আওতা বাড়াতে পারে না। অবাধ তথ্য প্রবর্তনের এ যুগে আসল সংস্কৃতির উন্মুক্ত জমানায় পৃথিবীর এ প্রান্তের খবর ও প্রান্তে, ও প্রান্তের খবর এ প্রান্তে দ্রুতগতিতে চলে যায়। সেখানে সত্যকে বা সংবাদকে কখনই চাপা দিয়ে রাখা যায় না। চাপা দিতে গেলেই গণমাধ্যম নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। বিবর্ণ চেহারা ধারণ করে। পাঠক ও দর্শক প্রকৃত সত্য জানা থেকে বিভ্রান্ত হয়। আর গণমানুষের গণমাধ্যম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশে গণমানুষের গণমাধ্যম কতটা শক্তিশালী এ প্রশ্ন নিয়ে গণমাধ্যমের ব্যক্তিরা কিংবা রাজনৈতিক সামাজিক সকল মহলের নেতৃস্থানীয়রা কী ভাবছেন? না ভাবলে ভাবতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের শ্বাস-প্রশ্বাস বা অক্সিজেনের জায়গাই হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। তাই বলে আমাদের সুমহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় চেতনা, অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক আদর্শের বিপরীতে দাঁড়ানোর নাম স্বাধীন গণমাধ্যম নয়। সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেওয়া, ধর্মান্ধতার বিষ সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার নামও নয়। এমনকি কারও ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত করে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরিও নয়। সরকারবিরোধীরা সব সময় বলেন, দেশে গণমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা আজ নেই। অন্যদিকে সরকারপন্থিরা কতগুলো টেলিভিশন চ্যানেল দিলেন তার খতিয়ান তুলে ধরে গোটা গণমাধ্যমের হিসাব হাজির করেন। বলেন, গণমাধ্যম অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে। এমনকি ব্রিটেনের চেয়েও এখানে স্বাধীন গণমাধ্যম। এখন প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা টিভি সাংবাদিকতা, সেই সঙ্গে ভরা যৌবন নিয়ে এসেছে অনলাইন সাংবাদিকতা। এমনও প্রশ্ন রয়েছে, আগামী দিন আসলে কার- প্রিন্ট মিডিয়ার নাকি অনলাইন মিডিয়ার? এ দেশে পাঠকের কাছে দ্রুত খবর জানার জন্য অনলাইন জনপ্রিয় হলেও তার বিশ্বাস ও আস্থার জায়গায় প্রিন্ট মিডিয়াই রয়েছে। যদিও করোনার আঘাত প্রিন্ট মিডিয়াকে বড় ধরনের বিপর্যয়ে ফেলেছিল। সে আঘাত সবাই এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

 

গণমাধ্যম হলো সমাজের দর্পণ। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের চরিত্র সরকারের কর্মকান্ড এমনকি রাজনৈতিক সামাজিক প্রশাসনিকসহ বিদ্যমান সকল জগতের চেহারাও উন্মোচন করে। সত্যের সন্ধানে নিয়োজিত গণমাধ্যম দায়িত্বশীল হলেও সেলফ সেন্সরশিপের আওতা বাড়াতে পারে না। অবাধ তথ্য প্রবর্তনের এ যুগে আসল সংস্কৃতির উন্মুক্ত জমানায় পৃথিবীর এ প্রান্তের খবর ও প্রান্তে, ও প্রান্তের খবর এ প্রান্তে দ্রুতগতিতে চলে যায়। সেখানে সত্যকে বা সংবাদকে কখনই চাপা দিয়ে রাখা যায় না। চাপা দিতে গেলেই গণমাধ্যম নিষ্প্রাণ হয়ে যায়।
 

যাক, গণমাধ্যমের সঙ্গে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা যত শক্তিশালী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ততই অবাধ ও প্রসারিত হবে। অনেকে গণমাধ্যমের ভূমিকা যথার্থ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন, রাগও দেখান। কিন্তু তারা কখনই ভাবেন না, যে গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল অনুপস্থিত, দুর্বল সিভিল সোসাইটি সেখানে গণমাধ্যম একা অবাধ স্বাধীন ও সাহসী হয়ে উঠতে পারে না। তবু গণমানুষের গণমাধ্যম তার চরিত্র হারায়নি, অধিকার থেকে সরে যায়নি বলে এখনো সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলছে। বলার চেষ্টা করছে। বালিশ দুর্নীতি থেকে স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতের ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র তুলে আনছে। সমাজের অসংগতি কম তুলে ধরছে না। ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট, বিদেশে অর্থ পাচারের বেহিসাবি চিত্র থেকে পি কে হালদারের মতো চরিত্রগুলো উন্মোচিত করছে। তার পরও তার সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করছে না। গণমাধ্যম সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধের কাজটা করে থাকে। আমাদের সংবিধান, আইন, বিধিবিধান মত প্রকাশ বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা অনেক সময় তা ভুলে নিজেরা নিজের মতো স্বাধীনতার একটা মানদন্ড নির্ধারণ করে ফেলি। সত্যকে ব্ল্যাকআউট করা যেমন গণমাধ্যমের চরিত্র নয় তেমনি যা খুশি তা প্রকাশ করাও নয়।

আমাদের গণমাধ্যম এক ক্রান্তিকালের ভিতর দিয়ে অগ্রসর ও বিকশিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রথমত রাজনৈতিক বিভাজনের অংশীদারি গ্রহণ একটি অংশের। গণমাধ্যমকর্মীরা দলকানা থেকে আজ বড় দুই দলের আনুষ্ঠানিক কর্মীতে পরিণত হয়েছেন। এটা ভয়ংকর একটা দিক, বিশেষ করে যারা গণমাধ্যমে নেতৃত্ব দেন বা পরিচালনা করে থাকেন তারা যখন পেশাদারির জায়গা থেকে, অধিকার থেকে সরে গিয়ে দলবাজিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হন, এমনকি একপর্যায়ে রাজনৈতিক দলের কমিটির পদবি গ্রহণ করেন তখন তাদের কাছে আর কেউ পেশাদারির ফসল আশা করতে পারেন না। দলের প্রতি আনুগত্য বহাল রেখে গণমানুষের গণমাধ্যমকে কার্যত তারা চ্যালেঞ্জের মুখে নিয়ে যান। ব্যক্তিগত লাভ-লোভের হিসাব তখন তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। প্রাপ্তির চিন্তাই প্রসারিত হয়। মেধা মনন চিন্তাশক্তি আর স্বাধীন অবাধ গণমাধ্যমের সীমানায় থাকে না। গণমানুষের প্রতি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি, পেশার প্রতি দরদ হারিয়ে দলের স্বার্থকে তারা বড় করে দেখেন। তারা দুই দলের দলীয় প্রকাশনা বের করে সেখানে কাজ করলে তাদের চতুরতার ছায়া থেকে গণমাধ্যম মুক্ত হবে। এমনিতেই আমাদের রাজনৈতিক শক্তি যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে রক্ষণশীল মনোভাব ধারণ করে। আবার যখন বিরোধী দলে থাকে তখন গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য আর্তনাদ করে। এটা স্ববিরোধিতা ছাড়া কিছু নয়। গণমাধ্যমকে দলীয়করণেও তারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। একেকটি সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের ধরন দেখলে যেমন বোঝা যায় তিনি কোন দলের তেমনি কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে অনেকের প্রশ্ন বাদ দিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসার স্তুতিবাক্য তাদের দলীয় চেহারাই উন্মোচিত করে না, গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে তারা ব্যক্তিস্বার্থে কতটা অন্ধ সেই চরিত্রকে খোলাসা করে। এমন ব্যক্তিদের হাতে স্বাধীন গণমাধ্যম দূরে থাক, গণমানুষের গণমাধ্যম আশাই করা যায় না। এত এত প্রিন্ট মিডিয়া দেশে। সরকারি তথ্য পাওয়া যায় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে। কটি প্রিন্ট মিডিয়ার নাম পাঠক জানেন। অথচ সরকারি হিসাবে একেকটির প্রচারসংখ্যা দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। কোথাও হদিস মেলে না। কিন্তু সরকারি তথ্যে প্রচারসংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়! সরকারি বিজ্ঞাপন যেনতেন পাঠকের অচেনা প্রিন্ট মিডিয়াকে দেওয়া হয় দলীয়করণের ফলে। অথচ সত্যিকার গণমানুষের পাঠকপ্রিয় প্রিন্ট মিডিয়ায় এ বিজ্ঞাপন দিয়ে হৃষ্টপুষ্ট রাখা যায়। কোন কোন প্রিন্ট মিডিয়ায় ওয়েজবোর্ড দেওয়া হয়, কোন কোন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নিয়মিত বেতন হয় গণমাধ্যমকর্মীরা সে খবর ঠিকই জানেন। কিন্তু কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন না কোন প্রিন্ট মিডিয়া বা টিভি গণমানুষের মুখপত্র।

ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই উক্তি, ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে পারি’- সব সময় বলি। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সব সময় বললেও কে কতটা বিশ্বাস করেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একসময় আমরা বলতাম, ‘রাজনীতিবিদরা যা বলেন তা বিশ্বাস করেন না, যা বিশ্বাস করেন তা বলেন না।’ এ কথা এখন গণমাধ্যমের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছেন বা গণমাধ্যমে সক্রিয় আছেন তাদের অনেকের বেলায় বলা যায়।

গোটা সমাজ একটা বর্ণহীন প্রাণহীন আবহের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। এখানে রাষ্ট্রকে গণমানুষের আকাক্সক্ষার গণমাধ্যম নিশ্চিত করতে হলে সংবিধানকে আরও বেশি সমুন্নত রেখে সজাগ থাকতে হবে। তেমনি সরকার ও বিরোধী দল, রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে সামাজিক শক্তিগুলোকে ভিন্নমত ধারণে এবং যুক্তি দিয়ে খ-নে তৎপর হতে হবে। গণমানুষের গণমাধ্যম চাইলে সহনশীলতা সকল পর্যায়েই অপরিহার্য। আর গণমানুষের গণমাধ্যম ছাড়া সমাজ প্রাণময় হতে পারে না। গণমাধ্যম কখনই রাষ্ট্রের ফোর্থ স্টেট বা চতুর্থ স্তম্ভ দূরে থাক, সমাজের সামগ্রিক চিত্র তুলে আনতে পারে না। দলবাজি গণমানুষের গণমাধ্যমের জন্য অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়। দলবাজি থেকে গণমাধ্যম ব্যক্তিরা বের হয়ে আসবেন নাকি আরও বেশি ডোববেন সেটি বড় প্রশ্ন। তবে সামাজিক অবস্থা মিলে গণমানুষের গণমাধ্যম দিন দিন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা অনেক কঠিন। এ দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশাল অবদান রয়েছে। গণতন্ত্রের মুক্তির পর এখন গণমানুষের গণমাধ্যম শক্তিশালী জায়গায় থাকার কথা। অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করার কথা। প্রশ্ন, সে জায়গায় আছে কি? সে স্বাধীনতা ভোগ করছে কি?

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক  বাংলাদেশ প্রতিদিন।


আপনার মন্তব্য