শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:৫৭

নারী সাংবাদিক আনাড়ি না

শামীম আজাদ

নারী সাংবাদিক আনাড়ি না

সত্তর সালের শেষ দিকের কথা, শহীদজননী জাহানারা ইমাম তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় টিভি রিভিউ লিখতেন। তাঁর রম্য ঘরানার সে রিভিউ পড়তে গল্পের মতো লাগত। বিচিত্রার তখন দারুণ একটা অবস্থান। এর সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত চৌধুরী। সহ-সম্পাদক আমারই সহপাঠী বন্ধু ও কিশোর সাহিত্যের জনপ্রিয় নাম শাহরিয়ার কবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন সাংবাদিকতা বিভাগ ছিল কিন্তু আমরা পাস করেছি বাংলা বিভাগ থেকে।

জাহানারা ইমাম ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে আমেরিকায় গেছেন। এখন কলাম কাকে দিয়ে লেখানো যায়। এ রকম সময় শাহরিয়ার শাহাদত ভাইকে আমার কথা বলে। যে গুটিকয় নারী তখন সংবাদপত্রে ছিলেন তার মধ্যে ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম, বিনোদন ও অন্যান্য বিষয়ে লায়লা সামাদ, বিখ্যাত অভিনেতা ফজলে লোহানীর বোন হুসনা বানু খানম, দৈনিক বাংলার হাসিনা আশরাফ এবং ফটোসাংবাদিকতায় সাঈদা খানমের নাম ছিল।

সব কাগজেই মেয়েদের বিশেষ পাতা ছিল। দৈনিক বাংলায় সে পাতাটি দেখতেন আমার আরেক বন্ধু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই আরেক সহপাঠী নজরুলগীতির খ্যাতনামা শিল্পী শবনম মুশতারীর মা মাফরুহা চৌধুরী। তিনি আর পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীব চার তলার একই কক্ষে বসতেন। সাপ্তাহিক বিচিত্রা দৈনিক বাংলা গ্রুপ থেকে শুধু বেরোত না অফিসটিও একই দালানের তিন তলায় ছিল। ওঁরা চার তলায় বসতেন আর দোতলায় বসতেন কবি রুবি রহমানের বোন কণিকা মাহফুজ। তিনি লিখতেন উপসম্পাদকীয় ও নানান ফিচার। শাহরিয়ারের ডাকে যোগ দিতে এসে ছোট্ট দিয়াশলাই বাক্সের মাপের লিফটের সামনেই দীর্ঘাঙ্গী হাসিনা আপার সঙ্গে দেখা। ভাবলাম একদিন হয়তো তাঁর মতো রিপোর্টও করব। নারী সাংবাদিক বলতে বিশেষ পাতা দেখা, বাড়িতে থেকে ফিচার লেখা ও ডেস্ক সাংবাদিকতা করার ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু কোথাও না কোথাও তো আগে প্রবেশ করতে হবে! শহীদজননীর টিভি সমালোচনা ধরেই আমার প্রবেশ।

বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যানুযায়ী দেখলাম দেশে প্রায় ১ হাজার নারী সাংবাদিকতা পেশায় আছেন। বাংলাদেশসহ ১৪৪টি দেশের তথ্যের ভিত্তিতে ‘গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকের ৮৪ শতাংশ পুরুষ আর ১৬ শতাংশ নারী। টেলিভিশন সাংবাদিকতায় নারীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বহু নারী ফটো ও ভিডিও সাংবাদিকতায় আছেন। তাদের বিষয়ও বিচিত্র। অপরাধ, সচিবালয়, উপসম্পাদকীয়, বিনোদন, অনলাইন সম্পাদনাসহ বহু বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নারী। অনেকে ভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই বেসরকারি টেলিভিশনের গত দেড় যুগের ইতিহাসে নারীদের প্রাধান্য বাড়িয়েছেন। তবে দেখা গেছে মূলত সংবাদ উপস্থাপনায়। সাংবাদিকতা করতে করতে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় পদে আসীন হতে দেখা গেছে মুন্নী সাহার মতো হাতে গোনা দু-এক জনকে।

আমাদের সময়ে তখন আমি ওই গুটিকয় গুণী মহিলার কথাই জানতাম। এঁরা ’ওয়ার্কিং উয়োম্যান’ হয়ে পুরুষের কাজগুলো তো করে যাচ্ছিলেনই সঙ্গে সঙ্গে জরায়ু ও জঠরের খেসারত দিতে গিয়ে বাদবাকি আরও সব কাজও করে যাচ্ছিলেন বিনাপারিশ্রমিকে। কাজেই আমি কেন পারব না। দ্রুত টিভি রিভিউ থেকে স্ট্রিপ ও কভার স্টোরি লেখায় উন্নতি হলো। কিন্তু ছবি তুলতে যেতে হতো বিচিত্রার স্টাফ ফটোগ্রাফার শামসুল ইসলাম আলমাজীকে। আলমাজীর তখন ঝাঁকড়া চুল আর ঝলমলে এক মোটরসাইকেল। একদিন বিপাকে পড়ে তাঁর মোটরসাইকেলে করেই আমি ব্যারিস্টার সিগমা হুদার সাক্ষাৎকার নিতে গেলাম। সারা রাস্তা ভয়ে ভয়ে থাকলাম কোথায় কে দেখে ফেলে আর কী ভেবে বসে! দেশি ফ্যাশন নিয়ে আমার প্রচ্ছদ ইত্যাদি দেশ মাতিয়ে তোলার এক মোহনক্ষণে আমি শাহাদত ভাইকে প্রস্তাব দিলাম, আমরা দেশি পোশাক নিয়ে ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতাই শুরু করে দিই আর আমার সব ফটোসেশন আমার বাসভবন থেকেই হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো যখন এত রাশি রাশি ছবি তোলা। সম্পাদক নিজে তুলেও কুলাতে পারছিলেন না। বিজ্ঞাপনের জন্য, ফ্যাশনের জন্য ছবি তুলতে টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির বা আড়ং ইত্যাদিতে যেতে হবে। তখন ছবি তোলাটা তিনি আমাকে শিখিয়ে দিলেন। শুরু হলো আমার আরেক পর্ব। এবার এত সাহস হলো যে ঢাকার হরতালেও হাঁটু কাঁপে না। সাংবাদিক লেখা টেম্পোতে করে একাই অফিস যাই। হরতালকারীরা টেম্পো থামিয়ে সাংবাদিক লেখা সাইন পোস্টের দিকে একবার তাকাত আরেকবার আমার দেহের দিকে।

তখন আমি ছিলাম বিচিত্রার একমাত্র সাংবাদিক-নারী। আমাদের পুরো গুচ্ছটি পোক্ত হয়েছিল শাহরিয়ার কবির, চিন্ময় মুৎসুদ্দি, কাজী জাওয়াদ, আলমগীর রহমান, আনু মুহাম্মদ, মাহমুদ শফিক, চন্দন সরকার ও আমাকে নিয়ে। আমরা সবাই তরুণ, সবাই সম্ভাবনাময়, সবাই তুখোড় এবং দুর্বার। আমাদের একেকটি কভার স্টোরি বেরোয় আর সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে ওঠে। মন্ত্রীদের যেমন দফতর ভাগ করা থাকে তেমনি আমাদের শক্তি ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এলাকা ভাগ করে দিয়েছিলেন শাহাদত ভাই-শাচৌ। আটাত্তরে যোগ দিয়ে নিয়মিতভাবে কাজ করে আশির শুরুতেই আমার বাহিনী নিয়ে জমিয়ে তুলেছি ‘জীবন এখন যেমন’, যে বিভাগ শেষ চার পাতা যা আমি সম্পাদনা করতাম।

শাহাদত ভাই আমার শক্তিটা এবং নারী সাংবাদিকের জন্য সমাজের দুর্বলতাটা শনাক্ত করেছিলেন। মধ্যবিত্তের জীবনযাপন, নারী নির্যাতন, খাদ্যাভ্যাস, বুকের দুধ (তখন মা হয়েছি), দেশি ফ্যাশন, ঈদের বাজার, দেশের শিক্ষালয়গুলোর ব্যবস্থা (তখন ঢাকা কলেজেও পড়াই) কিংবা ঢাকার বিনোদন (আমার সন্তানদের নিয়ে পার্কে যাই, ফাস্ট ফুড খাই, নাটক দেখি, আর্ট কলেজে যাই) এসব নিয়েই আমার অ্যাসাইনমেন্ট থাকত। আর এসব গতানুগতিক বিষয়ে পাঠকীয় আগ্রহ তৈরি করার জন্য আমি কী না করেছি। রোদে রোদে হেঁটে টাঙ্গাইল রাজশাহীর সুতো রঙের বুনন বর্ণনা করে, সিদ্ধিরগঞ্জে বেনোজলে ডুবন্ত তাঁতের তন্তুর হাহাকার তুলে এনে তৈরি করেছি আমার লেখা। সে লেখাতে কাব্য এনে নিজের রিপোর্টকে আলাদা করার চেষ্টা করেছি। সরেজমিন ঘুরে ঘুরে দেশের জাতীয় চরিত্রে দেশি পোশাক আনার জন্য প্রাণান্ত করেছি। আমি যখন এসব করছি তখন আমার পুরুষ সহকর্মীরা ধমাধম পোর্ট আনোয়ারা, অথবা যুদ্ধাপরাধীরা কে কোথায় আছে অথবা বিমানের কারচুপি লিখে হিরো হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমি তো আর পারব না ক্রিমিনাল শিবিরে ঢুকে এক টেবিলে চা সিগারেট খেয়ে তার কথ বের করতে। অথবা কাজ সেরে রাত দুটো-তিনটায় মতিঝিল থেকে একা রিকশায় ফিরতে।

কিন্তু সত্তরের শেষার্ধ থেকে আশির পুরোটা দশক আমি যেভাবে যে বিষয় দেখেছি এবং তুফান তুলে লিখেছি তখন ঢাকার কোনো পুরুষ সহকর্মী হয়তো তার সামান্যই করেছেন। আর করলে তার জন্য তাকে ব্যতিক্রম বলতে হয়, কারণ মেয়েরা যে জীবন দেখে ছোটবেলা থেকেই তারা তা দেখেন না। গৃহজীবনের ওইসব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ আমাদের সমাজের কটা ছেলে পায়? তারা কই মাছের কোরমা বানানোর প্রণালি থেকে একজন নারীর জীবনের সায়াহ্নকালের চিহ্নরেখার কষ্ট তারা জানেন না! এমনকি আজ অবধি বাংলাদেশি খুব নগণ্য সংখ্যক পুরুষই আছেন যারা তার স্ত্রীর প্রসবকালে সামনে থেকে সে কষ্টটুকু অন্তত চাক্ষুষ করেছেন। প্রতি মাসে ঋতুমতী হয়ে তাকে নিজেকে অচ্ছুত ভাবতে হয় না। সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো চূড়ান্ত এক সাহসী কাজের কোনো অভিজ্ঞতাই তার নেই। তিনি জানেনই না শিশু ন্যাপির সঙ্গে নাড়ির সংযোগ। তাই এসব অভিজ্ঞতাবঞ্চিত পুরুষরা নারী বিষয় নিয়ে লিখলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই তা তুলে এনেছেন যা কিনা কখনো কখনো প্রশ্নবোধক চিহ্নের সৃষ্টি করেছে। না হলে তা তাঁর মহা এক প্রতিভা বলে স্বীকৃতি মিলেছে। আমার সব বিষয়ই মধ্যবিত্ত মহিলা হিসেবে আমার জীবনাভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক ছিল। আর বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বা উঠতি মধ্যবিত্ত এরাই বিচিত্রার গ্রাহক। আমাকে তখন এসব অতি গতানুগতিক বিষয়েই পাঠকীয় আগ্রহ তৈরি করার জন্য করতে হয়েছে নানান কৌশল।

কিন্তু আমার এ কাজ পাঠকের কাছে নারী সাংবাদিক বলেই তা গ্রান্টেড! ব্যাপারটা কি? মাটিকাটা, গাড়ির কলকব্জা বদলানো, ক্রিকেট খেলা, নৌকা বাওয়া, পাথর ভাঙা, প্লেন বা গাড়ি চালানো, বাড়ি বানানো, রেস্টুরেন্ট-হোটেলে শেফের কাজ, ফুলসজ্জা, চুলসজ্জা, উল ও তাঁত বোনা সবই নারী-পুরুষ উভয়েই করতে সক্ষম-যদি তাকে সমান সুযোগ ও শিক্ষাদান করা যায়। শাহাদত চৌধুরী ব্যাপারটা বুঝতেন। মানের ক্ষেত্রে কারও কোনো কমতি নেই। আছে তার ভিন্নতায়, তার নিজস্ব সৃষ্টিশীলতায়। কিন্তু বাইরের সমাজে তার মূল্যায়ন হয় না ন্যায্যতার ভিত্তিতে। ঘরের বিষয়ের দাম কম, বাইরের বিষয়ে বেশি!

মানুষের কাজের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি হওয়া সমীচীন সে কাজটি কে করেছে এবং কি করেছে তার বিবেচনায়। মূল্যায়নের সময় মনে রাখতে হবে তার জৈবিক লিঙ্গভিত্তিক উপলব্ধি ও তার অর্জনও কিন্তু তার শক্তি, কারণ তার জন্যও তাকে খেসারত দিতে হয়। দৃশ্যমান সামাজিক সুযোগ প্রাপ্তির কারণে কর্মে সিদ্ধ হওয়া বা তা মোকাবিলা করার জন্য পুরস্কৃত হওয়া ঠিক না। এতে ন্যায্যতা হয় না। কিন্তু এ আমাদের সময়ে জাতীয় জীবন থেকে বাস্তবে ব্যতিক্রম ছাড়া সব পেশায় হয়েছে সর্বত্র। এখন তা নবরূপে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে ঠিক তেমনি। এটা বড়ই বেদনার বিষয়। বড়ই বেদনার বিষয়।

 

লেখক : লন্ডন প্রবাসী    কবি ও শিক্ষক।


আপনার মন্তব্য